সরকারি নির্দেশনা কার্যকর থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ঘটনা আবার সামনে এসেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগসহ কয়েকটি দপ্তরের সাম্প্রতিক আদেশে দেখা যাচ্ছে, প্রকল্পের সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থে চীন ও অন্যান্য দেশে প্রশিক্ষণ নিতে যাচ্ছেন একাধিক কর্মকর্তা। অথচ ঠিকাদার বা সরবরাহকারীর অর্থায়নে এ ধরনের সফর পরিহারের জন্য একাধিকবার স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল।
সম্প্রতি জারি হওয়া একটি সরকারি আদেশ অনুযায়ী, দুটি চেইন ডোজার বা ক্রলার বুলডোজার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণে অংশ নিতে চীন সফরের অনুমোদন পেয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের চারজন কর্মকর্তা। এই সফরের সমুদয় ব্যয় বহন করবে সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. রবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত এই আদেশটি জারি হয় গত ৬ সেপ্টেম্বর। এতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম ফয়সাল, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. বরকত হায়াত, নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক সার্কেল) মাকসূদ আলম এবং সহকারী প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুল ইসলামকে পাঁচ দিনের চীন ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আদেশে এই সফরকে দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এই ভ্রমণ প্রসঙ্গে মন্তব্য জানতে ডিএনসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মাকসূদ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বিষয়টি শোনার পর তিনি ফোন কেটে দেন এবং পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার সাড়া মেলেনি।
একই সময়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের সরঞ্জাম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য আরও চারজন সরকারি কর্মকর্তা চীন সফরের অনুমোদন পেয়েছেন। ১০টি অগ্রাধিকারভিত্তিক শহরে বাস্তবায়নাধীন সমন্বিত স্যানিটেশন ও হাইজিন প্রকল্পের আওতায় এই সফর অনুমোদিত হয়েছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫৯ কোটি টাকা এবং যা বাংলাদেশ সরকার ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। ২০ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত এই সফরে যাচ্ছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. আনোয়ার ইমাম, প্রকল্প পরিচালক এসএম শামীম আহমেদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হক ও মো. শামীম আনোয়ার। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব ড. আশফিকুন নাহার স্বাক্ষরিত আদেশে গত ৯ সেপ্টেম্বর এই সফরের অনুমোদন দেওয়া হয়, যেখানে সব ধরনের ব্যয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গ্রীন ডট লিমিটেড বহন করবে বলে স্পষ্ট করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে যুগ্ম সচিব মো. আনোয়ার ইমাম বলেন, মন্ত্রণালয়ের কাছে উপযুক্ত প্রতিনিধি প্রেরণের অনুরোধ করা হয়েছিল এবং সেই প্রতিনিধি হিসেবে তাকে মনোনীত করা হয়েছে। এর বাইরে তিনি বিস্তারিত কিছু জানেন না বলে জানিয়ে বিষয়টি নিয়ে প্রকল্প পরিচালক এসএম শামীম আহমেদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক এসএম শামীম আহমেদ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, গ্রীন ডট লিমিটেড প্রকল্পের একটি নির্দিষ্ট ডিসচার্জিং ইকুইপমেন্টের সরবরাহকারী এবং টেন্ডার ডকুমেন্ট অনুযায়ী সেই ইকুইপমেন্টের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স প্রশিক্ষণের ব্যয় সরবরাহকারীকেই বহন করতে হয়। তিনি জানান, দাতা সংস্থার অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে সরঞ্জাম কেনার অর্থ দাতা সংস্থা দিলেও প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত ব্যয়ের জন্য আলাদা কোনো অর্থ সরকারকে দিতে হয় না, কারণ টার্মস অব রেফারেন্সেই এই ব্যয় সরবরাহকারীর নিজস্ব দায় হিসেবে নির্ধারিত রয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। গত বছরের নভেম্বরে হুইল ডোজার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা পরিদর্শনের অনুমোদন পেয়েছিলেন তিন সরকারি কর্মচারী— ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের সচিব সুমনা আল মজিদ, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. ফিরোজ মাহমুদ এবং ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের একটি প্রকল্পের পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম মিয়া। তাদের সফরের ব্যয়ও বহন করেছিল সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাঁচটি চেইন ডোজার কেনার আগে অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স প্রশিক্ষণের জন্য চীন সফরের অনুমোদন পেয়েছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তিন কর্মকর্তা, যাদের ভ্রমণ ব্যয় বহন করেছিল উৎপাদক প্রতিষ্ঠান সিনোওয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল (সাংহাই) কোম্পানি লিমিটেড ও এইচটিএমএস।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইফাদ ও নেদারল্যান্ডস সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িত জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল ছোট আকারের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায়ও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের অধীনে চলতি বছরের জুলাইয়ে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের অনুমোদন পেয়েছিলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও এলজিইডির ছয়জন কর্মকর্তা, যাদের সফরের অর্থায়ন করেছিল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স সরকার কবীর আহমেদ।
