মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে নতুন খোলসে পুরোনো সিন্ডিকেট

বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্যগুলোর একটি মালয়েশিয়া। কিন্তু এই শ্রমবাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা মসৃণ কখনোই ছিল না। যতবারই দেশটির দরজা খুলেছে, ততবারই দুর্নীতি আর অনিয়মের অভিযোগ পিছু ছাড়েনি। কর্মী পাঠানোর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, নির্দিষ্ট কিছু এজেন্সির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাবশালী একটি বলয়ের মনোপলি ব্যবসা— এসব অভিযোগ এই খাতে নতুন কিছু নয়।

২০১৬ সালে মাত্র ১০টি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো শুরু হয়েছিল। ২০২২ সালে এসে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০১-এ। দুই দফাতেই বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালে বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, আর এসব ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে শতাধিক মামলাও দায়ের হয়। এরপর দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনা আর দেনদরবার শেষে অবশেষে বাজারটি ফের খোলার খবর আসছে। তবে এত তিক্ত অভিজ্ঞতার পরও বর্তমান ক্ষমতাসীন দল হাঁটছে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের চেনা পথেই— এবার মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে নতুন করে মূল এজেন্সি হিসেবে অনুমোদন পেয়েছে ২৫টি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নতুন এই তালিকাতেও পুরোনো সিন্ডিকেটের ছায়া স্পষ্ট। নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ না করা এজেন্সির সংখ্যাই তালিকায় বেশি। মালয়েশিয়ার দেওয়া দশটি শর্তের একটিতে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার কথা বলা হলেও অনুমোদন পেয়েছে মাত্র চার বছর বয়সী এজেন্সি। দশ হাজার বর্গফুট অফিস থাকার শর্তও পূরণ করেনি তালিকাভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠান। পাঁচ বছরে অন্তত তিন হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা থাকার কথা বলা হলেও তালিকায় এমন এজেন্সিও রয়েছে, যারা মাত্র দুইশ কর্মী পাঠিয়েছে। শর্তে স্পষ্ট বলা ছিল, জবরদস্তিমূলক শ্রমে নিয়োগ, মানব পাচার, শ্রম আইন লঙ্ঘন, জোরপূর্বক অর্থ আদায়, অর্থ পাচার বা অন্য কোনো আর্থিক অপরাধ এবং অনৈতিক অভিবাসন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার রেকর্ড থাকা যাবে না। তারপরও মানব পাচারের অভিযোগে দুদকের তালিকাভুক্ত অন্তত চারটি এজেন্সি এবার অনুমোদন পেয়ে গেছে।

দীর্ঘ ইতিহাস, বারবার বন্ধের গল্প

তথ্য বলছে, ২০০৮ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দীর্ঘ আট বছরের দেনদরবারের পর ২০১৬ সালে ফের চালু হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালে দেশটি আবার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর প্রায় তিন বছরের দেনদরবার শেষে ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর নতুন সমঝোতা চুক্তি হয়, আর ২০২২ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশি কর্মীরা মালয়েশিয়ায় যাওয়া শুরু করেন। সবশেষ ২০২৪ সালের ১ জুন আবারও বন্ধ হয়ে যায় এই শ্রমবাজার।

২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ে দশটি রিক্রুটিং এজেন্সিকে দেওয়া হয়েছিল সব কর্মী নিয়োগের একচেটিয়া দায়িত্ব। সরকার নির্ধারিত খরচ ছিল ৩৩ হাজার ৩৭৫ টাকা, অথচ অভিযোগ উঠেছিল কর্মীদের কাছ থেকে দুই থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করার। প্রায় তিন বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালে বাজার আবার খুললেও পুনরাবৃত্তি ঘটে একই চিত্রের। প্রথমে ২৫টি, পরে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কাজ দেওয়া হয়েছিল, যেগুলোর মালিকানায় ছিলেন তৎকালীন এমপি-মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা। এই সময়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ভেরিটে ইনকরপোরেটেডসহ পাঁচটি সংস্থার এক গবেষণা অনুযায়ী, ওই সময় প্রতিটি কর্মীর গড় খরচ দাঁড়িয়েছিল পাঁচ লাখ ৪৪ হাজার টাকায়। এসব ঘটনায় দুদক থেকে দায়ের হয় শতাধিক মামলা।

