নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক সূচি এখনো ঘোষণা না করলেও, আগামী নভেম্বরকে সামনে রেখে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি এখন অনেকটাই দৃশ্যমান। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে এই ধারাবাহিকতা শুরু করার একটি নীতিগত অবস্থানও কমিশনের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে এই আলোচনার পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে—স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বা মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে প্রার্থীর ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা কতটুকু হওয়া উচিত। এই বিতর্ক নতুন নয়, তবে ভোটের দিনক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই এই প্রশ্নে মতামতের ভিন্নতা প্রকট হয়ে উঠছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সম্প্রতি জানিয়েছেন, নভেম্বর মাসকে লক্ষ্য রেখেই কমিশনের সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁর ভাষায়, নির্বাচনের উপযুক্ত মৌসুম হলো নভেম্বর থেকে এপ্রিল—এই ছয় মাস। এই সময়সীমার মধ্যে পূজা, রমজান ও ঈদের মতো ধর্মীয় উৎসব বাদ দিয়েই ভোটের কর্মসূচি সাজানো হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের ভোট আগে করার বিষয়ে কমিশনের একটি নীতিগত সিদ্ধান্তও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এর পাশাপাশি ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণ, সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের তালিকা প্রস্তুত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং নতুন আচরণবিধি প্রণয়নের কাজও একযোগে এগিয়ে চলেছে। পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার—ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের জন্য পৃথক আচরণবিধির খসড়া ইতিমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। এই খসড়ায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধাঁচে পোস্টার নিষিদ্ধ রাখা হলেও সীমিত পরিসরে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ প্রথমবারের মতো রাখা হয়েছে, পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ব্যয় নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার ঠেকাতে নতুন বিধানও যুক্ত হয়েছে।
তবে এই প্রশাসনিক প্রস্তুতির বাইরে যে প্রশ্নটি নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে, তা হলো প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়টি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ রেখেছে। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে নির্বাচন করার জন্য ন্যূনতম স্নাতক বা সমমান শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা উচিত। আলোচনার টেবিলে এইচএসসি বা এমনকি স্নাতকোত্তর পাসের শর্ত জুড়ে দেওয়ার দাবিও উঠে এসেছে বলে জানা যায়, যদিও এই বিষয়ে চূড়ান্ত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন গত ২০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনটি দুই খণ্ডে বিভক্ত—প্রথম খণ্ডে ১৮টি অধ্যায়ে বিশ্লেষণ ও সুপারিশ, দ্বিতীয় খণ্ডে চারটি আইনের খসড়া। শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্নটি একা দাঁড়িয়ে নেই; এটি জড়িয়ে আছে কমিশনের আরও বড় একটি কাঠামোগত সংস্কার-ভাবনার সঙ্গে। কমিশন মনে করছে, বর্তমানে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা মূলত খণ্ডকালীন দায়িত্ব পালন করেন, যা একটি প্রতিষ্ঠানকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই প্রতিটি স্তরে সার্বক্ষণিক নির্বাহী হিসেবে চেয়ারম্যান বা মেয়রকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে, যাঁরা নিজেদের পছন্দমতো তিন থেকে দশজন সদস্য বা কাউন্সিলর নিয়ে একটি ছোট পরিষদ গঠন করতে পারবেন। এই সার্বক্ষণিক ও অপেক্ষাকৃত বড় দায়িত্বের সঙ্গে সংগতি রেখেই শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্নটি সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ।
কমিশনের সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, পদাধিকারবলে সদস্যপদ পাওয়ার প্রথা বাতিল করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সরাসরি ওয়ার্ড সদস্য নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। যাঁরা ভবিষ্যতে চেয়ারম্যান বা মেয়র হতে চান, তাঁদের প্রথমে সদস্য বা কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসার একটি ধাপ পেরোনোর প্রস্তাবও করা হয়েছে, যাতে তৃণমূল পর্যায় থেকে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে এবং জবাবদিহিতা বাড়ে। প্রতিটি স্তরে দুটি অংশ বা কক্ষ—একটি নির্বাহী, অন্যটি আইনসভা প্রকৃতির—রাখার প্রস্তাবও রয়েছে, যা কার্যত পরিষদগুলোকে একেকটি ছোট আকারের সংসদে রূপান্তরিত করবে। এই সামগ্রিক কাঠামোতে যেহেতু আলোচনা, বিতর্ক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব বাড়ছে, তাই শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্নটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং কার্যকারিতার প্রশ্ন হিসেবেই কমিশন বিবেচনা করেছে বলে মনে হয়।
জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে কমিশনের অবস্থানও লক্ষণীয়। বর্তমানে পরোক্ষ পদ্ধতিতে হওয়া এই নির্বাচনকে সরাসরি ভোটের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে জেলা পরিষদকে ‘পরিকল্পনা ইউনিট’ এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদকে ‘বাস্তবায়ন ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। একইসঙ্গে নারীদের অর্থপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিটি স্তরে ৩০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের প্রস্তাবও উঠে এসেছে, যা ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। ব্যয় সাশ্রয়ের প্রশ্নেও কমিশন সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছে—২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচটি স্থানীয় নির্বাচনে প্রায় ২ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা ব্যয় এবং প্রায় ১৯ লাখ ৬২ হাজার জনবল নিয়োগের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কমিয়ে আনার একটি রূপরেখাও প্রতিবেদনে রাখা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো কমিশনের নিজস্ব প্রতিবেদন থেকে নেওয়া বলে জানা যাচ্ছে, তবে প্রকাশনার আগে মূল প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই বিচক্ষণতার কাজ হবে।
তবে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ আর তা আইনে রূপান্তরিত হওয়া—এ দুইয়ের মধ্যে এখনো একটি স্পষ্ট দূরত্ব রয়েছে। নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত জানিয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা অন্য কোনো স্থানীয় সরকার পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা আইন পাস হয়নি। বিদ্যমান আইনে সাধারণ প্রার্থীদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো কড়াকড়ি নেই। অর্থাৎ, বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী কেউ চাইলে নির্দিষ্ট উচ্চ শিক্ষাগত সনদ ছাড়াই প্রার্থী হতে পারবেন। সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হতে হলে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের প্রয়োজন হবে, এবং সে প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় সম্ভাব্য ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নতুন কোনো শিক্ষাগত শর্ত প্রযোজ্য হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই ধারণা করা যায়।
এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে—তাহলে কি আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত কার্যকর হচ্ছে না? এই মুহূর্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক আইনি সংস্কার সম্পন্ন করে নভেম্বরের নির্বাচনে তা প্রয়োগ করা প্রশাসনিকভাবে চ্যালেঞ্জিং। তবে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পরবর্তী কোনো ধাপে—বিশেষত পরবর্তী দফার ভোট বা পরবর্তী মেয়াদে—এই শর্ত যুক্ত হতে পারে কি না, তা এখনো খোলা প্রশ্ন। আচরণবিধি ও নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালার সংশোধনী প্রক্রিয়া চলমান থাকায় আগামী কয়েক মাসে এ বিষয়ে আরও স্পষ্টতা আসতে পারে।
শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্নে জনমতও একরৈখিক নয়। একাংশ মনে করছেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এখন আর আগের মতো সীমিত পরিসরের প্রশাসনিক একক নয়—উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল সেবা প্রদান থেকে শুরু করে জটিল আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সামলাতে হয় জনপ্রতিনিধিদের। তাই ন্যূনতম শিক্ষাগত মান নির্ধারণ করা হলে প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বাড়বে বলে তাঁরা মনে করেন। অন্য একটি পক্ষ আবার সতর্ক করছে, শিক্ষাগত যোগ্যতার কড়াকড়ি আরোপ করা হলে তা তৃণমূল পর্যায়ের বহু অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় নেতৃত্বকে নির্বাচন থেকে বাইরে রেখে দিতে পারে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এখনো সীমিত। এই দ্বন্দ্ব—দক্ষতা বনাম অন্তর্ভুক্তি—সংস্কার আলোচনার একটি কেন্দ্রীয় জায়গা দখল করে আছে।
সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর বিশ্লেষকদের মন্তব্যেও এই প্রশ্নের প্রতিফলন দেখা যায়। বিভিন্ন লেখায় মন্তব্য করা হয়েছে যে, প্রতিবেদনটি গবেষণাভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা হিসেবে প্রশংসিত হলেও, এর বাস্তবায়ন নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির ওপর। অতীতে গঠিত একাধিক কমিশনের সুপারিশ যেভাবে কার্যকর বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি, সেই ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বর্তমান সুপারিশগুলো কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে সতর্ক আশাবাদও প্রকাশ পাচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে।
আইনি দিক থেকেও এই বিতর্ক পুরোপুরি অমীমাংসিত। শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত শর্ত নিয়ে আদালতেও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তবে কোনো নির্দিষ্ট রিট বা আদেশের বিস্তারিত তথ্য এই মুহূর্তে যাচাইযোগ্যভাবে হাতে না থাকায় তার বিস্তারিত বিবরণ এখানে দেওয়া থেকে বিরত থাকা হলো। এ বিষয়ে প্রকাশের আগে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে হালনাগাদ তথ্য যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, নভেম্বরের সম্ভাব্য ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি একদিকে যেমন অনেকটা এগিয়েছে, তেমনি প্রার্থীদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হবে কি না, হলেও তা কবে নাগাদ আইনি রূপ পাবে এবং আসন্ন নাকি পরবর্তী কোনো নির্বাচনচক্রে তা প্রযোজ্য হবে—এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর মিলবে আগামী দিনের আইনি ও প্রশাসনিক অগ্রগতির ওপর নজর রাখলেই। ততদিন পর্যন্ত এই বিতর্ক জনপরিসরে জীবন্ত থাকবে বলেই মনে হচ্ছে—একদিকে দক্ষ ও শিক্ষিত নেতৃত্বের প্রত্যাশা, অন্যদিকে তৃণমূলের বহুত্ববাদী অংশগ্রহণের বাস্তবতা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















