এইচএসসি পরীক্ষার ভুল প্রশ্ন: ক্ষতিপূরণ কি শুধুই নম্বরে?
চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের দুটি প্রশ্নে ভুল ধরা পড়ার পর দেশজুড়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরীক্ষা সূচির সমন্বয়হীনতার পর প্রশ্নপত্রের এই বড় ত্রুটি দেশের পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
আন্দোলনের মুখে সরকার প্রশ্নপত্রে ভুলের বিষয়টি স্বীকার করেছে। সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ঘোষণা দিয়েছেন, ভুল হওয়া ওই দুটি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। একই সাথে প্রশ্নপত্র পরিমার্জনের (মডারেশন) সাথে যুক্ত চার শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—অনাকাঙ্ক্ষিত এই ভুলের সমাধান কি কেবলই নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া? পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের যে তীব্র মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিভ্রান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ কীভাবে সম্ভব?
কঠোর নজরদারি, তবুও গলদ কোথায়?
বাংলাদেশে এসএসসি ও এইচএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল, কঠোর ও বহুস্তরবিশিষ্ট। পরীক্ষা শুরু হওয়ার প্রায় এক বছর আগে থেকেই এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডের তালিকাভুক্ত অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মধ্য থেকে চারজনকে আলাদাভাবে প্রশ্ন তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আরও চারজন শিক্ষক সেই প্রশ্নগুলো পরিমার্জন বা মডারেশন করেন।
এরপর লটারির মাধ্যমে চূড়ান্ত সেট নির্বাচন করে বিজি প্রেসে কঠোর নিরাপত্তায় ছাপানো হয়। প্রশ্নপ্রণেতা ও মডারেটরদের এই পুরো সময়ে বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। প্রশ্নপত্র পরীক্ষার্থীর হাতে পৌঁছানোর আগে এতগুলো নিরাপত্তা স্তর পার হওয়ার পরও কীভাবে এমন মৌলিক ভুল রয়ে গেল, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সংকট দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
শিক্ষামন্ত্রী এক বক্তব্যে জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এই প্রশ্নপত্র তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে রাজনৈতিকভাবে এই বক্তব্যের যৌক্তিকতা থাকতে পারে, তবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়বদ্ধতার নীতি ভিন্ন কথা বলে। বর্তমান পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার চূড়ান্ত দায়িত্ব বর্তমান সরকারেরই। অতীতের ওপর দোষ চাপিয়ে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের ভুল, মুদ্রণ ত্রুটি বা সিলেবাস বিতর্ক এবারই প্রথম নয়। প্রতিবারই ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন ও সাময়িক বরখাস্তের মতো সাময়িক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, কিন্তু মূল সমস্যার মূল উৎপাটন হয় না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক পুরোনো গবেষণায় দেখা গেছে, অতীতেও মাত্র চার বছরে পাবলিক পরীক্ষার ৬৩টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছিল। ফলে বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি সাধারণ মানুষের মনে গভীর সংশয় তৈরি করছে।
স্থায়ী সমাধানের পথ কী?
পরীক্ষার হলে একজন শিক্ষার্থী বুঝতে পারেন না প্রশ্নটি ভুল নাকি তিনি উত্তর জানেন না। ফলে মূল্যবান সময় নষ্টের পাশাপাশি তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়। এই সংকট থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা কিছু জরুরি সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন:
- স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেল: প্রশ্নপত্র চূড়ান্ত করার আগে বিষয়ভিত্তিক স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে ডিজিটাল ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে মান যাচাই বাধ্যতামূলক করা।
- স্বচ্ছ শিক্ষক নির্বাচন: প্রশ্নপ্রণেতা ও মডারেটর নিয়োগে ব্যক্তিগত যোগাযোগের ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্যতা ও পারদর্শিতাকে প্রধান মাপকাঠি করা।
- বিশ্ববিদ্যালয় মডেল অনুসরণ: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো একটি শক্তিশালী প্রশ্নপত্র নিরীক্ষণ কমিটি গঠন করা, যারা মুদ্রণের আগেও ছোটখাটো ভুলগুলো তৎক্ষণাৎ সংশোধন করতে পারবেন।
- স্থায়ী জবাবদিহি কাঠামো: ভুলের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে স্থায়ী প্রশাসনিক ও পেশাগত শাস্তির ব্যবস্থা করা।
পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নে পূর্ণ নম্বর দেওয়া বা শিক্ষকদের বরখাস্ত করা সাময়িক স্বস্তি দিলেও, এটি ব্যবস্থার স্থায়ী কোনো পরিবর্তন আনবে না। প্রশ্নপত্রের ভুল কেবল একটি খাতার মূল্যায়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং রাষ্ট্রের শিক্ষা প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থায় ফাটল ধরায়। শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের এই হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 
























