ঢাকার সড়কে অটোরিকশার উল্টো পথে চলা নিয়ে গেম ‘বাপের রাস্তা’

ঢাকার সড়কে অটোরিকশার উল্টো পথে চলা, টানা হর্ন বাজানো কিংবা পথচারী ও অন্য যানবাহনকে ঝুঁকিতে ফেলা নগরবাসীর কাছে নতুন নয়। সেই চেনা বিশৃঙ্খলাই এবার জায়গা পেয়েছে একটি অনলাইন গেমে। নাম ‘বাপের রাস্তা’। চালকের আসনে বসে খেলোয়াড় যেমন ইচ্ছেমতো ধাক্কা দিতে পারেন, তেমনি ধরা পড়লে জুটে যায় গণপিটুনি।

গেমটির নির্মাতা সফটওয়্যার প্রকৌশলী ওমর ফারুক রিয়াদ। গুগল অ্যানালিটিকসের তথ্য অনুযায়ী, শুক্র ও শনিবার, এই দুই দিনে গেমটি এক লাখের বেশিবার খেলা হয়েছে।

খেলা যেভাবে চলে

আলাদা কোনো অ্যাপ নামাতে হয় না। ওয়েবসাইটে ঢুকে ‘রাস্তায় নামুন’ লেখায় চাপ দিলেই শুরু হয় খেলা। খেলোয়াড় হন একজন অটোরিকশাচালক, আর ঢাকার সড়কে শুরু হয় তাঁর যাত্রা। সামনে পড়া পথচারী বা যানবাহনকে ধাক্কা দেওয়া যায়। প্রতিটি ধাক্কার পর দেখানো হয় ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। বিশৃঙ্খলা যত বাড়ে, ‘জাতীয় ক্ষতি’র পয়েন্টও তত বাড়ে। তবে পরিণতি এড়ানোর উপায় নেই। দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ লোকজন অটোরিকশার পেছনে ধাওয়া করে। ধরে ফেললে শুরু হয় গণধোলাই, আর সেখানেই শেষ খেলা।

হর্নের পাশাপাশি ‘শব্দ বোমা’ নামে একটি অপশনও আছে। তাতে চাপ দিলে শোনা যায় ‘খাইছি তোরে’ কিংবা ‘সানডে মানডে ক্লোজ কইরা দিমু’-র মতো ব্যঙ্গাত্মক সংলাপ। খেলা শেষে ‘দৈনিক যানজট’ নামে এক কাল্পনিক পত্রিকায় ছাপা হয় খেলোয়াড়ের কীর্তি, যেমন ‘ধাক্কা দিয়ে গণধোলাই খেলেন অটোরিকশাচালক’। খেলার ফলকে এভাবে শিরোনামে তুলে ধরাও গেমটির একটি আকর্ষণ।

ঢাকার চেনা পরিবেশ, দুই সপ্তাহের কাজ

ওমর ফারুকের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন। তিনি জানান, গেমটি বানাতে প্রায় দুই সপ্তাহ লেগেছে। তৈরি কোনো গেম ইঞ্জিন ব্যবহার করেননি; পুরোটাই জাভাস্ক্রিপ্ট, এইচটিএমএল ও সিএসএসে লেখা। ত্রিমাত্রিক দৃশ্যের জন্য ব্যবহার হয়েছে থ্রি.জেএস। রাস্তা, দালান ও রিকশাচিত্রও তৈরি হয়েছে কোডের মাধ্যমে।

নকশায় ঢাকার পরিচিত ছাপ ধরার চেষ্টা আছে। রয়েছে রিকশাচিত্র, ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেলের পিলারে আঁকা ছবি, শহীদ মিনার, শাহবাগের ফুলের দোকান, আনন্দ সিনেমা হল। আছে ঢাকার একটি ত্রিমাত্রিক মানচিত্রও। শহরের কিছু চেনা সমস্যাও এসেছে ব্যঙ্গের ছলে, যেমন অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে অটোরিকশা চার্জ দেওয়া, কিংবা গণধোলাই থেকে বাঁচতে পুলিশকে ‘চা-পানি’ দেওয়ার ব্যবস্থা।

