বজ্রপাত থেকে গ্রামবাসীকে বাঁচাতে দিনমজুর মান্নানের এক যুগের লড়াই

নিজের জমি নেই, তবু গড়েছেন তালবাগান! 

নিজের কোনো জমি নেই, নেই আর্থিক সামর্থ্য। জীবনের ৬৮টি বছর কেটেছে দিনমজুরি করে। তবুও স্বপ্ন দেখেছেন সবুজে ঘেরা একটি বাগান গড়ে তোলার। সেই স্বপ্ন পূরণে নিজের শ্রম, সময় আর ভালোবাসা দিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রোপণ করে চলেছেন তালবীজ। তাঁর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার রায়দৌলতপুর গ্রামের একটি সড়কের দুই পাশ আজ সারি সারি তালগাছে শোভিত।বলছি, গ্রামের ৬৮ বছর বয়সী দিনমজুর বৃক্ষপ্রেমিক আব্দুল মান্নান মল্লিক কথা। বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে এবং গ্রামের মানুষের উপকারের আশায় তিনি শুরু করেছিলেন এই উদ্যোগ। ব্যক্তিগত কোনো লাভের প্রত্যাশা নয়, বরং গাছগুলো বড় হবে, ফল দেবে, মানুষ উপকৃত হবে—এটাই তাঁর আনন্দ।হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া মান্নান দারিদ্র্যের কারণে পড়ালেখার সুযোগ পাননি। ছোটবেলা থেকেই অন্যের বাড়ি, জমি ও খেতখামারে দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তিন মেয়ে ও এক ছেলের জনক তিনি। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলে আলাদা সংসার করছেন। বর্তমানে স্ত্রীকে নিয়ে ছোট্ট বসতভিটায় তাঁর বসবাস। দিনমজুরির সামান্য আয়েই চলে দুজনের সংসার।এত অভাব-অনটনের মধ্যেও প্রকৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসায় ভাটা পড়েনি। ছোটবেলা থেকেই বাগান করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু নিজের জমি না থাকায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। একসময় বিকল্প পথ খুঁজে নেন তিনি। গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে তালের বীজ সংগ্রহ করে বাড়ির পাশের পাকা সড়কের দুই পাশে রোপণ শুরু করেন। এরপর থেকে দিনমজুরির ফাঁকে ফাঁকে বীজ রোপণ ও চারার পরিচর্যাই হয়ে ওঠে তাঁর নেশা।প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে তাঁর এই প্রচেষ্টা চলছে। একসময় রোপণ করা প্রায় ৫০০ তালগাছ বেড়ে উঠেছিল। তবে সড়কের পাশের জমিতে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কায় জমির মালিকেরা এর মধ্যে প্রায় ২০০টি গাছ কেটে ফেলেছেন। বর্তমানে ওই সড়কের দুই পাশে ১৩০টি বড় তালগাছসহ অসংখ্য ছোট-বড় চারা রয়েছে। এসব গাছের পরিচর্যা করতে চান মান্নান, কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে সব সময় তা সম্ভব হয়ে ওঠে না।সরেজমিনে দেখা যায়, বয়সের ভার শরীরে থাকলেও তালগাছগুলোর পরিচর্যায় ব্যস্ত আবদুল মান্নান মল্লিক। গাছগুলোকে নিজের সন্তানের মতোই আগলে রাখেন তিনি।মান্নান বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাগান করার শখ ছিল। জমি না থাকায় নিজের বাগান করার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তাই গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে তালের বীজ সংগ্রহ করে সড়কের দুই পাশে রোপণ শুরু করি। গাছগুলো বড় হবে, ফল ধরবে, আশপাশের গ্রামের মানুষ সেই ফল খাবে—এতেই আমার আনন্দ। এই গাছের মালিকানা নিয়ে আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই।স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর এই উদ্যোগ কেবল একটি সড়কের সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে সচেতনতারও দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্য গাছ লাগিয়ে চলেছেন মান্নান। হয়তো তাঁর নামের পাশে বড় কোনো পরিচয় নেই, নেই বিত্ত-বৈভব; কিন্তু গ্রামের সড়কের দুই পাশে বেড়ে ওঠা তালগাছগুলোই একদিন তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার স্মারক হয়ে থাকবে।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

গাজীপুরে সংঘর্ষের মাঝে পড়ে তৌফিকের মৃত্যু, উঠছে নানা প্রশ্ন

০৪ নভেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

বজ্রপাত থেকে গ্রামবাসীকে বাঁচাতে দিনমজুর মান্নানের এক যুগের লড়াই

নিজের জমি নেই, তবু গড়েছেন তালবাগান! 