সহযোগী নয়, নিয়ন্ত্রকই সব

বাংলাদেশে আড়াই হাজারের বেশি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি থাকলেও আগের সিন্ডিকেট ব্যবস্থায় তারা সরাসরি কাজের সুযোগ পেত না। তাদের চাহিদাপত্র নির্দিষ্ট মূল এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (এফডব্লিউসিএমএস) প্রক্রিয়া করতে হতো, আর এর বিনিময়ে সহযোগী এজেন্সিগুলোকে গুনতে হতো মোটা অঙ্কের প্রসেস ফি। এই চক্রের পেছনে বারবার উঠে এসেছে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দাতোশ্রি আবদুল আমিনের প্রতিষ্ঠান সিনারফ্ল্যাক্স ও বেস্টিনেটের নাম। জনশক্তি খাতে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা— মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন দুই আমিন। বাংলাদেশ অংশের নিয়ন্ত্রক জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠান ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মালিক রুহুল আমিন স্বপন, আর মালয়েশিয়া অংশের নিয়ন্ত্রক দাতোশ্রি আবদুল আমিন।

এবারের ব্যবস্থায় এফডব্লিউসিএমএসের অধীনে ২৫টি মূল এজেন্সি এবং তাদের অধীনে প্রতিটিতে দশটি করে মোট ২৫০টি সহযোগী রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি নির্ধারিত হয়েছে। এর সঙ্গে বোয়েসেলের অধীনে থাকা ৬২টি মিলিয়ে মোট ৩৩৮টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সহযোগী এজেন্সির চূড়ান্ত তালিকা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

সূত্র বলছে, নতুন ২৫টি এজেন্সির মধ্যে ১৪টি এবার অনুমোদন পেয়েছে বর্তমান প্রভাবশালীদের হাত ধরে। আরও সাতটি এজেন্সি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে রুহুল আমিন স্বপনের ঘনিষ্ঠদের হাতে। বাকি চারটিকে বলা হচ্ছে “ডামি” এজেন্সি— অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা আগের সিন্ডিকেটেও ছিলেন, এবার শুধু নতুন নাম আর নতুন এজেন্সির আড়ালে জায়গা করে নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই কাঠামোয় সহযোগী এজেন্সিগুলোকে মূল এজেন্সিকে প্রসেস ফি দিতে হবে, ফলে অভিবাসন ব্যয় আরও বাড়বে এবং শ্রমিকদের ভোগান্তিও বাড়বে।

অভিজ্ঞতাহীন এজেন্সির ভিড়

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সির মধ্যে ১৭টির মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতাই নেই। এই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ, বেঙ্গল হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট, অন্বেষা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, আর্থ স্মার্ট বাংলাদেশ, খান জাহান আলী ওভারসিজ, মাদারল্যান্ড ওভারসিজ, এ-প্লাস ইন্টারন্যাশনাল, আল হায়াত ওভারসিজ, ভালুকা ওভারসিজ, চাঁদপুর ইন্টারন্যাশনাল, গডনেস সার্ভিসেস, জুয়েল রিংকু এন্টারপ্রাইজ, সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল, ম্যানগ্রোভ ক্যারিয়ার লিংক, তানিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, ভেলী ট্রেড ও আত তাকওয়া।

বাকি আটটি এজেন্সি মিলে মোট এক হাজার ৬১২ জন কর্মী পাঠিয়েছে— যার মধ্যে পাঁচটি এজেন্সির নামে গেছে যথাক্রমে ১১, ৭৪, ১০০, ১৫০ ও ২০২ জন, আর বাকি তিনটি থেকে গেছে ৪৩৬, ৩৩৩ ও ৩০৬ জন। এ ছাড়া সাতটি এজেন্সি অনুমোদনের পর থেকে প্রতিটি তিন হাজারেরও কম কর্মী পাঠিয়েছে, যদিও শর্তে বলা ছিল পাঁচ বছরে অন্তত তিন হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এই সাতটি এজেন্সি মিলে মোট পাঠিয়েছে আট হাজার ২৬০ জন কর্মী— বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ ৮০৯ জন, আল হায়াত ওভারসিজ ৪০৪ জন, ভালুকা ওভারসিজ ২৩৫ জন, ব্রাদার ট্রেডিং অ্যান্ড কন্ট্রাকটিং লিমিটেড এক হাজার ৪৫৬ জন, কান্ট্রি এমপ্লয়মেন্ট দুই হাজার ৫৫৬ জন, জুয়েল রিংকু এন্টারপ্রাইজ দুই হাজার ৮২৯ জন এবং দি অ্যাংকর কেয়ার গ্লোবাল মাইগ্রেশন অ্যান্ড কনসালট্যান্ট লিমিটেড মাত্র ৩৭১ জন।

