প্রবীণ অভিনেতা নানা পাটেকরের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বলিউড তারকা অক্ষয় কুমার। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি আবেগঘন বার্তা দিয়ে সহশিল্পীকে বিদায় জানিয়েছেন তিনি। ওয়েলকাম ও হাউসফুল ৫ ছবিতে একসঙ্গে কাজের স্মৃতিও সেখানে তুলে ধরেছেন অক্ষয়। নানার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।
অক্ষয় যা লিখলেন
অক্ষয় লেখেন, ‘নানা’জির চলে যাওয়ার খবর শুনে সত্যিই খুব কষ্ট পেয়েছি। তিনি ছিলেন এমন একজন বিরল অভিনেতা, যাকে দর্শকের নজর কাড়তে বাড়তি কিছু করতে হতো না। তার কণ্ঠ, অভিনয়ের তীব্রতা এবং প্রতিটি চরিত্রে সততা, সবকিছুতেই ছিল নিজস্বতা।’
সহশিল্পী হিসেবে নানার সান্নিধ্যকে নিজের সৌভাগ্য বলেও উল্লেখ করেন অক্ষয়। তার ভাষায়, ‘ওয়েলকামে তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। এরপর সম্প্রতি হাউসফুল ৫-এও একসঙ্গে কাজ করেছি। সেই দুই সিনেমার শুটিং সেটের অসংখ্য স্মৃতি সবসময় আমার কাছে বিশেষ হয়ে থাকবে।’
বার্তার শেষ অংশে অক্ষয় জানান, এই খবর মেনে নেওয়া তার জন্য কঠিন। তিনি লেখেন, ‘বিশ্বাস করা কঠিন যে তুমি আর নেই। সব স্মৃতির জন্য ধন্যবাদ। তোমাকে যতটা ভাষায় প্রকাশ করা যায়, তার চেয়েও বেশি মনে পড়বে।’
যে সিনেমায় একসঙ্গে পর্দায়
২০০৭ সালের জনপ্রিয় কমেডি সিনেমা ওয়েলকামে অক্ষয় কুমারের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন নানা। ছবিটিতে আরও ছিলেন অনিল কাপুর, ক্যাটরিনা কাইফ, পরেশ রাওয়াল ও মল্লিকা শেরাওয়াত। এতে নানার উদয় শেঠি চরিত্রটি দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। অক্ষয় অভিনয় করেছিলেন রাজীব চরিত্রে। পরে ওয়েলকাম ব্যাক-এও উদয় শেঠি হয়ে ফিরেছিলেন নানা। সম্প্রতি হাউসফুল ৫-এ তাকে দেখা গেছে অক্ষয় কুমার, অভিষেক বচ্চন ও রিতেশ দেশমুখের সঙ্গে।
মৃত্যুর খবর যেভাবে এল
প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে গোয়ায় মারা যান নানা পাটেকর। তার ছেলে মালহার পাটেকর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। জানা গেছে, তীব্র বুকে ব্যথার পর গোয়ার নিজের বাসায় তাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। এরপর তাকে মণিপাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে সিপিআর দিয়ে তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন, কিন্তু সফল হননি। হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক শেখর সালকার জানান, পুনরুজ্জীবনের চেষ্টার সময় নানার হৃদ্যন্ত্রে কোনো কার্যকলাপ ছিল না। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয় বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
মৃত্যুর ঘটনায় মেডিকো-লিগ্যাল মামলা করা হয়েছে এবং ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদ সাওয়ান্ত জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের পর নানার মরদেহ মুম্বাইয়ে নেওয়া হবে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা বলা হলেও মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ সম্পর্কে সরকারি কোনো তথ্য এখনো জানা যায়নি।
মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগেও গোয়ার একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছিলেন নানা। সম্রাট ক্লাব ইন্টারন্যাশনালের একটি স্থাপনা উদ্বোধনের ওই আয়োজনে তিনি জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে কথা বলেন। তার সেই বক্তব্য ছিল, ‘আগামীকাল আমি থাকব কি না, জানি না।’ মৃত্যুর পর কথাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
