রাজধানীর তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হওয়া বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন ও আলোচনা বাড়ছে।। তবে মৃত্যু কীভাবে হলো, তা এখনো জানা যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে আছে পরিবার ও পুলিশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে এখন কোনো কথা বলতে চাচ্ছি না। কারণ, একটা প্রাথমিক তদন্ত হতে হবে আর লাশের ময়নাতদন্ত হচ্ছে। তারপর আমরা সব বিষয় জেনে কথা বলব।’
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে ভাসমান অবস্থায় একটি মরদেহ দেখা যায়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল সেখানে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। উদ্ধারের সময় নিয়ে দুটি ভিন্ন তথ্য মিলেছে। নৌ পুলিশের এক বিবরণে বলা হয়েছে বিকেল সাড়ে ৪টা, আর সুরতহাল প্রতিবেদনে লেখা আছে পৌনে ৬টা। এ অসংগতির ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
প্রথমে মরদেহটি ছিল অজ্ঞাতপরিচয়। নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, মৃত ব্যক্তির হাতে ছিল একটি ঘড়ি, পকেটে একটি আইফোন। ওই ফোনের সূত্র ধরেই তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হয়। এরপর এক আত্মীয়কে খবর দেওয়া হয় এবং ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পুলিশ সুপার বলেন, মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি; ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিনও বৃহস্পতিবার সকালে মৃত্যুর খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছেন ফাঁড়ির উপপরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান। প্রতিবেদনের বর্ণনায় মৃত ব্যক্তির উচ্চতা আনুমানিক পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি। মাথার চুল কালো, মুখে ছোট ছোট কালো দাড়ি-গোঁফ। চোখ ও মুখ বন্ধ ছিল, নাক দিয়ে রক্ত বেরোতে দেখা গেছে। দুই হাত মাথার সামনে বাঁকানো ও মুষ্টিবদ্ধ, পেট ফোলা। বুক, পেট, পিঠ ও দুই পা স্বাভাবিক বলে লেখা হয়েছে। পরনে ছিল কালো ফুলহাতা শার্ট ও সাদা ট্রাউজার। অপমৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ সাধারণত মরদেহের বাহ্যিক অবস্থা দেখে এ ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করে।
তাহসিফের বয়স ২৮ বছর। তিনি উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে থাকতেন; তাঁর বাড়ি খুলনার সোনাডাঙ্গায়।
পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর তিনি বাসা থেকে বের হন। তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল জানান, এক জুনিয়র বন্ধুর ফোন পেয়ে ছেলে বেরিয়েছিলেন। মাকে বলে গিয়েছিলেন, একটু কথা বলে ফিরবেন। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে শেষ বার্তা পাঠান, ‘আম্মু, আমি আসছি।’ এরপর পরিবার আর তাঁর খোঁজ পায়নি। পরদিন সন্ধ্যার আগে স্বজনেরা জানতে পারেন, নদীতে মরদেহ পাওয়া গেছে।
ওই জুনিয়র বন্ধুর নাম শাহরিয়ার দ্বীপ। তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত তাহসিফ তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তাহসিফের মোটরবাইক অচল হয়ে পড়লে তিনি সেটি চালু করতে সাহায্য করেন। এরপর দুজন উত্তরার একটি ওয়ার্কশপে যান, সেখানে বাইকের ইঞ্জিন অয়েল বদলানো হয়। পরে রাজি কমপ্লেক্সের একটি রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খান। দ্বীপের ভাষ্য, এরপর তিনি নিজের বাসার দিকে যান, তাহসিফ যান অন্য দিকে; কোথায় ও কেন গেলেন, তা তিনি জানেন না।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনার দেশত্যাগের যে ভিডিও ছড়িয়েছিল, সেটি ধারণ করেছিলেন তাহসিফ। এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেননি নৌ পুলিশের কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন। এ ধরনের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে এখন কোনো কথা বলতে চাচ্ছি না। কারণ, একটা প্রাথমিক তদন্ত হতে হবে আর লাশের ময়নাতদন্ত হচ্ছে। তারপর আমরা সব বিষয় জেনে কথা বলব।’
বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজশাহীর চারঘাটের সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
যা এখনো নিশ্চিত নয়: মৃত্যুর কারণ, উদ্ধারের সঠিক সময় এবং ভিডিও-সংক্রান্ত দাবি। এই তিনটি বিষয় যাচাই হয়নি। ময়নাতদন্ত ও তদন্তের ফলাফলই এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















