পড়ো, তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ো, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না।”
কুরআনের প্রথম নাজিলকৃত আয়াতগুলোর মধ্যেই পড়া, জ্ঞান অর্জন, কলম ও শিক্ষাদানের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এখানে জ্ঞানকে মানুষের অজ্ঞতা দূর করার এবং আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে জানার একটি মহান মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, শিক্ষা শুধু অর্থ উপার্জনের উপকরণ নয়; এটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
সূরা আত-তাওবা ৯:৩৪ জ্ঞান ও কর্তৃত্বের অবস্থান ব্যবহার করে মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণের বিরুদ্ধে সতর্ক করে।
সক্রেটিসের কাছে জ্ঞানের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে নিজের অজ্ঞতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করা এবং যুক্তির মাধ্যমে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো।
যখন শিক্ষা পণ্যে পরিণত হয়, তখন শিক্ষার্থী হয়তো একটি নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে সনদ কিনতে পারে, কিন্তু অর্থ দিয়ে সত্য উপলব্ধি করার ক্ষমতা কেনা যায় না। শিক্ষার্থী যদি প্রশ্ন করার পরিবর্তে শুধু পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য পড়ে, তবে শিক্ষা তার অনুসন্ধানী চরিত্র হারাতে পারে।
প্লেটোর দর্শন থেকে আধুনিক শিক্ষার জন্য যে শিক্ষা নেওয়া যায়, তা হলো—শিক্ষাকে এমনভাবে সংগঠিত করা দরকার, যাতে তা সমাজের সামগ্রিক কল্যাণে অবদান রাখে। অর্থনৈতিক সামর্থ্য যদি শিক্ষার সুযোগ নির্ধারণের একমাত্র বা প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে, তাহলে শিক্ষা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের পরিবর্তে বিদ্যমান বৈষম্যকে শক্তিশালী করতে পারে।
অ্যারিস্টটলের দর্শনের আলোকে শিক্ষা হওয়া উচিত মানুষের বহুমাত্রিক বিকাশের উপায়। পেশাগত দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা নৈতিকতা ও মানবিকতার বিকল্প নয়। শিক্ষা হওয়া উচিত সংলাপ, প্রশ্ন, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং বাস্তবতার সচেতন বিশ্লেষণের প্রক্রিয়া।
ফ্রেইরের দর্শনে প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে নিজের অবস্থান, সমাজের কাঠামো এবং অন্যায়ের প্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করে। যে শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় না, তা জ্ঞান দিতে পারে; কিন্তু স্বাধীন চিন্তার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হতে পারে।
শিক্ষা মানুষকে প্রকৃতি, সংস্কৃতি, শিল্প, সমাজ এবং নিজের অন্তর্জগতের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
“শিক্ষা যখন ব্যবসায় পরিণত হয়, তখন জ্ঞানের চেয়ে সনদের মূল্য বাড়ে, মেধার চেয়ে অর্থের প্রভাব বাড়ে, আর মানুষ গড়ার মহৎ উদ্দেশ্যটি ধীরে ধীরে মুনাফার কাছে পরাজিত হয়।”
শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড, সভ্যতার ভিত্তি এবং মানুষের বিবেক ও মনুষ্যত্ব বিকাশের প্রধান মাধ্যম। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু চাকরি পাওয়া, অর্থ উপার্জন করা কিংবা একটি সনদ অর্জন করা নয়; বরং মানুষকে জ্ঞানী, বিবেকবান, নৈতিক, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অর্থের প্রয়োজন আছে। শিক্ষকের বেতন, ভবন নির্মাণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও শিক্ষাসামগ্রী কিনতে হয়। তাই শিক্ষার সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক থাকা অস্বাভাবিক নয়। সংকট শুরু হয় তখন, যখন অর্থ উপার্জন শিক্ষার উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে যায়; শিক্ষার্থী হয়ে ওঠে গ্রাহক, অভিভাবক হয়ে ওঠেন ক্রেতা, আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিণত হয় মুনাফা অর্জনের প্রতিষ্ঠানে।
