কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে নতুন জোয়ার, গুগল-মেটা-টিকটকের বিনিয়োগ আগ্রহ
দেশের প্রথম হাই-টেক পার্ক হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে সম্প্রতি নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি জানিয়েছেন, বিশ্বের প্রযুক্তি খাতের অন্যতম বড় নাম গুগল, মেটা তথা ফেসবুক এবং টিকটকের কাছ থেকেও বিনিয়োগের প্রস্তাব পাওয়া গেছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) সরেজমিনে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক ঘুরে দেখতে যান মন্ত্রী। এ সময় তিনি প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের সম্ভাবনা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের বর্তমান চিত্র এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ নিয়ে খোঁজখবর নেন। সরকার ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা কতটা এগিয়েছে, তা যাচাই করাই ছিল এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য। কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি পার্কের ছয়-সাতটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখেন।
নির্বাচনি অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন
তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে ঘিরে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি ছিল। ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সফটওয়্যার, অ্যাপ ও হার্ডওয়্যার শিল্পে বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যাওয়া এবং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ধারণাকে সামনে রেখে দেশীয় পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতাযোগ্য করে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সেখানে।
মন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘জাতীয় সবুজ শিল্পনীতি’ কার্যকর করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা এআই হাব গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ চলছে। একইসঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য কর ও শুল্কসংক্রান্ত নানা প্রণোদনার প্রস্তাব তৈরির কাজও এগিয়ে চলেছে।
দুই দশকের যাত্রা
কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর ২০০২ সালে দেশে প্রথমবারের মতো একটি আইসিটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। সেই নীতিতে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তোলা, সফটওয়্যার শিল্পের প্রসার এবং প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল স্থাপনের ঘোষণা ছিল।
সেই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে প্রায় দুইশ একরের বেশি জমিতে দেশের প্রথম হাই-টেক পার্ক গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে আরও প্রায় একশ একর জমি যুক্ত হলে পার্কের মোট আয়তন দাঁড়ায় সাড়ে তিনশ একরের বেশি জায়গায়। মৌলিক অবকাঠামো নির্মাণ শেষে ধীরে ধীরে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জমি ও প্রস্তুত জায়গা বরাদ্দ দেওয়া শুরু হয়, যার মধ্য দিয়ে সফটওয়্যার, অ্যাপ ও হার্ডওয়্যার শিল্পের বিকাশের পথ তৈরি হয়।
বিনিয়োগের হালনাগাদ চিত্র
মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত পঁচাশিটি প্রতিষ্ঠানকে পার্কে জমি বা কর্মস্থানের জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে সাতটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান। এই পঁচাশিটির মধ্যে চল্লিশটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেছে। আটাশটি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ চলমান, আর সতেরোটি প্রতিষ্ঠান শিগগিরই নির্মাণ শুরু করবে বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে পার্কে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় এক দশমিক ছয়শ ছত্রিশ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাস্তবে ইতোমধ্যে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় দুইশ তিরাশি মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় তিন হাজার দুইশ পঁয়তাল্লিশ কোটি টাকার সমান। অন্যদিকে সরকার নিজে মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নে পাঁচশ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। মন্ত্রী মনে করেন, ব্যবসায়িক পরিবেশ সঠিকভাবে গড়ে তোলা গেলে এই পার্ক থেকে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।
বিদেশি বিনিয়োগের প্রসঙ্গে তিনি জানান, চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সাতটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ছয়শ ঊনত্রিশ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক শুধু দেশীয় উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, বরং বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন, সংযোজন, গবেষণা ও রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাব হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
কী উৎপাদিত হচ্ছে পার্কে
বর্তমানে পার্কের ভেতরে তিনটি প্রতিষ্ঠান মোবাইল ফোন তৈরি করছে, যার মধ্যে অনর ও শাওমির মতো ব্র্যান্ড রয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠান ল্যাপটপ উৎপাদন করছে, একটি প্রতিষ্ঠান এটিএম ও নগদ অর্থ পুনর্ব্যবহারকারী যন্ত্র তৈরি করছে। ছয়টি প্রতিষ্ঠান ফাইবার অপটিক্যাল কেবল তৈরি করছে এবং হুন্দাইসহ তিনটি প্রতিষ্ঠান গাড়ি উৎপাদনে যুক্ত।
এসবের বাইরে আইওটি যন্ত্র, রাউটার, সুইচ, সিসিটিভি, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, রেফ্রিজারেটর, গৃহস্থালি সামগ্রী, কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন, কিওস্ক এবং বিভিন্ন ধরনের এটিএম মেশিনও এখানে উৎপাদিত হচ্ছে। দুটি প্রতিষ্ঠান এখন ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠার কাজ করছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত এআই ডেটা সেন্টার প্রকল্পে গুগল, মেটা ও টিকটকসহ বিশ্বের একাধিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।
সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ
সম্ভাবনার পাশাপাশি পার্কটির সামনে বেশ কিছু বাধাও রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন মন্ত্রী। অসম্পূর্ণ মৌলিক অবকাঠামো দ্রুত শেষ করা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সিসিটিভি নজরদারি শক্তিশালী করা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য দ্বৈত সংযোগ লাইন স্থাপন, গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক ও সামাজিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সেবায় নিয়োজিত জনবলের ঘাটতি পূরণের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
এর বাইরে বিনিয়োগকারীদের জন্য শুল্ক ভবনের সেবা চালু করা, অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে সমন্বিত প্রকল্প নেওয়া, নিয়মিত রেল যোগাযোগ চালু এবং বিদ্যমান বিধিবিধান সংশোধনের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
প্রস্তাবিত প্রণোদনা
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে মন্ত্রী জানান, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ও করে ছাড়, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় সেবায় ভ্যাট সুবিধা এবং হাই-টেক পণ্যের তালিকা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। শুধু উৎপাদনকারী নয়, সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এসব সুবিধার আওতায় আনার কথা ভাবা হচ্ছে।
স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে কাঁচামালে শুল্ক-কর রেয়াত এবং স্থিতিশীল আয়কর সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও তৈরি হচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, সৌর ব্যাটারি, ইউপিএস ব্যাটারি এবং ই-বাইকের মতো নতুন প্রযুক্তি খাতের জন্য আলাদা প্রণোদনা কাঠামো তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী মনে করেন, অবকাঠামোগত সক্ষমতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমেয় নীতিগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগের গতি আরও বাড়বে। এর ফলে দেশে প্রযুক্তিপণ্যের স্থানীয় উৎপাদন বাড়বে, আমদানিনির্ভরতা কমবে, রপ্তানি বাড়বে এবং উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের লক্ষ্য
মন্ত্রী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও হাই-টেক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র তৈরি করা, শিল্প-প্রতিষ্ঠান-একাডেমিয়া-সরকারের মধ্যে সংযোগ স্থাপন এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুততম সময়ে ওয়ান-স্টপ সেবা নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিনিয়োগ আকর্ষণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশকে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ হাবে রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ চলছে বলে তিনি জানান।
মন্ত্রীর এই পরিদর্শন দেশের হাই-টেক শিল্পের বর্তমান অগ্রগতি খতিয়ে দেখা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, উৎপাদন ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ সময় কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ফজলুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সফরের শুরুতে মন্ত্রী কালিয়াকৈরে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশের একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবেও যোগ দেন।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