অভিযোগ নিয়ে যোগাযোগ করা হলে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে দেওয়া নম্বর কর্মচারীদের বলে জানা যায়। বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজের মালিকের ছোট ভাই পরিচয়দানকারী মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “আমরা মালয়েশিয়ায় অনেক লোক পাঠিয়েছি। তবে এই এজেন্সির মাধ্যমে নয়। ভাইয়ের আরও আট-দশটি এজেন্সি আছে, সেগুলোর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে।” মানব পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করে জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের মালিক মো. খলিলুর রহমান বলেন, “আমার বিরুদ্ধে দুদক মিথ্যা কিশোরী পাচারের অভিযোগ দিয়েছে। আমি কোনো নারীই পাঠাইনি।” পরে প্রশ্নের মুখে তিনি স্বীকার করেন নারী পাঠানোর কথা, তবে দাবি করেন অভিযুক্ত নারীকে তিনি পাঠাননি। আল হায়াত ওভারসিজের মালিক মো. আলাউদ্দিন কবির বলেন, “আমি জানি না, অনুমোদন সরকার দিয়েছে, তাদের গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন।” আর ভালুকা ওভারসিজে ফোন করা হলে এক ব্যক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত না থাকার কথা জানান এবং মালিক পরে ফোন করবেন বলে জানালেও পরবর্তী সময়ে কোনো সাড়া মেলেনি।

পুরোনো চিত্রের পুনরাবৃত্তি

এর আগেও অনভিজ্ঞ এজেন্সিকে অনুমোদন দেওয়ার নজির রয়েছে। ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনালের মাত্র ৫২ জন এবং ইম্পেরিয়াল রিসোর্সের ৩২৪ জন কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা ছিল তালিকায় নাম ওঠার আগে। ফেনী-২ আসনের তৎকালীন এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারীর প্রতিষ্ঠান স্নিগ্ধা ওভারসিজ লিমিটেডের অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র ৯১ জনের, আর ঢাকা-২০ আসনের আওয়ামী লীগ এমপি বেনজির আহমদের প্রতিষ্ঠান আহমদ ইন্টারন্যাশনাল আগের সাত বছরে পাঠিয়েছিল মাত্র ৩৮৭ জন কর্মী। পরে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে এবং ২০২৪ সালের ৩১ মে শ্রমবাজার বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া সরকার। পরে ক্ষমতার পালাবদলের পর গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফরে গিয়ে দেশটির শ্রমবাজার খোলার অনুরোধ জানান। এর প্রায় দুই মাস পর মালয়েশিয়া ২৫টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করে, আর এখন নতুন করে শোনা যাচ্ছে বাজার খোলার খবর।

মানব পাচার মামলায় অভিযুক্ত চার এজেন্সি তালিকায়

গত বছরের ২৬ মে “গৃহকর্মীর আড়ালে কিশোরী পাচার” শিরোনামে তিন পর্বের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল, যার পর দুদক বিএমইটিতে একাধিকবার অভিযান চালায়। গত বছরের ৩ জুলাই দুদকের ঢাকা জেলা সমন্বিত কার্যালয় থেকে বিএমইটির চার কর্মকর্তা এবং পাঁচটি এজেন্সির মালিক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, বিভিন্ন এজেন্সি পরস্পর যোগসাজশে মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী পাঠানোর জন্য নারীদের ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করেছে এবং প্রকৃত আবেদনকারীর পরিবর্তে অন্য নারীর পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে যাচাই ছাড়াই ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এমনকি ২৫ বছরের কম বয়সী চারজন অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীকে ছাড়পত্র দেওয়ারও প্রমাণ মিলেছে, যা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার সরাসরি লঙ্ঘন। এই মামলার তদন্তে আরও ৫৭টি রিক্রুটিং এজেন্সির যোগসাজশের তথ্য পায় দুদক, যাদের তথ্য চেয়ে গত ২৩ জুলাই বিএমইটি মহাপরিচালককে চিঠি দেওয়া হয়। এই ৫৭ এজেন্সির মধ্যেই রয়েছে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনুমোদন পাওয়া চারটি প্রতিষ্ঠান— রিফা ইন্টারন্যাশনাল (নিবন্ধন নম্বর ৬৯৩), জেনারেল ট্রেডিং (নিবন্ধন নম্বর ৩২০), গডনেস সার্ভিস লিমিটেড (নিবন্ধন নম্বর ২০৬৮) ও ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল (নিবন্ধন নম্বর ১২৬৮)। অথচ মালয়েশিয়ার দেওয়া শর্তেই স্পষ্ট বলা ছিল, মানব পাচার বা অনৈতিক অভিবাসন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার রেকর্ড থাকা যাবে না।

