ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট আর গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। বুথফেরত জরিপের আভাস অনুযায়ী, সরকার গঠনের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো পক্ষই পাচ্ছে না।
দেশটির দুটি সম্প্রচারমাধ্যম ‘কান ১১’ ও ‘চ্যানেল ১৩’ বুথফেরত জরিপের যে ফল প্রকাশ করেছে, তাতে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট এবং আইজেনকোটের মধ্যপন্থী জোট, দুই পক্ষই ৫১টি করে আসন পেতে যাচ্ছে। তৃতীয় একটি গণমাধ্যমের তথ্যে অবশ্য নেতানিয়াহুর জোট সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছে। অথচ ক্ষমতায় যেতে পার্লামেন্ট ‘নেসেটে’ কমপক্ষে ৬১টি আসন দরকার, যা কোনো জোটই নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে সরকার কীভাবে গঠিত হবে এবং শেষ পর্যন্ত কারা ক্ষমতায় আসবে, তা নিয়ে নানা জল্পনা চলছে।
কোন দল কতটা এগিয়ে
জরিপের ফল বলছে, জোটগতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি নেসেটে একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন পেতে যাচ্ছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দলটি প্রায় ২৯টি আসনে জয়ের পথে। প্রাথমিক জরিপের পর দলটির ধারণা ছিল, বড়জোর ২৭টি আসন পাওয়া যাবে। তাই এই ফলে তারা উচ্ছ্বসিত।
আইজেনকোটের ‘ইয়াশার পার্টি’ এগিয়ে আছে ২০টির মতো আসনে। নেতানিয়াহুর মিত্র উগ্র ডানপন্থী দল ‘ওতজমা ইয়েহুদিত’ পেতে যাচ্ছে সাতটি আসন। এসব রক্ষণশীল দলের চেয়ে এগিয়ে আছে আরবদের নেতৃত্বাধীন দলগুলো। তারা ১৭টির মতো আসনে এগিয়ে, যা এখন পর্যন্ত তাদের ‘সেরা ফল’ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
গণনা চলছে, চূড়ান্ত ফলে লাগবে সময়
সরকারিভাবে ভোট গণনা এখনো চলছে। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ভোর চারটা নাগাদ প্রায় ২৫ শতাংশ ভোটের গণনা শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। সামরিক বাহিনীতে কর্মরত প্রায় ছয় লাখ ভোটার ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন, যা মোট ভোটের প্রায় ১০ শতাংশ। এই ভোট বৃহস্পতিবারের আগে পুরোপুরি গণনা হবে না। তাই চূড়ান্ত ফল পেতে আরও সময় লাগতে পারে। নির্বাচন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার ভোট পড়েছে প্রায় ৭৭ দশমিক সাত শতাংশ, যা ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ।
নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট কী বললেন
নেতানিয়াহু বলেছেন, এখনই কিছু বলা তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে। তিনি সরকারিভাবে প্রকাশিত ফলের অপেক্ষায় আছেন। তাঁর বিশ্বাস, এবারও তাঁরা জিতবেন, আর জিতলে একটি ‘শক্তিশালী ডানপন্থী’ জাতীয় সরকার গঠন করবেন। লিকুদ পার্টির এই নেতার মন্তব্য, ‘আরব সমর্থনে’ টিকে থাকা কোনো সরকার ইসরায়েল চালাতে পারে না। তিনি আরও বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে ‘ইরানের হুমকি চিরতরে নির্মূল করার একটি অনন্য সুযোগ’ ইসরায়েলের সামনে রয়েছে।
অন্যদিকে দলীয় কার্যালয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে আইজেনকোট বলেন, “আমরা ইতিহাস তৈরি করেছি।” তাঁর ভাষ্য, মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে এবং নেতানিয়াহুর ‘ব্যর্থ শাসনের’ বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। তিনি চূড়ান্ত ফলের অপেক্ষায় থাকার আহ্বান জানান। নেতানিয়াহুকে মানুষের অনাস্থা মেনে রাজনীতি থেকে বিদায় নিতে বলেন। এত বড় ভোটার উপস্থিতির পর আবার নির্বাচন দেওয়া হবে মারাত্মক ভুল, এমন মন্তব্যও করেন তিনি। আইজেনকোট জানান, সবাইকে নিয়ে একটি দায়িত্বশীল জায়োনিস্ট সরকার গঠনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। তাঁর সরকার সবার জন্য সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক করবে এবং হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করতে কাজ করবে।
সরকার গঠনের প্রক্রিয়া
ইসরায়েলের নির্বাচনী ইতিহাসে কোনো দল কখনো এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, তাই সব সময়ই জোট সরকার গঠিত হয়েছে। গণনা শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি সেই দলের নেতাকে ডেকে পাঠান, যাঁর সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি মনে করেন। জোট গঠনের জন্য ওই নেতা ২৮ দিন সময় পান। প্রয়োজনে ১৪ দিন বাড়ানোর অনুরোধও করা যায়। তিনি ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রপতি দ্বিতীয় সম্ভাবনাময় দলকে সুযোগ দিতে পারেন। সেটিও না হলে নেসেটের সদস্যরা তৃতীয় কোনো নেতাকে চেষ্টা করতে দেওয়ার অনুরোধ জানাতে পারেন। তৃতীয় চেষ্টাও ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচনের বিধান রয়েছে।
২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইসরায়েলে পাঁচটি আলাদা নির্বাচন হয়েছিল, কারণ দলগুলো বারবার জোট গঠনে হিমশিম খেয়েছে। ২০২২ সালের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ১২০টি আসনের মধ্যে ৩২টিতে জিতে বৃহত্তম দল হয়। পরে কয়েকটি কট্টর ডানপন্থী দলের সঙ্গে জোট করে তিনি ৬৪ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান।
কে এই আইজেনকোট
গাদি আইজেনকোট ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান এবং ‘ইয়াশার পার্টি’র শীর্ষ নেতা। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি নেতানিয়াহু সরকারের অধীনে সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ ছিলেন। রাজনীতিতে তিনি তুলনামূলক নতুন। ২০২২ সালে ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টির হয়ে নেসেটের সদস্য হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে আসেন। আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে পরে সেই দল ছাড়েন। গত বছর বিরোধী দলের প্রধান নেতাদের থেকে আলাদা হয়ে নিজের মধ্যপন্থী দল ‘ইয়াশার’ (অর্থ ‘সোজা’ বা ‘সৎ’) গড়ার পর থেকে তিনি নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিপক্ষ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেতানিয়াহু দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত, যা তিনি অস্বীকার করেছেন। ২০২৩ সালের সাতই অক্টোবরের হামলা মোকাবিলায় তাঁর ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। বিচার বিভাগে সংস্কারের বিতর্কিত উদ্যোগ ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
আইজেনকোটের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ মাস্টার সার্জেন্ট গাল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে উত্তর গাজায় এক বিস্ফোরণে নিহত হন। সাতই অক্টোবর হামাসের হাতে বন্দি দুই ইসরায়েলি জিম্মির দেহাবশেষ উদ্ধারের অভিযানের সময় তিনি সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ওই হামলার পর আইজেনকোট অন্য বিরোধী নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। ২০২৪ সালের জুনে তিনি পদত্যাগ করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিত করতে নেতানিয়াহু আরও দ্রুত পদক্ষেপ নেননি। নেতানিয়াহু ও তাঁর মন্ত্রিসভাকে জবাবদিহির আওতায় আনা তাঁর করণীয় তালিকার অন্যতম।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