কোটি রুপির পারিশ্রমিক, কৃষকের পাশে দাঁড়ানো
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নানার আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। রায়গড় জেলার মুরুদ-জঞ্জিরায় এক মারাঠি পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি। শৈশবে পরিবারে আর্থিক সংকট ছিল। বাবা দিনকর পাটেকর ছিলেন কাপড়ের নকশাশিল্পী। ছোটবেলায় স্কুলের একটি নাটকে বাল্মীকির সহযোগীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নানা। সেই নাটক দেখতে বাবা শহর থেকে গ্রামে এসেছিলেন। দুই বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে নানা বলেছিলেন, বাবার মনোযোগ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তার আগ্রহ জন্মায়।
১৯৭৮ সালে গমন সিনেমা দিয়ে চলচ্চিত্রে পা রাখেন নানা। পরিন্দা, প্রহার, ক্রান্তিবীর, আব তক ছাপ্পান, অপহরণ, অগ্নিসাক্ষী, ওয়েলকামের মতো ছবিতে অভিনয় করে নিজের জায়গা তৈরি করেন। পরিন্দার জন্য পান সেরা পার্শ্ব অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার, আর ক্রান্তিবীরের জন্য সেরা অভিনেতার। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিনয়ের জন্য তিনি তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৩ সালে ভূষিত হন পদ্মশ্রী সম্মানে। শেষ দিকে বিশাল ভরদ্বাজের ও রোমিও এবং অনিল কাপুর অভিনীত সুবেদার সিনেমাতেও তাকে দেখা গেছে।
সহকর্মীদের স্মৃতিচারণায় নানার ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের নানা গল্প উঠে আসছে। পরেশ রাওয়ালের বরাতে জানা যায়, এমন সময়েও এক সিনেমার জন্য ১ কোটি রুপি পারিশ্রমিক চেয়েছিলেন নানা, যখন অনেক প্রতিষ্ঠিত নায়কও এত অঙ্ক চাইতে দ্বিধা করতেন। তিনি সেই পারিশ্রমিকই পেয়েছিলেন।
চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক রণবীর পুষ্প এক পডকাস্টে বলেন, কৃষক আত্মহত্যার খবর দেখে গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন নানা। পরদিন তার ১ কোটি ৫০ লাখ রুপির একটি গাড়ি কেনার কথা ছিল। সেই সিদ্ধান্ত বদলে তিনি এক শিল্পী বন্ধুকে ফোন করে কৃষক পরিবারগুলোর জন্য ১৫ হাজার রুপির চেক তৈরি করতে বলেন। এই মানসিকতা থেকেই পরে নাম ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন নানা। সংগঠনটি কৃষক আত্মহত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তায় কাজ করে।
পরিবার ও শেষ জীবন
নানার স্ত্রী নীলকান্তি পাটেকরও মারাঠি চলচ্চিত্রাঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত, অভিনেত্রী ও প্রযোজক হিসেবে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক বছর ধরে তারা আলাদা থাকতেন, তবে আইনগতভাবে বিচ্ছেদ হয়নি। এ নিয়ে দুজনের কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। তাদের বড় ছেলে দুর্বাসা অল্প বয়সে অসুস্থতায় মারা যান। ছোট ছেলে মালহার সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন।
পর্দায় নানা পরিচিত ছিলেন তীব্র সংলাপ ও দৃঢ় উপস্থিতির জন্য। আর পর্দার বাইরে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি যুক্ত ছিলেন কৃষিকাজ ও সমাজসেবায়। দুই বছর আগের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা কখনো নিজের জন্য বাঁচার সময় পাইনি।’ অক্ষয়ের বার্তার মতো সহকর্মী ও দর্শকের স্মৃতিচারণায় সেই দীর্ঘ পথচলার ছবিই এখন বারবার ফিরে আসছে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 




