জানা গেছে, আগে শুধু বাংলাদেশ থেকেই কর্মী নিয়োগ এজেন্সি বাছাই হলেও এবার ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইনসহ আট দেশের ক্ষেত্রেই এজেন্সি নির্ধারণ করেছে এফডব্লিউসিএমএস— মালয়েশিয়া সরকার অনুমোদিত এই প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট। আগের দুই দফাতেই এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভিসা কেনাবেচা ও নিবন্ধনে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল, আর হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও পাচারের অভিযোগের জেরেই বন্ধ হয়েছিল শ্রমবাজার। এবার তৃতীয় দফায়ও একই পদ্ধতিতে এগোচ্ছে বাংলাদেশ।

বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তার একান্ত সচিব মো. তরিকুল ইসলাম জানান, সচিব মিটিংয়ে আছেন, পরে যোগাযোগ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এ বিষয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান খান বলেন, “এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। মন্ত্রণালয় থেকেও কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। আমাদের কাছে এখনো কোনো চিঠি আসেনি। আমরা এ বিষয়ে অবগত নই।”

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ইউনূসের আমলে ৩৬ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন বাতিল, ঝুলে গেল ৩২৮৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে নতুন খোলসে পুরোনো সিন্ডিকেট

আপডেট সময় ০১:৩৬:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্যগুলোর একটি মালয়েশিয়া। কিন্তু এই শ্রমবাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা মসৃণ কখনোই ছিল না। যতবারই দেশটির দরজা খুলেছে, ততবারই দুর্নীতি আর অনিয়মের অভিযোগ পিছু ছাড়েনি। কর্মী পাঠানোর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, নির্দিষ্ট কিছু এজেন্সির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাবশালী একটি বলয়ের মনোপলি ব্যবসা— এসব অভিযোগ এই খাতে নতুন কিছু নয়।

২০১৬ সালে মাত্র ১০টি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো শুরু হয়েছিল। ২০২২ সালে এসে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০১-এ। দুই দফাতেই বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালে বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, আর এসব ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে শতাধিক মামলাও দায়ের হয়। এরপর দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনা আর দেনদরবার শেষে অবশেষে বাজারটি ফের খোলার খবর আসছে। তবে এত তিক্ত অভিজ্ঞতার পরও বর্তমান ক্ষমতাসীন দল হাঁটছে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের চেনা পথেই— এবার মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে নতুন করে মূল এজেন্সি হিসেবে অনুমোদন পেয়েছে ২৫টি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নতুন এই তালিকাতেও পুরোনো সিন্ডিকেটের ছায়া স্পষ্ট। নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ না করা এজেন্সির সংখ্যাই তালিকায় বেশি। মালয়েশিয়ার দেওয়া দশটি শর্তের একটিতে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার কথা বলা হলেও অনুমোদন পেয়েছে মাত্র চার বছর বয়সী এজেন্সি। দশ হাজার বর্গফুট অফিস থাকার শর্তও পূরণ করেনি তালিকাভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠান। পাঁচ বছরে অন্তত তিন হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা থাকার কথা বলা হলেও তালিকায় এমন এজেন্সিও রয়েছে, যারা মাত্র দুইশ কর্মী পাঠিয়েছে। শর্তে স্পষ্ট বলা ছিল, জবরদস্তিমূলক শ্রমে নিয়োগ, মানব পাচার, শ্রম আইন লঙ্ঘন, জোরপূর্বক অর্থ আদায়, অর্থ পাচার বা অন্য কোনো আর্থিক অপরাধ এবং অনৈতিক অভিবাসন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার রেকর্ড থাকা যাবে না। তারপরও মানব পাচারের অভিযোগে দুদকের তালিকাভুক্ত অন্তত চারটি এজেন্সি এবার অনুমোদন পেয়ে গেছে।