নির্মাতা যা বলছেন

ওমর ফারুকের বাসা মহাখালীতে, অফিস মিরপুরে। যাতায়াতের পথে প্রতিদিনই তিনি অটোরিকশার নানা অনিয়ম দেখেন। সেই বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা থেকেই গেম বানানোর ধারণা এসেছে। তিনি বলেন, ‘অটোরিকশাচালকদের প্রতি আমার কোনো বিরূপ মনোভাব নেই। আমি শুধু মনে করি, অটোরিকশা চলাচলে যথাযথ নিয়মকানুন থাকা উচিত এবং কোনো অনিয়ম হলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার।’

তাঁর ভাষ্য, দৈনন্দিন জীবনে মানুষ কিছু সমস্যায় বিরক্ত হয়, পরে একসময় সেগুলোর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই পরিচিত অস্বস্তিগুলোই হাস্যরসের মাধ্যমে সামনে আনতে চান তিনি। ভবিষ্যতে একাধিক খেলোয়াড় একসঙ্গে খেলতে পারবেন, এমন সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনাও আছে।

প্রেক্ষাপট

দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঠিক পরিসংখ্যান কোনো সরকারি দপ্তরে নেই। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সমীক্ষায় সংখ্যাটি প্রায় ৬০ লাখ হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য, এসব অটোরিকশার ৯০ শতাংশই এখন দেশে তৈরি হচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্ট কারও কারও মতে, রাজধানীতে এর সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ লাখ হতে পারে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশি কার্যক্রম ঢিলেঢালা হয়ে পড়ার সুযোগে রাজধানীর সব সড়কে রিকশা চলাচল শুরু করে। স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব রিকশা ও ইজিবাইকের ব্রেকিং সিস্টেম নিরাপদ কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। চালকদের প্রশিক্ষণও নেই। ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা ব্যাপক, ফলে দুর্ঘটনা ও যানজট নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে সাড়া

প্রথমে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গেমটি ভাগ করেন ওমর ফারুক, পরে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে দেন। অল্প সময়েই তা ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে প্রশংসা করেছেন। কেউ কেউ ফেসবুক ও ইউটিউবে সরাসরি খেলার ভিডিও প্রচার করেছেন, কেউ আবার নতুন কী যোগ করা যায়, সে পরামর্শ দিয়েছেন।

সিদ্দিক সাজ্জাদ নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘গেমটি ফেসবুকে পেয়েছি এবং কোনোভাবেই খেলা থামাতে পারছি না।’ পুজা মজুমদারের মন্তব্য, ‘টেসলা ড্রাইভার হলে আসলেই সবাইকে উড়ায়ে দিতে মন চায়।’ তন্ময় দে লিখেছেন, ‘খুবই মজার গেম। এ রকম আরও দরকার।’

সমাজবিজ্ঞানীদের উদ্বেগ

গেমে অটোরিকশাচালককে ধাওয়া করে মারধরের যে চিত্র দেখানো হয়েছে, তা সমাজে সহিংসতাকে উৎসাহিত করতে পারে বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। তাঁদের বক্তব্য, সড়কের অনিয়মের পেছনে চালকদের ব্যক্তিগত দায়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও জবাবদিহির ঘাটতির মতো বৃহত্তর বাস্তবতাও আছে। শুধু ব্যক্তির আচরণের মধ্যে সমস্যাটিকে সীমাবদ্ধ করলে কাঠামোগত কারণগুলো আড়ালে থেকে যায়। অর্থনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না হলে মানুষ জীবনধারণের তাগিদে রিকশাচালনা, হকারি, দিনমজুরির মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ঝুঁকে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, গেমটিতে শুধু সড়কের বিশৃঙ্খলাকে ব্যঙ্গ করা হয়নি, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল একটি শ্রেণির মানুষকে লক্ষ্যবস্তুও করা হয়েছে। এতে শ্রেণিবিদ্বেষ ও নৈরাজ্যকে স্বাভাবিক ভাবার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, আইনের শাসন দুর্বল হলে মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। অপরাধের পরিণতি হিসেবে আইনি ব্যবস্থার বদলে গণধোলাই দেখানো হলে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের মধ্যে আগে থেকেই অপরাধপ্রবণতা আছে, তাঁরা এ ধরনের উপস্থাপনা থেকে একধরনের প্রণোদনা পেতে পারেন।

তবে সড়কে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলায় মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ জমেছে, সেটিও এই গেমের একটি বাস্তবতা বলে মনে করেন অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ইউরোপ জুড়ে বিক্ষোভের আগুন

