২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। প্রায় দেড় দশকের শাসনক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় বসার পর থেকে একের পর এক বিতর্কিত নির্বাচন, ভোটাধিকার হরণ এবং প্রশাসনযন্ত্রের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা কায়েম করেন তিনি। বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন, গুম-খুনের অভিযোগ আর গণহত্যার মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধের কাছে হার মানতে হয় তাকে।
আন্দোলনের ৩৬তম দিনে ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে ভারতের উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন সাবেক এই সরকারপ্রধান। এর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে দেশের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও বিতর্কিত এক শাসনামলের। এখনো তিনি প্রতিবেশী দেশটিতে আশ্রয়ে রয়েছেন।
দীর্ঘ এই শাসনামলে বাক্স্বাধীনতা ও ভোটাধিকার হরণের পাশাপাশি ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে ব্যাংক খাতে লুটপাটের অভিযোগ ওঠে বারবার। অবকাঠামো উন্নয়নের বয়ান দিয়ে দীর্ঘদিন সরকার টিকে থাকলেও শেষ দিকে অর্থনীতি চরম সংকটে পতিত হয়—রিজার্ভ তলানিতে নামে, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণ বাড়ে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। এসব নিয়ে প্রশ্ন তুললে ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে প্রায়ই বিদ্রূপাত্মক জবাব মিলত।
আন্দোলনের সূচনা ও বিতর্কিত মন্তব্য
জুলাই মাসের শুরু থেকে শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে গেলেও ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে করা একটি বিতর্কিত মন্তব্য পুরো পরিস্থিতি পাল্টে দেয়। সেই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে হাজারো শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে প্রতিবাদী স্লোগানে ফেটে পড়ে।
পরদিন ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ছাত্র সংগঠনকে মাঠে নামানোর ঘোষণা আসে। এরপর দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের ওপর নেমে আসে সংগঠিত হামলা, যাতে জড়িত হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও।
একটি মৃত্যু, যা জাগিয়ে তোলে গোটা দেশ
১৭ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তার মৃত্যুর দৃশ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র, যা আন্দোলনকে রূপ দেয় দাবানলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সরকার কারফিউ জারি করে এবং দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই দমনপীড়নে প্রাণ হারান অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। ঘরের ভেতরে থাকা শিশু কিংবা বারান্দায় দাঁড়ানো নিরীহ মানুষও গুলিবিদ্ধ হন। এই হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারাও।
নয় দফা থেকে এক দফায়
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রথমে নয় দফা দাবিতে আবদ্ধ থাকলেও সরকার দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়, আন্দোলনের সমন্বয়কদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের ভিডিও বার্তা রেকর্ড করানো হয়। কিন্তু জনরোষ ও অনশনের মুখে তাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় প্রশাসন।
২ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশাল জনসমাগম থেকে নয় দফা রূপ নেয় সরকার পতনের এক দফা দাবিতে। এরপর সেনাবাহিনী জনতার ওপর অস্ত্র চালাতে অস্বীকৃতি জানালে এবং পুলিশ পিছু হটলে ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে থাকে।
৪ আগস্ট সংঘটিত সহিংসতায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। পরদিন রাজধানী অভিমুখে বিশাল কর্মসূচির ডাক এলে দুপুরের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ক্ষমতার পালাবদল আসন্ন। অবশেষে ৫ আগস্ট দুপুরের দিকে দিল্লির উদ্দেশে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা, যার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ঘটনাবহুল অধ্যায়ের।
শিরোনাম :
দেড় দশকের শাসনের অবসান, পালিয়ে গেলেন শেখ হাসিনা
-
চলমান বার্তা ডেস্ক : - আপডেট সময় ০৮:৩৮:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
- 1
জনপ্রিয় সংবাদ





