দীর্ঘ ইতিহাস, বারবার বন্ধের গল্প

তথ্য বলছে, ২০০৮ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দীর্ঘ আট বছরের দেনদরবারের পর ২০১৬ সালে ফের চালু হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালে দেশটি আবার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর প্রায় তিন বছরের দেনদরবার শেষে ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর নতুন সমঝোতা চুক্তি হয়, আর ২০২২ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশি কর্মীরা মালয়েশিয়ায় যাওয়া শুরু করেন। সবশেষ ২০২৪ সালের ১ জুন আবারও বন্ধ হয়ে যায় এই শ্রমবাজার।

২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ে দশটি রিক্রুটিং এজেন্সিকে দেওয়া হয়েছিল সব কর্মী নিয়োগের একচেটিয়া দায়িত্ব। সরকার নির্ধারিত খরচ ছিল ৩৩ হাজার ৩৭৫ টাকা, অথচ অভিযোগ উঠেছিল কর্মীদের কাছ থেকে দুই থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করার। প্রায় তিন বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালে বাজার আবার খুললেও পুনরাবৃত্তি ঘটে একই চিত্রের। প্রথমে ২৫টি, পরে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কাজ দেওয়া হয়েছিল, যেগুলোর মালিকানায় ছিলেন তৎকালীন এমপি-মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা। এই সময়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ভেরিটে ইনকরপোরেটেডসহ পাঁচটি সংস্থার এক গবেষণা অনুযায়ী, ওই সময় প্রতিটি কর্মীর গড় খরচ দাঁড়িয়েছিল পাঁচ লাখ ৪৪ হাজার টাকায়। এসব ঘটনায় দুদক থেকে দায়ের হয় শতাধিক মামলা।

সহযোগী নয়, নিয়ন্ত্রকই সব

বাংলাদেশে আড়াই হাজারের বেশি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি থাকলেও আগের সিন্ডিকেট ব্যবস্থায় তারা সরাসরি কাজের সুযোগ পেত না। তাদের চাহিদাপত্র নির্দিষ্ট মূল এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (এফডব্লিউসিএমএস) প্রক্রিয়া করতে হতো, আর এর বিনিময়ে সহযোগী এজেন্সিগুলোকে গুনতে হতো মোটা অঙ্কের প্রসেস ফি। এই চক্রের পেছনে বারবার উঠে এসেছে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দাতোশ্রি আবদুল আমিনের প্রতিষ্ঠান সিনারফ্ল্যাক্স ও বেস্টিনেটের নাম। জনশক্তি খাতে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা— মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন দুই আমিন। বাংলাদেশ অংশের নিয়ন্ত্রক জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠান ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মালিক রুহুল আমিন স্বপন, আর মালয়েশিয়া অংশের নিয়ন্ত্রক দাতোশ্রি আবদুল আমিন।

এবারের ব্যবস্থায় এফডব্লিউসিএমএসের অধীনে ২৫টি মূল এজেন্সি এবং তাদের অধীনে প্রতিটিতে দশটি করে মোট ২৫০টি সহযোগী রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি নির্ধারিত হয়েছে। এর সঙ্গে বোয়েসেলের অধীনে থাকা ৬২টি মিলিয়ে মোট ৩৩৮টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সহযোগী এজেন্সির চূড়ান্ত তালিকা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

সূত্র বলছে, নতুন ২৫টি এজেন্সির মধ্যে ১৪টি এবার অনুমোদন পেয়েছে বর্তমান প্রভাবশালীদের হাত ধরে। আরও সাতটি এজেন্সি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে রুহুল আমিন স্বপনের ঘনিষ্ঠদের হাতে। বাকি চারটিকে বলা হচ্ছে “ডামি” এজেন্সি— অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা আগের সিন্ডিকেটেও ছিলেন, এবার শুধু নতুন নাম আর নতুন এজেন্সির আড়ালে জায়গা করে নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই কাঠামোয় সহযোগী এজেন্সিগুলোকে মূল এজেন্সিকে প্রসেস ফি দিতে হবে, ফলে অভিবাসন ব্যয় আরও বাড়বে এবং শ্রমিকদের ভোগান্তিও বাড়বে।

