সিলেট টেস্টের তৃতীয় দিনটা ছিল তাওহীদ হৃদয়ের। ২৪২ রানে অপরাজিত থেকে একাই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছেন তিনি। তাঁর এই ইনিংসের ওপর ভর করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ৩০ রানের লিড পেয়েছে বাংলাদেশ।
দিনের শুরুটা অবশ্য মোটেও স্বস্তির ছিল না। ১৩৮ রানে পাঁচ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়েছিল স্বাগতিকেরা। তৃতীয় দিনের প্রথম সেশনে ১৮৪ রানে সপ্তম উইকেটের পতনের পর দ্রুত গুটিয়ে যাওয়ার শঙ্কাও তৈরি হয়। কিন্তু উইকেটের একটি প্রান্ত আগলে রাখেন হৃদয়। লাঞ্চের আগেই তুলে নেন টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি। বিরতিতে যাওয়ার সময় বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৭ উইকেটে ২০৫ রান। তখনো দলটি পিছিয়ে ছিল ১৫১ রানে।
দ্বিতীয় সেশনে অষ্টম উইকেটে তাইজুল ইসলামকে নিয়ে প্রতিরোধ আরও দৃঢ় করেন হৃদয়। এই জুটিতে ১৬৭ বলে আসে ১১৭ রান। স্টাম্পিংয়ের শিকার হয়ে তাইজুল ২২ রানে ফিরলে ভাঙে সেই জুটি। রিপ্লেতে দেখা যায়, তাঁর পা ছিল লাইনের ওপরে। টেস্টে অষ্টম উইকেটে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের জুটি। এই তালিকায় সবার ওপরে আছে মুশফিকুর রহিম ও মেহেদী হাসান মিরাজের ১৪৪ রানের জুটি, যা এসেছিল ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। হৃদয় ও তাইজুলের জুটি অষ্টম উইকেটে বাংলাদেশের তৃতীয় শতরানের জুটিও।
এর আগে ৮৫তম ওভারে সিলসের একটি শর্ট বল পুল করতে গিয়ে পাঁজরে আঘাত পান হৃদয়। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে পড়ে যান তিনি, চোখেমুখে ছিল যন্ত্রণার ছাপ। তবে পরের বলেই সিলস আবার বাউন্সার করলে হৃদয় পুল খেলেন, আর এবার টাইমিংও ঠিকঠাক হয়। দ্বিতীয় সেশন শেষে তিনি অপরাজিত ছিলেন ১৯০ রানে। সঙ্গী ছিলেন তাসকিন আহমেদ। তখন বাংলাদেশের স্কোর ৮ উইকেটে ৩১৮, আর ব্যবধান ৩৮ রানের।
তৃতীয় সেশনে ডাবল সেঞ্চুরির পথে হৃদয়কে সঙ্গ দেন তাসকিন। ৯৮.৪ ওভারে বাংলাদেশের রান যখন ৩২৪, ডাবল সেঞ্চুরি থেকে তখন ৬ রান দূরে ছিলেন হৃদয়। ১০১ ওভারে ৩৪০ রানের মাথায় সেই মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলেন তিনি। টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিকেই ডাবলে রূপ দিলেন তিনি। বাংলাদেশের হয়ে এমন কীর্তি এই প্রথম। ডাবল সেঞ্চুরি করা চতুর্থ বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানও এখন তিনি। এর আগে এই কীর্তি ছিল মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসানের।
একের পর এক রেকর্ডও ভেঙেছেন হৃদয়। ২২৩ রানে পৌঁছে ছাড়িয়ে যান মুশফিকের ২১৯ রান। এর মাধ্যমে টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের মালিক এখন তিনিই। বাংলাদেশের হয়ে প্রথম সেঞ্চুরির পর সবচেয়ে বড় ইনিংসের রেকর্ডও ছিল আগে মুমিনুল হকের, ১৮১ রানের। সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের টেস্ট ইতিহাসেও এটি এখন সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। ১৭২ রানে পৌঁছানোর সময়ই তিনি সেখানকার আগের সব ইনিংস ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন।
ছক্কার হিসাবেও আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন হৃদয়। তাঁর ইনিংসে ছক্কা ১১টি। বাংলাদেশের হয়ে টেস্টের এক ইনিংসে এটিই সর্বোচ্চ। বিশ্বে এক ইনিংসে এর চেয়ে বেশি, অর্থাৎ ১২টি করে ছক্কা মেরেছেন ওয়াসিম আকরাম ও যশস্বী জয়সোয়াল। হৃদয়ের মতো ১১টি ছক্কা মেরেছেন আরও ছয়জন।
শেষ পর্যন্ত তাসকিন আউট হলে ৩৮৬ রানে শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস। চোটের কারণে ব্যাটিংয়ে নামতে পারেননি সাদমান ইসলাম। ফলে হৃদয় অপরাজিত থেকে যান ২৪২ রানে। হৃদয় যখন ব্যাটিংয়ে আসেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখন এগিয়ে ছিল। হাসান মাহমুদ উইকেটে আসার সময়ও সফরকারীদের লিড ছিল ১৭৭ রানের, আর শেষ ব্যাটসম্যান তাসকিনের নামার সময় ৫৫ রানের। শেষ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৫৬ রানের জবাবে ৩০ রানে এগিয়ে থাকল বাংলাদেশ।
পরিসংখ্যানে হৃদয়ের ইনিংসের ওজনটা আরও পরিষ্কার হয়। দলের ৩৮৬ রানের ৬২.৬৯ শতাংশই এসেছে তাঁর ব্যাট থেকে। পূর্ণাঙ্গ ইনিংসে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের এটিই সর্বোচ্চ অবদান। এর আগে সর্বোচ্চ ছিল ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪৩ রানে অলআউট হওয়া ইনিংসে লিটন দাসের ২৫ রান, যা ছিল দলীয় রানের ৫৮.১৩ শতাংশ। এই ইনিংসে হৃদয় ছাড়া আর কেউ ৩৫ রানও করতে পারেননি। মুশফিক করেছেন ৩৪, তাইজুল ২২, নাজমুল ১৮, মিরাজ ও তানজিদ ১৬ করে, তাসকিন ১২ এবং লিটন ৮।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের মধ্যে ওয়ারিক্যান ১০৪ রানে নিয়েছেন ৪ উইকেট। সিলস ৫৮ রানে ২টি এবং চেজ ৬৬ রানে, জোসেফ ৮২ রানে ও গ্রিভস ১০ রানে নিয়েছেন ১টি করে উইকেট।
দিনের শেষ ভাগে ব্যাটিংয়ে নেমে ৪ ওভারে বিনা উইকেটে ৭ রান তুলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্রিজে আছেন কিং (৫*) ও সিলভা (২*)। তাসকিন ৭ রানে ০ উইকেট পেয়েছেন। হাসান মাহমুদ ও তাইজুল এখনো কোনো রান দেননি। ৩০ রানে পিছিয়ে থাকা সফরকারীরা এখনো ২৩ রানে পিছিয়ে। চতুর্থ দিনে নতুন করে লড়াইয়ে ফেরার চেষ্টা করবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আর সিলেটের বাকি দিনগুলোয় বাংলাদেশের ভরসা থাকবে বোলারদের ওপর।
ক্রীড়া ডেস্ক : 



















