ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে রোববার সকালে গাজীপুর, রাজধানীর মিরপুর ও আশুলিয়ায় একযোগে মাঠে নেমেছেন পোশাকশ্রমিকরা। গাজীপুরে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করা হয়েছে। সেখানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে, আগুন দেওয়া হয়েছে একটি পুলিশ বক্সে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মোতায়েন করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
গাজীপুরে মহাসড়ক অচল
রোববার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে জড়ো হতে শুরু করেন শ্রমিকরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সড়কের দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আটকা পড়ে দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক। দীর্ঘ যানজটে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, সকালে শ্রমিকরা নিজ নিজ কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন। পরে বেতন বাড়ানোর দাবিতে একে একে কারখানা থেকে বেরিয়ে তাঁরা মহাসড়কে অবস্থান নেন। সময় যত গড়িয়েছে, সড়কে মানুষের সংখ্যা তত বেড়েছে। একপর্যায়ে কয়েকজনকে লাঠিসোঁটা হাতে সড়কে দেখা যায়। এর মধ্যেই পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে এবং একটি পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়।
বিক্ষোভের কারণে আশপাশের বেশ কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। একটি প্রতিবেদনে এ সংখ্যা ৮ থেকে ১০টি, অন্যটিতে ১৮টি বলা হয়েছে। দুই তথ্যের এই ফারাক সময়ের হেরফেরের কারণে হতে পারে, তবে নিশ্চিত করা যায়নি।
মহাসড়ক ফাঁকা হয়ে পড়ায় সেখানে দেখা গেছে এক অদ্ভুত দৃশ্য। অবরোধে থাকা শ্রমিকদের কেউ কেউ রাস্তার ওপরই ফুটবল ও ক্রিকেট খেলায় মেতে ওঠেন।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘রোববার সকাল থেকেই শ্রমিকরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়েছেন। এ কারণে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।’
আন্দোলনের এই ধারাবাহিকতা নতুন নয়। এর আগের দিন শনিবার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত একই মহাসড়ক অবরুদ্ধ ছিল। রাতে শ্রমিকরা সড়ক ছেড়ে গেলে চলাচল স্বাভাবিক হয়, কিন্তু রোববার ভোর হতে না হতেই তাঁরা আবার ফিরে আসেন।
বিজিবি মোতায়েন, ৭ নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব
শ্রম অসন্তোষ নিরসন ও আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে গাজীপুরের চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর, কোনাবাড়ী, মৌচাক, নাওজোড় ও ভোগড়া বাইপাস এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে আগামী ৭ নভেম্বর পর্যন্ত এসব এলাকায় দায়িত্ব পালন করবেন বিজিবি সদস্যরা।
একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোতায়েন করা হয়েছে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি। গাজীপুরের শিল্প পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে সদস্যসংখ্যা আরও বাড়ানো হতে পারে।
মিরপুরে সড়ক অবরোধ
রাজধানীর মিরপুরেও একই দাবিতে সকাল আটটার দিকে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা ১০ নম্বর মোড়ে সড়ক অবরোধ করেন। এতে ওই এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়।
পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন জানান, মিরপুর ১০ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় শ্রমিকরা সকালেও নেমেছেন। সড়ক অবরোধ করে তাঁরা নিজেদের দাবি জানাচ্ছেন। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
শনিবারও মিরপুরে একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত ১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে শ্রমিকরা মিরপুর ১ নম্বরের শাহ আলী এলাকায় জড়ো হন। সেখানে কয়েকটি মার্কেট ও পোশাক কারখানায় ভাঙচুর হয়। নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে হাতাহাতি, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। কালশী এলাকায় একটি কারখানায় ইটপাটকেল ছোড়েন শ্রমিকরা।
আশুলিয়ায় ভিন্ন চিত্র
আশুলিয়ায় পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত। সেখানে নিউ এইজ, আল মুসলিম ও ট্রাউজার লাইন নামের তিনটি কারখানার শ্রমিকরা সকালে কাজ বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরেই অবস্থান নেন। পরে নিউ এইজ ও আল মুসলিমের শ্রমিকরা কাজে ফেরেন। বর্তমানে একটি কারখানায় কাজ বন্ধ আছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল থেকেই আশুলিয়ার বিভিন্ন সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছেন। কারখানাগুলোর সামনে রয়েছে সতর্ক পাহারা। বেশির ভাগ কারখানায় শ্রমিকরা স্বাভাবিকভাবেই প্রবেশ করেছেন।
শ্রমিকদের শান্ত থাকা এবং কোনো কারখানায় হামলা বা ভাঙচুর না করার অনুরোধ জানিয়ে অটোরিকশা ও পুলিশের গাড়িতে মাইক লাগিয়ে প্রচার চালাচ্ছে পুলিশ। সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করছে বলেও শ্রমিকদের আশ্বস্ত করা হচ্ছে। পুলিশ বলছে, এ বিষয়ে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক।
শিল্প পুলিশ আশুলিয়া জোনের পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম বলেন, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। একটি কারখানা ছাড়া বাকি কারখানায় স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে। তিনি আরও জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পল্লী বিদ্যুৎ-সংলগ্ন এলাকায় শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করেছেন এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
মজুরি বোর্ড ও সরকারের অবস্থান
আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে রোববারই বোর্ড গঠন করা হবে। শনিবার রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, এ অবস্থায় শ্রমিকদের আন্দোলনে থাকার কোনো কারণ নেই।
তবে এই ঘোষণার পরও বিভিন্ন কারখানায় অসন্তোষ কমেনি। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, মৌচাক ও সফিপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ চলছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 