অভিজ্ঞতাহীন এজেন্সির ভিড়

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সির মধ্যে ১৭টির মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতাই নেই। এই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ, বেঙ্গল হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট, অন্বেষা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, আর্থ স্মার্ট বাংলাদেশ, খান জাহান আলী ওভারসিজ, মাদারল্যান্ড ওভারসিজ, এ-প্লাস ইন্টারন্যাশনাল, আল হায়াত ওভারসিজ, ভালুকা ওভারসিজ, চাঁদপুর ইন্টারন্যাশনাল, গডনেস সার্ভিসেস, জুয়েল রিংকু এন্টারপ্রাইজ, সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল, ম্যানগ্রোভ ক্যারিয়ার লিংক, তানিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, ভেলী ট্রেড ও আত তাকওয়া।

বাকি আটটি এজেন্সি মিলে মোট এক হাজার ৬১২ জন কর্মী পাঠিয়েছে— যার মধ্যে পাঁচটি এজেন্সির নামে গেছে যথাক্রমে ১১, ৭৪, ১০০, ১৫০ ও ২০২ জন, আর বাকি তিনটি থেকে গেছে ৪৩৬, ৩৩৩ ও ৩০৬ জন। এ ছাড়া সাতটি এজেন্সি অনুমোদনের পর থেকে প্রতিটি তিন হাজারেরও কম কর্মী পাঠিয়েছে, যদিও শর্তে বলা ছিল পাঁচ বছরে অন্তত তিন হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এই সাতটি এজেন্সি মিলে মোট পাঠিয়েছে আট হাজার ২৬০ জন কর্মী— বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ ৮০৯ জন, আল হায়াত ওভারসিজ ৪০৪ জন, ভালুকা ওভারসিজ ২৩৫ জন, ব্রাদার ট্রেডিং অ্যান্ড কন্ট্রাকটিং লিমিটেড এক হাজার ৪৫৬ জন, কান্ট্রি এমপ্লয়মেন্ট দুই হাজার ৫৫৬ জন, জুয়েল রিংকু এন্টারপ্রাইজ দুই হাজার ৮২৯ জন এবং দি অ্যাংকর কেয়ার গ্লোবাল মাইগ্রেশন অ্যান্ড কনসালট্যান্ট লিমিটেড মাত্র ৩৭১ জন।

অভিযোগ নিয়ে যোগাযোগ করা হলে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে দেওয়া নম্বর কর্মচারীদের বলে জানা যায়। বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজের মালিকের ছোট ভাই পরিচয়দানকারী মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “আমরা মালয়েশিয়ায় অনেক লোক পাঠিয়েছি। তবে এই এজেন্সির মাধ্যমে নয়। ভাইয়ের আরও আট-দশটি এজেন্সি আছে, সেগুলোর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে।” মানব পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করে জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের মালিক মো. খলিলুর রহমান বলেন, “আমার বিরুদ্ধে দুদক মিথ্যা কিশোরী পাচারের অভিযোগ দিয়েছে। আমি কোনো নারীই পাঠাইনি।” পরে প্রশ্নের মুখে তিনি স্বীকার করেন নারী পাঠানোর কথা, তবে দাবি করেন অভিযুক্ত নারীকে তিনি পাঠাননি। আল হায়াত ওভারসিজের মালিক মো. আলাউদ্দিন কবির বলেন, “আমি জানি না, অনুমোদন সরকার দিয়েছে, তাদের গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন।” আর ভালুকা ওভারসিজে ফোন করা হলে এক ব্যক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত না থাকার কথা জানান এবং মালিক পরে ফোন করবেন বলে জানালেও পরবর্তী সময়ে কোনো সাড়া মেলেনি।

