শিরোনাম :
‘বাংলা কিউআর’-এর ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ক্যাশলেস অর্থনীতির চিত্র এলপিজির দাম কমল ৩৫৭ টাকা,১২ কেজির নতুন দাম হয়েছে ১ হাজার ৫২৮ টাকা। নির্বাচনে শিক্ষকদের অংশগ্রহণে ‘চাকরি ছেড়ে ভোটে আসতে হবে’, আইন করার দাবি শিক্ষামন্ত্রীর নতুন দায়িত্বে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী : ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন বাজেট ২০২৬-২৭: সংসদে সরব বিরোধী দল, তবে অর্থবিলে নেই কোনো সংশোধনী প্রস্তাব—কী বার্তা দিচ্ছে এই নীরবতা? সামনে নরওয়ে জুজু! যাদের বিপক্ষে কখনই জয় পায়নি ব্রাজিল:ভাঙবে কি ইতিহাস? বাংলাদেশে আর সন্ত্রাসবাদ নয় মেট্রোরেল–টার্মিনালসহ নানা ইস্যুতে জাপানের সঙ্গে ‘টানাপোড়েন’  সম্পর্ক ঠিক রাখতে চায় সরকার কেরানীগঞ্জে বিস্ফোরণ : নব্য জেএমবির পুনরুত্থান ও নিরাপত্তা ঝুঁকি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হাসানুল হক ইনু

বাজেট ২০২৬-২৭: সংসদে সরব বিরোধী দল, তবে অর্থবিলে নেই কোনো সংশোধনী প্রস্তাব—কী বার্তা দিচ্ছে এই নীরবতা?

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে দীর্ঘ ৪৬ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা শেষ হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিরোধী দলের অন্তত ৯১ জন সংসদ সদস্য প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁরা করের বোঝা, মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরে বাজেটে ব্যাপক পরিবর্তনের দাবিও জানিয়েছেন। কিন্তু যখন বাজেট পাসের চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলো, তখন দেখা গেল এক অভাবনীয় চিত্র। অর্থবিলের কোথায়, কোন ধারায় তাঁরা কী পরিবর্তন চান, তা উল্লেখ করে বিরোধী দলের কোনো সদস্যই দফাওয়ারি কোনো লিখিত সংশোধনী প্রস্তাব জমা দেননি।

সংসদীয় রাজনীতির বিশ্লেষক এবং সংসদ-সংশ্লিষ্ট প্রবীণ ব্যক্তিরা বলছেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অর্থবিলে কোনো সংশোধনী প্রস্তাব না দেওয়ার এই ঘটনা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। কেবল মৌখিক সমালোচনা নয়, বরং সংসদে লিখিতভাবে প্রস্তাব উত্থাপন করাই আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মূল চাবিকাঠি। অথচ এবারের বাজেটে সেই সুযোগটিই যেন অবলীলায় হাতছাড়া করল বিরোধী শিবির।

কীভাবে পাস হয় অর্থবিল এবং কেন সংশোধনী জরুরি?

গত সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে অর্থবিল-২০২৬ এবং মঙ্গলবার নির্দিষ্টকরণ বিল পাসের মাধ্যমে নতুন অর্থবছরের বাজেট চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়। মূলত রাষ্ট্রের শুল্ক ও কর কাঠামোর সব ধরনের পরিবর্তন আইনি বৈধতা পায় এই অর্থবিলের মাধ্যমেই।

সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, যখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী কোনো বিল ‘সংসদে অবিলম্বে বিবেচনার’ জন্য প্রস্তাব দেন, তখন সংসদ সদস্যরা প্রথমেই বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তাব করতে পারেন। এই প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা হয় এবং কণ্ঠভোটে তা সাধারণত নাকচ হয়ে যায়। এরপর আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বিল পাসের ঠিক আগে সংসদ সদস্যরা বিলের কোন অনুচ্ছেদে বা ধারায় কী ধরনের সংশোধন চান, তা সুনির্দিষ্টভাবে প্রস্তাব আকারে জমা দিতে পারেন।

এই সংশোধনী প্রস্তাবের নোটিশ সংসদ সদস্যদের একটি নির্দিষ্ট সময় আগেই সচিবালয়ে জমা দিতে হয়। এরপর সংসদে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী প্রতিটি প্রস্তাব ধরে ধরে সেটি গ্রহণ বা নাকচ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মন্ত্রীর মতামতের পর স্পিকার প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে দেন। মূলত এই লিখিত সংশোধনীগুলোর মাধ্যমেই একটি বিলে প্রকৃত পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়।