শিক্ষা যখন পণ্য হয়, তখন বিপদ শুধু জ্ঞান বিক্রি হওয়া নয়; বিপদ হলো মানুষকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে সে নিজের মূল্যও শুধু বাজারদর দিয়ে বিচার করতে শেখে।
এখানে প্রতিষ্ঠানের আয়, ভর্তি ফি, মাসিক বেতন, পরীক্ষার ফি, বিভিন্ন আনুষঙ্গিক চার্জ নেয়, উদ্বৃত্ত অর্থ অর্জন করে বলেই সেটি অনৈতিক নয়। সমস্যা হলো যখন অতিরিক্ত মুনাফার জন্য শিক্ষার্থীর স্বার্থ, শিক্ষকের মর্যাদা, শিক্ষার গুণগত মান কিংবা ন্যায্যতার সঙ্গে আপস করা হয়। শিক্ষা পরিচালনার অর্থনৈতিক কাঠামো থাকা প্রয়োজন, কিন্তু সেই কাঠামোর নিয়ন্ত্রক হওয়া উচিত শিক্ষার লক্ষ্য—মুনাফা নয়।
মেধা যদি অর্থের কাছে পরাজিত হয়, তবে শুধু একজন শিক্ষার্থী নয়, একটি জাতির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের সম্ভাবনাকে বিকশিত করা, আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা নয়।
এক-ই শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন, আবার কোচিংয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন, শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত টিউশন নিতে উৎসাহিত করছেন বা চাপ সৃষ্টি করছেন। তবে সব কোচিং বা ব্যক্তিগত টিউশন অনৈতিক নয়। কোনো শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। মূল সমস্যা হলো, অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে পরিবারের সক্ষমতা!
UNESCO-র শিক্ষা-সংক্রান্ত গবেষণায়ও সতর্ক করা হয়েছে যে নিয়ন্ত্রণহীন বেসরকারি টিউশন সামাজিক বৈষম্য বাড়াতে পারে এবং শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে শেখায় কীভাবে সততা বজায় রেখে জীবনে উন্নতি করতে হয়। যে শিক্ষা মানুষকে উপার্জন করতে শেখায়, কিন্তু উপার্জনের নৈতিক সীমা শেখায় না—সে শিক্ষা অসম্পূর্ণ।
কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী যখন পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে শিক্ষার ব্যয় বহন করতে পারে না, তখন তার ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
পরিবারের আয় কম হলে কোনো কোনো শিশুকে পড়াশোনার পরিবর্তে উপার্জনে যুক্ত হতে হয়। কখনো সম্পূর্ণভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। এখানেই আজকের লেখার অবতারণা। তখন শিক্ষার্থীরা কাজের সুযোগও তেমন পায় না কিংবা উপার্জন তেমন করতে পারে না। তখনই তারা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে লিপ্ত হয় এবং যেহেতু তাদের বয়স এবং মেধার ক্রমবিকাশ রুদ্ধ করা হয়েছে, তখন তারা বিভিন্ন মাদকের এবং অপরাধের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। ২০২৬শে এ আমরা তার চূড়ান্ত চিত্রায়ন অনুভব করতে পারছি। মাদক ও কিশোর গ্যাং এর দৌরাত্ম্যে চাঁদাবাজি, দখল বাজি সবকিছুতে শিশু-কিশোরদের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে দেওলীয়াত্বে পৌঁছে গেছি। শিক্ষামূল্য মেটাতে না পেরে যে সমস্ত শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে তাদেরই বড় অংশ এ সমস্ত অপরাধের সাথে যুক্ত।
শিক্ষা তাদের মৌলিক অধিকার ছিল আর রাষ্ট্র সেটা মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে, ফলে সামাজিক জীবনে, রাষ্ট্রীয় জীবনে এবং ব্যক্তিগত জীবনে এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। তাই সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয়করণ শুধু সময়ের দাবি নয়, রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন।
লেখক: কবি, সংগঠক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক
মুহাম্মদ আমির হোসেন 




