আপডেট সময় ০৮:০৪:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
নিজের কোনো জমি নেই, নেই আর্থিক সামর্থ্য। জীবনের ৬৮টি বছর কেটেছে দিনমজুরি করে। তবুও স্বপ্ন দেখেছেন সবুজে ঘেরা একটি বাগান গড়ে তোলার। সেই স্বপ্ন পূরণে নিজের শ্রম, সময় আর ভালোবাসা দিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রোপণ করে চলেছেন তালবীজ। তাঁর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার রায়দৌলতপুর গ্রামের একটি সড়কের দুই পাশ আজ সারি সারি তালগাছে শোভিত।বলছি, গ্রামের ৬৮ বছর বয়সী দিনমজুর বৃক্ষপ্রেমিক আব্দুল মান্নান মল্লিক কথা। বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে এবং গ্রামের মানুষের উপকারের আশায় তিনি শুরু করেছিলেন এই উদ্যোগ। ব্যক্তিগত কোনো লাভের প্রত্যাশা নয়, বরং গাছগুলো বড় হবে, ফল দেবে, মানুষ উপকৃত হবে—এটাই তাঁর আনন্দ।হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া মান্নান দারিদ্র্যের কারণে পড়ালেখার সুযোগ পাননি। ছোটবেলা থেকেই অন্যের বাড়ি, জমি ও খেতখামারে দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তিন মেয়ে ও এক ছেলের জনক তিনি। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলে আলাদা সংসার করছেন। বর্তমানে স্ত্রীকে নিয়ে ছোট্ট বসতভিটায় তাঁর বসবাস। দিনমজুরির সামান্য আয়েই চলে দুজনের সংসার।এত অভাব-অনটনের মধ্যেও প্রকৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসায় ভাটা পড়েনি। ছোটবেলা থেকেই বাগান করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু নিজের জমি না থাকায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। একসময় বিকল্প পথ খুঁজে নেন তিনি। গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে তালের বীজ সংগ্রহ করে বাড়ির পাশের পাকা সড়কের দুই পাশে রোপণ শুরু করেন। এরপর থেকে দিনমজুরির ফাঁকে ফাঁকে বীজ রোপণ ও চারার পরিচর্যাই হয়ে ওঠে তাঁর নেশা।প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে তাঁর এই প্রচেষ্টা চলছে। একসময় রোপণ করা প্রায় ৫০০ তালগাছ বেড়ে উঠেছিল। তবে সড়কের পাশের জমিতে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কায় জমির মালিকেরা এর মধ্যে প্রায় ২০০টি গাছ কেটে ফেলেছেন। বর্তমানে ওই সড়কের দুই পাশে ১৩০টি বড় তালগাছসহ অসংখ্য ছোট-বড় চারা রয়েছে। এসব গাছের পরিচর্যা করতে চান মান্নান, কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে সব সময় তা সম্ভব হয়ে ওঠে না।সরেজমিনে দেখা যায়, বয়সের ভার শরীরে থাকলেও তালগাছগুলোর পরিচর্যায় ব্যস্ত আবদুল মান্নান মল্লিক। গাছগুলোকে নিজের সন্তানের মতোই আগলে রাখেন তিনি।মান্নান বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাগান করার শখ ছিল। জমি না থাকায় নিজের বাগান করার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তাই গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে তালের বীজ সংগ্রহ করে সড়কের দুই পাশে রোপণ শুরু করি। গাছগুলো বড় হবে, ফল ধরবে, আশপাশের গ্রামের মানুষ সেই ফল খাবে—এতেই আমার আনন্দ। এই গাছের মালিকানা নিয়ে আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই।স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর এই উদ্যোগ কেবল একটি সড়কের সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে সচেতনতারও দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্য গাছ লাগিয়ে চলেছেন মান্নান। হয়তো তাঁর নামের পাশে বড় কোনো পরিচয় নেই, নেই বিত্ত-বৈভব; কিন্তু গ্রামের সড়কের দুই পাশে বেড়ে ওঠা তালগাছগুলোই একদিন তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার স্মারক হয়ে থাকবে।

Share this news as a Photo Card