সংসদীয় অভিজ্ঞতায় এক ব্যতিক্রমী ঘটনা

জাতীয় সংসদের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে যুক্ত আছেন এমন দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন। তাঁরা জানান, নিজেদের দীর্ঘ কর্মজীবনে তাঁরা অন্তত পাঁচ-ছয়টি সংসদের কার্যক্রম খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। কিন্তু অতীতে কোনো অর্থবিলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একটিও সংশোধনী প্রস্তাব আসেনি—এমন ঘটনা তাঁরা স্মরণ করতে পারছেন না।

সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সাধারণত যেকোনো বিলে, বিশেষ করে অর্থবিলে বিরোধী দলের সদস্যরাই সবচেয়ে বেশি সংশোধনী প্রস্তাব দিয়ে থাকেন। সরকারি দলের সদস্যরাও প্রস্তাব দেন এবং স্বভাবতই সরকারি দলের আনা সংশোধনীগুলো সহজেই গৃহীত হয়। তবে বিরোধী দলের সদস্যদের আনা যৌক্তিক সংশোধনীও যে গ্রহণ করা হয় না, তা একেবারেই নয়। অতীতে বহুবার বিরোধী দলের দেওয়া সংশোধনী প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করেছে এবং সে অনুযায়ী আইনে পরিবর্তনও এসেছে। কিন্তু এবারের চিত্রটি ছিল একেবারেই ভিন্ন, যা সংসদীয় চর্চায় এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করল।

সরকারি দলের প্রস্তাবেই এল করমুক্ত আয়সীমার পরিবর্তন

বিরোধী দল নিশ্চুপ থাকলেও সরকারি দলের সদস্যরা কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন না। এবারের অর্থবিলে মোট ১১ জন সংসদ সদস্য মিলে ৬৪টি সংশোধনী প্রস্তাব এনেছিলেন। তাঁরা সবাই সরকারি দলের সদস্য। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সরকার তাঁদের আনা সব কটি সংশোধনীই সাদরে গ্রহণ করেছে।

এবারের অর্থবিলে আনা এই সংশোধনীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জনবান্ধব ছিল করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির বিষয়টি। অর্থমন্ত্রীর মূল প্রস্তাবিত অর্থবিলে সাধারণ করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। কিন্তু বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান এই আয়সীমা চার লাখ টাকায় উন্নীত করার বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানের পর সরকারি দলের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী অর্থবিলের তফসিলে প্রস্তাবিত করধাপে সংশোধনী আনার একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেন। সংসদে তাঁর প্রস্তাবটি গৃহীত হয় এবং এর ফলেই নতুন অর্থবছরের জন্য সাধারণ মানুষের করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকা হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়।

বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ এবং একটি পদ্ধতিগত ভুল

সংসদীয় প্রক্রিয়ায় লিখিত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব কতটা জরুরি, তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখা গেছে বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশে শুল্ক কমানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে।

গত ২৯ জুন সংসদে বাজেট আলোচনার শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বক্তব্য রাখার পর, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ফ্লোর নিয়ে বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশের ওপর আরোপিত সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহারের একটি মৌখিক প্রস্তাব দেন। জনস্বার্থ বিবেচনায় সংসদ নেতা প্রস্তাবটি পরীক্ষা করে দেখার জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে আহ্বান জানান।

এ সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, বিষয়টির ওপর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব থাকলে ভালো হয়। কিন্তু বিপত্তি ঘটে অন্য জায়গায়। অর্থবিলের সংশ্লিষ্ট দফায় এই বিষয়ে বিরোধী দলের কোনো লিখিত বা আনুষ্ঠানিক সংশোধনী প্রস্তাব জমা ছিল না। ফলে নিয়মানুযায়ী অর্থবিলে বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশের ওপর কর কমানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

অবশ্য অর্থবিল পাস হয়ে যাওয়ার কিছু সময় পর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদকে আশ্বস্ত করে জানান, বিরোধীদলীয় নেতা যে প্রস্তাব করেছেন, সরকার তা নীতিগতভাবে গ্রহণ করছে। তবে যেহেতু আইন অনুযায়ী ‘শুল্কের বিষয় ক্লোজ’ হয়ে গেছে অর্থাৎ অর্থবিল পাস হয়ে গেছে, তাই পরে এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে।

কী বলছে বিরোধী দল?