২৫ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ঢাকার সড়কে অটোরিকশার উল্টো পথে চলা নিয়ে গেম ‘বাপের রাস্তা’

আপডেট সময় ০৭:১৫:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকার সড়কে অটোরিকশার উল্টো পথে চলা, টানা হর্ন বাজানো কিংবা পথচারী ও অন্য যানবাহনকে ঝুঁকিতে ফেলা নগরবাসীর কাছে নতুন নয়। সেই চেনা বিশৃঙ্খলাই এবার জায়গা পেয়েছে একটি অনলাইন গেমে। নাম ‘বাপের রাস্তা’। চালকের আসনে বসে খেলোয়াড় যেমন ইচ্ছেমতো ধাক্কা দিতে পারেন, তেমনি ধরা পড়লে জুটে যায় গণপিটুনি।

গেমটির নির্মাতা সফটওয়্যার প্রকৌশলী ওমর ফারুক রিয়াদ। গুগল অ্যানালিটিকসের তথ্য অনুযায়ী, শুক্র ও শনিবার, এই দুই দিনে গেমটি এক লাখের বেশিবার খেলা হয়েছে।

খেলা যেভাবে চলে

আলাদা কোনো অ্যাপ নামাতে হয় না। ওয়েবসাইটে ঢুকে ‘রাস্তায় নামুন’ লেখায় চাপ দিলেই শুরু হয় খেলা। খেলোয়াড় হন একজন অটোরিকশাচালক, আর ঢাকার সড়কে শুরু হয় তাঁর যাত্রা। সামনে পড়া পথচারী বা যানবাহনকে ধাক্কা দেওয়া যায়। প্রতিটি ধাক্কার পর দেখানো হয় ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। বিশৃঙ্খলা যত বাড়ে, ‘জাতীয় ক্ষতি’র পয়েন্টও তত বাড়ে। তবে পরিণতি এড়ানোর উপায় নেই। দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ লোকজন অটোরিকশার পেছনে ধাওয়া করে। ধরে ফেললে শুরু হয় গণধোলাই, আর সেখানেই শেষ খেলা।

হর্নের পাশাপাশি ‘শব্দ বোমা’ নামে একটি অপশনও আছে। তাতে চাপ দিলে শোনা যায় ‘খাইছি তোরে’ কিংবা ‘সানডে মানডে ক্লোজ কইরা দিমু’-র মতো ব্যঙ্গাত্মক সংলাপ। খেলা শেষে ‘দৈনিক যানজট’ নামে এক কাল্পনিক পত্রিকায় ছাপা হয় খেলোয়াড়ের কীর্তি, যেমন ‘ধাক্কা দিয়ে গণধোলাই খেলেন অটোরিকশাচালক’। খেলার ফলকে এভাবে শিরোনামে তুলে ধরাও গেমটির একটি আকর্ষণ।

ঢাকার চেনা পরিবেশ, দুই সপ্তাহের কাজ

ওমর ফারুকের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন। তিনি জানান, গেমটি বানাতে প্রায় দুই সপ্তাহ লেগেছে। তৈরি কোনো গেম ইঞ্জিন ব্যবহার করেননি; পুরোটাই জাভাস্ক্রিপ্ট, এইচটিএমএল ও সিএসএসে লেখা। ত্রিমাত্রিক দৃশ্যের জন্য ব্যবহার হয়েছে থ্রি.জেএস। রাস্তা, দালান ও রিকশাচিত্রও তৈরি হয়েছে কোডের মাধ্যমে।

নকশায় ঢাকার পরিচিত ছাপ ধরার চেষ্টা আছে। রয়েছে রিকশাচিত্র, ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেলের পিলারে আঁকা ছবি, শহীদ মিনার, শাহবাগের ফুলের দোকান, আনন্দ সিনেমা হল। আছে ঢাকার একটি ত্রিমাত্রিক মানচিত্রও। শহরের কিছু চেনা সমস্যাও এসেছে ব্যঙ্গের ছলে, যেমন অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে অটোরিকশা চার্জ দেওয়া, কিংবা গণধোলাই থেকে বাঁচতে পুলিশকে ‘চা-পানি’ দেওয়ার ব্যবস্থা।

