দেশের সাধারণ ভোক্তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর নিয়ে এল জুলাই মাস। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হয়েছে। নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, প্রতি কেজি এলপিজিতে দাম কমেছে ২৯ টাকা ৭৬ পয়সা। ফলে বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম আগের চেয়ে ৩৫৭ টাকা কমিয়ে ১,৫২৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আজ সন্ধ্যা ৬টা থেকেই এই নতুন দর কার্যকর হয়েছে।
দামের অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
গত কয়েক মাস ধরে বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতা দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এলপিজির বিশ্ববাজার ছিল উত্তপ্ত। বিশেষ করে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসটি ছিল দেশের ইতিহাসের অন্যতম সংকটময় সময়। তখন মাত্র ১৯ দিনের ব্যবধানে দুই দফায় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৬০০ টাকারও বেশি বাড়ানো হয়েছিল।
এপ্রিলের শুরুতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ে ৩৮৭ টাকা, আর একই মাসের ১৯ তারিখে বাড়ে আরও ২১২ টাকা। ফলে এক পর্যায়ে সিলিন্ডারপ্রতি দাম গিয়ে ঠেকে ১,৯৪০ টাকায়, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস তুলেছিল। তবে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হতে শুরু করায় গত জুন মাস থেকে দাম কমার প্রবণতা দেখা দেয়। জুন মাসে দাম কিছুটা কমে হয়েছিল ১,৮৮৫ টাকা। আর বর্তমান জুলাই মাসে এসে তা আরও ৩৫৭ টাকা কমে ১,৫২৮ টাকায় নেমে এল।
দাম নির্ধারণের নতুন হিসাব
বিইআরসি’র নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতি কেজি এলপিজির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১২৭ টাকা ৩০ পয়সা, যা আগে ছিল ১৫৭ টাকা ৬ পয়সা। সরকার পরিচালিত কোম্পানিগুলোর সরবরাহ করা সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এছাড়া যানবাহনে ব্যবহৃত এলপিজি বা ‘অটো গ্যাস’-এর দামও কমানো হয়েছে। লিটারপ্রতি নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ টাকা ৪০ পয়সা, যা আগে ছিল ৮৬ টাকা ৯৩ পয়সা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরামকোর ঘোষিত ‘সৌদি কার্গো মূল্য’ বা সিপিকে ভিত্তিমূল্য ধরেই এই দাম নির্ধারণ করা হয়। প্রতি মাসে আমদানিকারকদের ইনভয়েস মূল্য এবং ডলারের বিনিময় হারের গড় হিসাব করে বিইআরসি এই দাম সমন্বয় করে থাকে।
বাজারের বাস্তবচিত্র ও ক্রেতার আক্ষেপ
বিইআরসি নিয়মিত দাম নির্ধারণ করলেও, মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন নিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে সবসময়ই অসন্তোষ রয়েছে। অভিযোগ আছে যে, কোম্পানিগুলো দাম কমালে বিক্রেতারা তা মানতে চান না। প্রায়ই খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। ফলে বিইআরসি দাম কমালেও শেষ পর্যন্ত ক্রেতার পকেট থেকে বাড়তি টাকা যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর রান্নার মূল ভরসা এখন এই এলপিজি সিলিন্ডার। দাম যখন আকাশচুম্বী হয়, তখন পারিবারিক বাজেটে টান পড়ে। গত কয়েক মাসে এলপিজির অসহনীয় দাম বাড়ার কারণে অনেকেই কাঠের চুলা বা বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছিলেন। বর্তমান দাম হ্রাসের এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনবে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—বাজার তদারকি সংস্থাগুলো কি নিশ্চিত করতে পারবে যে, প্রতিটি দোকানে নির্ধারিত দামেই এই গ্যাস বিক্রি হচ্ছে?
কেন এলপিজির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে?
বাংলাদেশে পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ এখন প্রায় সীমিত। বেশিরভাগ নতুন গৃহস্থালি ও শিল্প কারখানায় এখন এলপিজিই একমাত্র ভরসা। ফলে রান্নার জ্বালানি হিসেবে এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এলপিজি তৈরির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্য অস্থিরতায় দেশের সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা বরাবরই বলে আসছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই চাপ কমাতে হলে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব মজুত বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে। এলপিজি বাজারে কেবল প্রতিযোগিতার দোহাই না দিয়ে, কঠোর মনিটরিং এবং সাপ্লাই চেইনকে আরও স্বচ্ছ করার প্রয়োজন রয়েছে।
উপসংহার
দাম কমানোর এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল দাম নির্ধারণই যথেষ্ট নয়। বিইআরসি নির্ধারিত দাম যেন তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত কার্যকর হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের মতো অস্থিতিশীল অঞ্চলের ওপর জ্বালানির জন্য অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্থিতিশীল সরবরাহের পথে হাঁটতে হবে।
আজকের এই ঘোষণার পর সাধারণ ভোক্তারা আশা করছেন, কেবল সিলিন্ডারের গায়ে লেখা দাম নয়, বাস্তবেও যেন গ্যাস কিনতে তাদের বাড়তি টাকা গুনতে না হয়। জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতা কাটিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের স্বস্তি বজায় থাকুক—এটাই এখন সবার চাওয়া।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 