বাজেট নিয়ে এত সমালোচনা করার পরও কেন তাঁরা অর্থবিলে কোনো সংশোধনী প্রস্তাব দিলেন না—এমন প্রশ্নের জবাবে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে বিরোধী দল।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, “সরকার বাজেটে যেসব জনবিরোধী কর প্রস্তাব করেছিল, সেগুলো নিয়ে আমরা সংসদে জোরালো বক্তব্য দিয়েছি। আমাদের সমালোচনার মুখে সরকারি দল তা শুনেছে এবং বিশেষ করে কালোটাকা সাদা করার সুযোগের মতো অনৈতিক প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত বাদ দেওয়া হয়েছে।”

তবে সংশোধনী না দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে তিনি কাঠামোগত সংকটের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বিরোধী দলের মূল উদ্বেগ ছিল বাজেট বাস্তবায়নের পরিকল্পনার অভাব নিয়ে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে যে কাঠামোগত সমস্যা, প্রশাসনে যে অস্বচ্ছতা, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতার যে প্রকট সংকট চলছে—তা অর্থবিলে দু-একটি ছোটখাটো সংশোধনী প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।

নাজিবুর রহমান আরও বলেন, “এসব ব্যাপকভিত্তিক সংকট বিবেচনা করেই আমরা অর্থবিলে কোনো বিচ্ছিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব আনিনি। বরং আমরা মনে করেছি পুরো বাজেটটিই নতুন করে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। সে জন্যই আমরা পুরো বিলটি জনমত যাচাইয়ে পাঠানোর জন্য শক্ত প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ভোটে সেই প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়।”

বিশ্লেষণ ও উপসংহার

বিরোধী দলের এই কৌশলগত অবস্থান দেশের রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে তারা বলছে, কাঠামোগত ত্রুটি সারাতে ছোটখাটো সংশোধনী অর্থহীন; অন্যদিকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রতিটি ধারার চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং লিখিত সংশোধনী প্রস্তাব আনা বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

মৌখিক আলোচনার পাশাপাশি আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে সরকারকে চাপে রাখার যে সুযোগ বিরোধী দলগুলোর থাকে, সংশোধনী না দেওয়ার মাধ্যমে সেই সুযোগটিই হয়তো তারা হাতছাড়া করেছে। বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে বিরোধীদলীয় নেতার মৌখিক প্রস্তাব গৃহীত হলেও, সংসদীয় নথিতে তা বিরোধী দলের আনুষ্ঠানিক অর্জন হিসেবে লিপিবদ্ধ হলো না। আগামী দিনগুলোতে সংসদের ভেতরে বিরোধী দলগুলো তাদের সংসদীয় অধিকার ও হাতিয়ারগুলো কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

‘বাংলা কিউআর’-এর ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ক্যাশলেস অর্থনীতির চিত্র

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হাসানুল হক ইনু

৩০ জুন ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

বাজেট ২০২৬-২৭: সংসদে সরব বিরোধী দল, তবে অর্থবিলে নেই কোনো সংশোধনী প্রস্তাব—কী বার্তা দিচ্ছে এই নীরবতা?

আপডেট সময় ১২:০৫:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে দীর্ঘ ৪৬ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা শেষ হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিরোধী দলের অন্তত ৯১ জন সংসদ সদস্য প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁরা করের বোঝা, মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরে বাজেটে ব্যাপক পরিবর্তনের দাবিও জানিয়েছেন। কিন্তু যখন বাজেট পাসের চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলো, তখন দেখা গেল এক অভাবনীয় চিত্র। অর্থবিলের কোথায়, কোন ধারায় তাঁরা কী পরিবর্তন চান, তা উল্লেখ করে বিরোধী দলের কোনো সদস্যই দফাওয়ারি কোনো লিখিত সংশোধনী প্রস্তাব জমা দেননি।

সংসদীয় রাজনীতির বিশ্লেষক এবং সংসদ-সংশ্লিষ্ট প্রবীণ ব্যক্তিরা বলছেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অর্থবিলে কোনো সংশোধনী প্রস্তাব না দেওয়ার এই ঘটনা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। কেবল মৌখিক সমালোচনা নয়, বরং সংসদে লিখিতভাবে প্রস্তাব উত্থাপন করাই আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মূল চাবিকাঠি। অথচ এবারের বাজেটে সেই সুযোগটিই যেন অবলীলায় হাতছাড়া করল বিরোধী শিবির।

কীভাবে পাস হয় অর্থবিল এবং কেন সংশোধনী জরুরি?