নির্মাতা যা বলছেন

ওমর ফারুকের বাসা মহাখালীতে, অফিস মিরপুরে। যাতায়াতের পথে প্রতিদিনই তিনি অটোরিকশার নানা অনিয়ম দেখেন। সেই বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা থেকেই গেম বানানোর ধারণা এসেছে। তিনি বলেন, ‘অটোরিকশাচালকদের প্রতি আমার কোনো বিরূপ মনোভাব নেই। আমি শুধু মনে করি, অটোরিকশা চলাচলে যথাযথ নিয়মকানুন থাকা উচিত এবং কোনো অনিয়ম হলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার।’

তাঁর ভাষ্য, দৈনন্দিন জীবনে মানুষ কিছু সমস্যায় বিরক্ত হয়, পরে একসময় সেগুলোর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই পরিচিত অস্বস্তিগুলোই হাস্যরসের মাধ্যমে সামনে আনতে চান তিনি। ভবিষ্যতে একাধিক খেলোয়াড় একসঙ্গে খেলতে পারবেন, এমন সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনাও আছে।

প্রেক্ষাপট

দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঠিক পরিসংখ্যান কোনো সরকারি দপ্তরে নেই। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সমীক্ষায় সংখ্যাটি প্রায় ৬০ লাখ হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য, এসব অটোরিকশার ৯০ শতাংশই এখন দেশে তৈরি হচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্ট কারও কারও মতে, রাজধানীতে এর সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ লাখ হতে পারে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশি কার্যক্রম ঢিলেঢালা হয়ে পড়ার সুযোগে রাজধানীর সব সড়কে রিকশা চলাচল শুরু করে। স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব রিকশা ও ইজিবাইকের ব্রেকিং সিস্টেম নিরাপদ কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। চালকদের প্রশিক্ষণও নেই। ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা ব্যাপক, ফলে দুর্ঘটনা ও যানজট নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে সাড়া

প্রথমে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গেমটি ভাগ করেন ওমর ফারুক, পরে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে দেন। অল্প সময়েই তা ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে প্রশংসা করেছেন। কেউ কেউ ফেসবুক ও ইউটিউবে সরাসরি খেলার ভিডিও প্রচার করেছেন, কেউ আবার নতুন কী যোগ করা যায়, সে পরামর্শ দিয়েছেন।

সিদ্দিক সাজ্জাদ নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘গেমটি ফেসবুকে পেয়েছি এবং কোনোভাবেই খেলা থামাতে পারছি না।’ পুজা মজুমদারের মন্তব্য, ‘টেসলা ড্রাইভার হলে আসলেই সবাইকে উড়ায়ে দিতে মন চায়।’ তন্ময় দে লিখেছেন, ‘খুবই মজার গেম। এ রকম আরও দরকার।’

সমাজবিজ্ঞানীদের উদ্বেগ

গেমে অটোরিকশাচালককে ধাওয়া করে মারধরের যে চিত্র দেখানো হয়েছে, তা সমাজে সহিংসতাকে উৎসাহিত করতে পারে বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। তাঁদের বক্তব্য, সড়কের অনিয়মের পেছনে চালকদের ব্যক্তিগত দায়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও জবাবদিহির ঘাটতির মতো বৃহত্তর বাস্তবতাও আছে। শুধু ব্যক্তির আচরণের মধ্যে সমস্যাটিকে সীমাবদ্ধ করলে কাঠামোগত কারণগুলো আড়ালে থেকে যায়। অর্থনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না হলে মানুষ জীবনধারণের তাগিদে রিকশাচালনা, হকারি, দিনমজুরির মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ঝুঁকে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, গেমটিতে শুধু সড়কের বিশৃঙ্খলাকে ব্যঙ্গ করা হয়নি, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল একটি শ্রেণির মানুষকে লক্ষ্যবস্তুও করা হয়েছে। এতে শ্রেণিবিদ্বেষ ও নৈরাজ্যকে স্বাভাবিক ভাবার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, আইনের শাসন দুর্বল হলে মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। অপরাধের পরিণতি হিসেবে আইনি ব্যবস্থার বদলে গণধোলাই দেখানো হলে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের মধ্যে আগে থেকেই অপরাধপ্রবণতা আছে, তাঁরা এ ধরনের উপস্থাপনা থেকে একধরনের প্রণোদনা পেতে পারেন।

তবে সড়কে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলায় মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ জমেছে, সেটিও এই গেমের একটি বাস্তবতা বলে মনে করেন অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী।

Share this news as a Photo Card