পুরোনো চিত্রের পুনরাবৃত্তি

এর আগেও অনভিজ্ঞ এজেন্সিকে অনুমোদন দেওয়ার নজির রয়েছে। ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনালের মাত্র ৫২ জন এবং ইম্পেরিয়াল রিসোর্সের ৩২৪ জন কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা ছিল তালিকায় নাম ওঠার আগে। ফেনী-২ আসনের তৎকালীন এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারীর প্রতিষ্ঠান স্নিগ্ধা ওভারসিজ লিমিটেডের অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র ৯১ জনের, আর ঢাকা-২০ আসনের আওয়ামী লীগ এমপি বেনজির আহমদের প্রতিষ্ঠান আহমদ ইন্টারন্যাশনাল আগের সাত বছরে পাঠিয়েছিল মাত্র ৩৮৭ জন কর্মী। পরে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে এবং ২০২৪ সালের ৩১ মে শ্রমবাজার বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া সরকার। পরে ক্ষমতার পালাবদলের পর গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফরে গিয়ে দেশটির শ্রমবাজার খোলার অনুরোধ জানান। এর প্রায় দুই মাস পর মালয়েশিয়া ২৫টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করে, আর এখন নতুন করে শোনা যাচ্ছে বাজার খোলার খবর।

মানব পাচার মামলায় অভিযুক্ত চার এজেন্সি তালিকায়

গত বছরের ২৬ মে “গৃহকর্মীর আড়ালে কিশোরী পাচার” শিরোনামে তিন পর্বের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল, যার পর দুদক বিএমইটিতে একাধিকবার অভিযান চালায়। গত বছরের ৩ জুলাই দুদকের ঢাকা জেলা সমন্বিত কার্যালয় থেকে বিএমইটির চার কর্মকর্তা এবং পাঁচটি এজেন্সির মালিক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, বিভিন্ন এজেন্সি পরস্পর যোগসাজশে মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী পাঠানোর জন্য নারীদের ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করেছে এবং প্রকৃত আবেদনকারীর পরিবর্তে অন্য নারীর পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে যাচাই ছাড়াই ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এমনকি ২৫ বছরের কম বয়সী চারজন অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীকে ছাড়পত্র দেওয়ারও প্রমাণ মিলেছে, যা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার সরাসরি লঙ্ঘন। এই মামলার তদন্তে আরও ৫৭টি রিক্রুটিং এজেন্সির যোগসাজশের তথ্য পায় দুদক, যাদের তথ্য চেয়ে গত ২৩ জুলাই বিএমইটি মহাপরিচালককে চিঠি দেওয়া হয়। এই ৫৭ এজেন্সির মধ্যেই রয়েছে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনুমোদন পাওয়া চারটি প্রতিষ্ঠান— রিফা ইন্টারন্যাশনাল (নিবন্ধন নম্বর ৬৯৩), জেনারেল ট্রেডিং (নিবন্ধন নম্বর ৩২০), গডনেস সার্ভিস লিমিটেড (নিবন্ধন নম্বর ২০৬৮) ও ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল (নিবন্ধন নম্বর ১২৬৮)। অথচ মালয়েশিয়ার দেওয়া শর্তেই স্পষ্ট বলা ছিল, মানব পাচার বা অনৈতিক অভিবাসন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার রেকর্ড থাকা যাবে না।

জানা গেছে, আগে শুধু বাংলাদেশ থেকেই কর্মী নিয়োগ এজেন্সি বাছাই হলেও এবার ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইনসহ আট দেশের ক্ষেত্রেই এজেন্সি নির্ধারণ করেছে এফডব্লিউসিএমএস— মালয়েশিয়া সরকার অনুমোদিত এই প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট। আগের দুই দফাতেই এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভিসা কেনাবেচা ও নিবন্ধনে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল, আর হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও পাচারের অভিযোগের জেরেই বন্ধ হয়েছিল শ্রমবাজার। এবার তৃতীয় দফায়ও একই পদ্ধতিতে এগোচ্ছে বাংলাদেশ।

বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তার একান্ত সচিব মো. তরিকুল ইসলাম জানান, সচিব মিটিংয়ে আছেন, পরে যোগাযোগ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এ বিষয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান খান বলেন, “এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। মন্ত্রণালয় থেকেও কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। আমাদের কাছে এখনো কোনো চিঠি আসেনি। আমরা এ বিষয়ে অবগত নই।”

Share this news as a Photo Card