গত সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে অর্থবিল-২০২৬ এবং মঙ্গলবার নির্দিষ্টকরণ বিল পাসের মাধ্যমে নতুন অর্থবছরের বাজেট চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়। মূলত রাষ্ট্রের শুল্ক ও কর কাঠামোর সব ধরনের পরিবর্তন আইনি বৈধতা পায় এই অর্থবিলের মাধ্যমেই।

সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, যখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী কোনো বিল ‘সংসদে অবিলম্বে বিবেচনার’ জন্য প্রস্তাব দেন, তখন সংসদ সদস্যরা প্রথমেই বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তাব করতে পারেন। এই প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা হয় এবং কণ্ঠভোটে তা সাধারণত নাকচ হয়ে যায়। এরপর আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বিল পাসের ঠিক আগে সংসদ সদস্যরা বিলের কোন অনুচ্ছেদে বা ধারায় কী ধরনের সংশোধন চান, তা সুনির্দিষ্টভাবে প্রস্তাব আকারে জমা দিতে পারেন।

এই সংশোধনী প্রস্তাবের নোটিশ সংসদ সদস্যদের একটি নির্দিষ্ট সময় আগেই সচিবালয়ে জমা দিতে হয়। এরপর সংসদে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী প্রতিটি প্রস্তাব ধরে ধরে সেটি গ্রহণ বা নাকচ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মন্ত্রীর মতামতের পর স্পিকার প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে দেন। মূলত এই লিখিত সংশোধনীগুলোর মাধ্যমেই একটি বিলে প্রকৃত পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়।

সংসদীয় অভিজ্ঞতায় এক ব্যতিক্রমী ঘটনা

জাতীয় সংসদের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে যুক্ত আছেন এমন দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন। তাঁরা জানান, নিজেদের দীর্ঘ কর্মজীবনে তাঁরা অন্তত পাঁচ-ছয়টি সংসদের কার্যক্রম খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। কিন্তু অতীতে কোনো অর্থবিলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একটিও সংশোধনী প্রস্তাব আসেনি—এমন ঘটনা তাঁরা স্মরণ করতে পারছেন না।

সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সাধারণত যেকোনো বিলে, বিশেষ করে অর্থবিলে বিরোধী দলের সদস্যরাই সবচেয়ে বেশি সংশোধনী প্রস্তাব দিয়ে থাকেন। সরকারি দলের সদস্যরাও প্রস্তাব দেন এবং স্বভাবতই সরকারি দলের আনা সংশোধনীগুলো সহজেই গৃহীত হয়। তবে বিরোধী দলের সদস্যদের আনা যৌক্তিক সংশোধনীও যে গ্রহণ করা হয় না, তা একেবারেই নয়। অতীতে বহুবার বিরোধী দলের দেওয়া সংশোধনী প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করেছে এবং সে অনুযায়ী আইনে পরিবর্তনও এসেছে। কিন্তু এবারের চিত্রটি ছিল একেবারেই ভিন্ন, যা সংসদীয় চর্চায় এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করল।

সরকারি দলের প্রস্তাবেই এল করমুক্ত আয়সীমার পরিবর্তন

বিরোধী দল নিশ্চুপ থাকলেও সরকারি দলের সদস্যরা কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন না। এবারের অর্থবিলে মোট ১১ জন সংসদ সদস্য মিলে ৬৪টি সংশোধনী প্রস্তাব এনেছিলেন। তাঁরা সবাই সরকারি দলের সদস্য। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সরকার তাঁদের আনা সব কটি সংশোধনীই সাদরে গ্রহণ করেছে।

এবারের অর্থবিলে আনা এই সংশোধনীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জনবান্ধব ছিল করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির বিষয়টি। অর্থমন্ত্রীর মূল প্রস্তাবিত অর্থবিলে সাধারণ করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। কিন্তু বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান এই আয়সীমা চার লাখ টাকায় উন্নীত করার বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানের পর সরকারি দলের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী অর্থবিলের তফসিলে প্রস্তাবিত করধাপে সংশোধনী আনার একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেন। সংসদে তাঁর প্রস্তাবটি গৃহীত হয় এবং এর ফলেই নতুন অর্থবছরের জন্য সাধারণ মানুষের করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকা হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়।

বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ এবং একটি পদ্ধতিগত ভুল

সংসদীয় প্রক্রিয়ায় লিখিত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব কতটা জরুরি, তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখা গেছে বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশে শুল্ক কমানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে।

গত ২৯ জুন সংসদে বাজেট আলোচনার শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বক্তব্য রাখার পর, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ফ্লোর নিয়ে বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশের ওপর আরোপিত সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহারের একটি মৌখিক প্রস্তাব দেন। জনস্বার্থ বিবেচনায় সংসদ নেতা প্রস্তাবটি পরীক্ষা করে দেখার জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে আহ্বান জানান।

এ সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, বিষয়টির ওপর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব থাকলে ভালো হয়। কিন্তু বিপত্তি ঘটে অন্য জায়গায়। অর্থবিলের সংশ্লিষ্ট দফায় এই বিষয়ে বিরোধী দলের কোনো লিখিত বা আনুষ্ঠানিক সংশোধনী প্রস্তাব জমা ছিল না। ফলে নিয়মানুযায়ী অর্থবিলে বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশের ওপর কর কমানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

অবশ্য অর্থবিল পাস হয়ে যাওয়ার কিছু সময় পর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদকে আশ্বস্ত করে জানান, বিরোধীদলীয় নেতা যে প্রস্তাব করেছেন, সরকার তা নীতিগতভাবে গ্রহণ করছে। তবে যেহেতু আইন অনুযায়ী ‘শুল্কের বিষয় ক্লোজ’ হয়ে গেছে অর্থাৎ অর্থবিল পাস হয়ে গেছে, তাই পরে এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে।

কী বলছে বিরোধী দল?

বাজেট নিয়ে এত সমালোচনা করার পরও কেন তাঁরা অর্থবিলে কোনো সংশোধনী প্রস্তাব দিলেন না—এমন প্রশ্নের জবাবে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে বিরোধী দল।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, “সরকার বাজেটে যেসব জনবিরোধী কর প্রস্তাব করেছিল, সেগুলো নিয়ে আমরা সংসদে জোরালো বক্তব্য দিয়েছি। আমাদের সমালোচনার মুখে সরকারি দল তা শুনেছে এবং বিশেষ করে কালোটাকা সাদা করার সুযোগের মতো অনৈতিক প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত বাদ দেওয়া হয়েছে।”

তবে সংশোধনী না দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে তিনি কাঠামোগত সংকটের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বিরোধী দলের মূল উদ্বেগ ছিল বাজেট বাস্তবায়নের পরিকল্পনার অভাব নিয়ে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে যে কাঠামোগত সমস্যা, প্রশাসনে যে অস্বচ্ছতা, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতার যে প্রকট সংকট চলছে—তা অর্থবিলে দু-একটি ছোটখাটো সংশোধনী প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।

নাজিবুর রহমান আরও বলেন, “এসব ব্যাপকভিত্তিক সংকট বিবেচনা করেই আমরা অর্থবিলে কোনো বিচ্ছিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব আনিনি। বরং আমরা মনে করেছি পুরো বাজেটটিই নতুন করে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। সে জন্যই আমরা পুরো বিলটি জনমত যাচাইয়ে পাঠানোর জন্য শক্ত প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ভোটে সেই প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়।”

বিশ্লেষণ ও উপসংহার

বিরোধী দলের এই কৌশলগত অবস্থান দেশের রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে তারা বলছে, কাঠামোগত ত্রুটি সারাতে ছোটখাটো সংশোধনী অর্থহীন; অন্যদিকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রতিটি ধারার চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং লিখিত সংশোধনী প্রস্তাব আনা বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

মৌখিক আলোচনার পাশাপাশি আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে সরকারকে চাপে রাখার যে সুযোগ বিরোধী দলগুলোর থাকে, সংশোধনী না দেওয়ার মাধ্যমে সেই সুযোগটিই হয়তো তারা হাতছাড়া করেছে। বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে বিরোধীদলীয় নেতার মৌখিক প্রস্তাব গৃহীত হলেও, সংসদীয় নথিতে তা বিরোধী দলের আনুষ্ঠানিক অর্জন হিসেবে লিপিবদ্ধ হলো না। আগামী দিনগুলোতে সংসদের ভেতরে বিরোধী দলগুলো তাদের সংসদীয় অধিকার ও হাতিয়ারগুলো কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Share this news as a Photo Card