ফরেনসিক সূত্রে যেভাবে শনাক্ত হন মেজর মোজাফফর

ফরেনসিক সূত্রে যেভাবে শনাক্ত হন মেজর মোজাফফর
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আত্মগোপনে থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে শনাক্ত করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে একটি মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার হাতে আসা প্রযুক্তিগত তথ্য এবং পরে পুলিশের অনুসন্ধানের সমন্বয়েই তাঁর অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়। তদন্তকারীরা তাঁর কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে কয়েকটি সন্দেহজনক মোবাইল নম্বর শনাক্ত করেন, যেগুলো থেকে নিয়মিত যোগাযোগ করা হতো।
তদন্তে দেখা যায়, ২০২৩ সাল থেকে রাজধানীর বনানী ও মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার একই অবস্থান থেকে মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার সংক্ষিপ্ত সময়ের ফোনালাপ এবং খুদে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। পরে যাচাই করে জানা যায়, ব্যবহৃত সিমগুলো ভুয়া পরিচয়ে নিবন্ধিত ছিল। এতে তদন্ত আরও জটিল হয়ে ওঠে।
সন্দেহজনক নম্বরগুলোর প্রকৃত ব্যবহারকারীকে শনাক্ত করতে না পেরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তথ্যগুলো পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠায়। এরপর পুলিশ নিজস্ব প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনুসন্ধান শুরু করে। সেই তদন্তেই উঠে আসে, নম্বরগুলোর ব্যবহারকারী আর কেউ নন—১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত এবং দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর মোজাফফর হোসেন।
গত বুধবার রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ায় বিষয়টি দ্রুত আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনকে জানানো হয়। পরদিন আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাঁকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, তদন্ত সংস্থা মূলত সন্দেহজনক নম্বরগুলো শনাক্ত করেছিল। তবে সেই নম্বরের প্রকৃত ব্যবহারকারীকে চিহ্নিত করার জটিল কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করেছে পুলিশ। তাঁর ভাষায়, এই সাফল্যের মূল কৃতিত্ব পুলিশের প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেন। বিভিন্ন গবেষণা, বই ও বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে, ওই অভিযানে অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মেজর মোজাফফর। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং দীর্ঘদিন তাঁকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা ছিল।
দীর্ঘ ৪৫ বছর পর একটি মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ, কল ডিটেইল রেকর্ডের সূক্ষ্ম পর্যালোচনা এবং পুলিশের ধারাবাহিক প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত মিলিয়ে অবশেষে শেষ হয় তাঁর পলাতক জীবনের অধ্যায়। এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তদন্তের সমন্বয় বহু বছরের অমীমাংসিত মামলারও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এনে দিতে পারে।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

অবশেষে খুলে গেছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে থাকা আসামির হাতে হাতকড়া

২৯ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ফরেনসিক সূত্রে যেভাবে শনাক্ত হন মেজর মোজাফফর

আপডেট সময় ০১:২৫:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬

ফরেনসিক সূত্রে যেভাবে শনাক্ত হন মেজর মোজাফফর
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আত্মগোপনে থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে শনাক্ত করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে একটি মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার হাতে আসা প্রযুক্তিগত তথ্য এবং পরে পুলিশের অনুসন্ধানের সমন্বয়েই তাঁর অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়। তদন্তকারীরা তাঁর কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে কয়েকটি সন্দেহজনক মোবাইল নম্বর শনাক্ত করেন, যেগুলো থেকে নিয়মিত যোগাযোগ করা হতো।
তদন্তে দেখা যায়, ২০২৩ সাল থেকে রাজধানীর বনানী ও মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার একই অবস্থান থেকে মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার সংক্ষিপ্ত সময়ের ফোনালাপ এবং খুদে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। পরে যাচাই করে জানা যায়, ব্যবহৃত সিমগুলো ভুয়া পরিচয়ে নিবন্ধিত ছিল। এতে তদন্ত আরও জটিল হয়ে ওঠে।
সন্দেহজনক নম্বরগুলোর প্রকৃত ব্যবহারকারীকে শনাক্ত করতে না পেরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তথ্যগুলো পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠায়। এরপর পুলিশ নিজস্ব প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনুসন্ধান শুরু করে। সেই তদন্তেই উঠে আসে, নম্বরগুলোর ব্যবহারকারী আর কেউ নন—১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত এবং দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর মোজাফফর হোসেন।
গত বুধবার রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ায় বিষয়টি দ্রুত আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনকে জানানো হয়। পরদিন আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাঁকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, তদন্ত সংস্থা মূলত সন্দেহজনক নম্বরগুলো শনাক্ত করেছিল। তবে সেই নম্বরের প্রকৃত ব্যবহারকারীকে চিহ্নিত করার জটিল কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করেছে পুলিশ। তাঁর ভাষায়, এই সাফল্যের মূল কৃতিত্ব পুলিশের প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেন। বিভিন্ন গবেষণা, বই ও বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে, ওই অভিযানে অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মেজর মোজাফফর। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং দীর্ঘদিন তাঁকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা ছিল।
দীর্ঘ ৪৫ বছর পর একটি মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ, কল ডিটেইল রেকর্ডের সূক্ষ্ম পর্যালোচনা এবং পুলিশের ধারাবাহিক প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত মিলিয়ে অবশেষে শেষ হয় তাঁর পলাতক জীবনের অধ্যায়। এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তদন্তের সমন্বয় বহু বছরের অমীমাংসিত মামলারও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এনে দিতে পারে।

Share this news as a Photo Card