সরকারি কর্মচারীদের যথেচ্ছ বিদেশ ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে তিন দফায় নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর জারি হওয়া প্রথম নির্দেশনায় বিদেশ ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করে বলা হয়েছিল, অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থ ছাড়া বিদেশ ভ্রমণে যাওয়া যাবে না এবং সরকারি অর্থে কম প্রয়োজনীয় ভ্রমণ অবশ্যই পরিহার করতে হবে। এরপর ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ জারি হওয়া দ্বিতীয় নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়, ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণ অবশ্যই পরিহার করতে হবে এবং কর্মকর্তারা তাদের স্বামী, স্ত্রী বা সন্তানদের সফরসঙ্গী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবেন না। একই বছরের ২১ অক্টোবর বিদেশ ভ্রমণ-সংক্রান্ত তৃতীয় নির্দেশনা জারি হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এসব নির্দেশনা বর্তমানেও কার্যকর রয়েছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যয় সাশ্রয়ে বাড়তি কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল অর্থ বিভাগ থেকে জারি করা নির্দেশনায় অতিরিক্ত সচিব ও সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আকাশপথে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিজনেস, ক্লাব বা এক্সিকিউটিভ শ্রেণীর পরিবর্তে সুলভ বা ইকোনমি শ্রেণী ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। এরপর গত ৮ জুলাই অর্থ বিভাগের জারি করা আরেকটি পরিপত্রে সরকারি অর্থায়নে সব ধরনের বিদেশি প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ বন্ধ রাখার কথা বলা হয়। তবে বিদেশি সরকার, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনো দেশের অর্থায়নে স্কলারশিপ, ফেলোশিপ কিংবা উচ্চশিক্ষার সুযোগ এই বিধিনিষেধের বাইরে রাখা হয়েছে। প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন ও ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্টের ক্ষেত্রেও কেবল জটিল বা অপরিহার্য পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা কারিগরি সনদপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সফর বিবেচনার কথা বলা হয়েছে, সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরীক্ষা সম্পন্ন করাকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, নির্দেশনা বলবৎ থাকার মধ্যেও এই প্রবণতা থেমে থাকেনি। গত বছর মোবাইল টয়লেট, স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টের যন্ত্রপাতি, ট্রেইলার, চেইন ডোজার ও স্ক্র্যাপার ব্রিজ কেনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ, পরিদর্শন ও বিভিন্ন পরীক্ষার নামে অনেক কর্মকর্তাকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে, যাদের অধিকাংশের ব্যয় বহন করেছিল সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে কয়েক মাস এ ধরনের ভ্রমণ বন্ধ থাকলেও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে সম্প্রতি সেই প্রবণতা আবার দেখা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পাশাপাশি অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে এবং সেই নির্দেশনা অনুযায়ীই রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে এবং এতে স্বার্থের সংঘাত তৈরির আশঙ্কা থাকে। নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ বা কাজের মান কমিয়ে খরচ পুষিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। কোনো প্রতিষ্ঠানের অর্থে বিদেশ ভ্রমণের পর সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি দুর্বলতা তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা, যার ফলে পরবর্তীতে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করলেও ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, এ ধরনের বিদেশ সফর কেবল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশের বরখেলাপ নয়, বরং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অযাচিত আনুগত্য ও অনৈতিক ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণের দৃষ্টান্ত। তার ভাষায়, এ ধরনের সুবিধা গ্রহণ সরকার ও দেশের জন্য মানহানিকর এবং ভেন্ডরের প্রতি অসম্মানজনক অনুরাগের দৃষ্টান্ত তৈরি করে, যা সরকারি ক্রয়নীতি লঙ্ঘনের শামিল এবং শাস্তিযোগ্য অনিয়ম।
সাবেক অর্থ সচিব ও সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীও একই আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগ করছে, যার ফলে স্বার্থের সংঘাত তৈরির সম্ভাবনা থাকে এবং এই ধরনের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলাই সমীচীন। তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান নির্দেশনা কার্যকর থাকা অবস্থায় এ ধরনের ভ্রমণের অনুমোদন দেওয়া উচিত হয়নি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















