শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) মো. মোজাফফর হোসেনকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে ফেরারি জীবনযাপনের পর অবশেষে আইনের হাতে ধরা পড়লেন তিনি। রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানী থেকে বুধবার (১৫ জুলাই) রাতের আঁধারে তাকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বিকালে বিষয়টি এনটিভি অনলাইনকে নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকা মোজাফফর হোসেনকে আটকের পর ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে বিচারের মুখোমুখি না হয়ে ঘুরে বেড়ানো এই আসামির গ্রেপ্তার নতুন করে উসকে দিয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক রক্তক্ষরা অধ্যায়ের স্মৃতি।
কে ছিলেন জিয়াউর রহমান
বাংলাদেশের ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন একাধারে একজন মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সেনাপ্রধান এবং দেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের রূপকার। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগমারা গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অবিস্মরণীয় নাম। মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা তাকে জাতীয় বীরের আসনে বসিয়েছিল, আর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।
ক্ষমতায় আসার পর জিয়াউর রহমান দেশ পরিচালনার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার দিকেও মনোযোগী হন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—সংক্ষেপে বিএনপি। তার হাতে গড়া এই রাজনৈতিক দল পরবর্তী দশকগুলোতে একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
চট্টগ্রামের সেই রক্তাক্ত রাত
১৯৮১ সালের ২৯ মে এক সরকারি সফরে চট্টগ্রামে যান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সে সফরই হয়ে ওঠে তার জীবনের শেষ যাত্রা। পরদিন ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিপথগামী সেনাসদস্য আকস্মিক হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করে। রাষ্ট্রপ্রধানের ওপর এমন নৃশংস আক্রমণ সে সময় গোটা জাতিকে হতবিহ্বল করে দিয়েছিল।
হত্যাকাণ্ডের পর ষড়যন্ত্রকারী সেনাসদস্যরা তার মরদেহ চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গভীর জঙ্গলে গোপনে কবর দেয়, যাতে ঘটনার প্রকৃত সত্য আড়াল করা যায়। তবে তিন দিন পর উদ্ধার করা হয় সেই মরদেহ, এরপর তা নিয়ে আসা হয় রাজধানী ঢাকায়। শেরেবাংলা নগরে তার জানাজায় শরিক হন লাখ লাখ শোকার্ত মানুষ—যে দৃশ্য আজও অনেকের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ ভবন চত্বরেই তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়, যেখানে আজও প্রতিদিন শ্রদ্ধা জানাতে আসেন অসংখ্য মানুষ।
৪৫ বছরের পলাতক জীবনের অবসান
জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় সামরিক আদালতে বিচার হয় এবং একাধিক আসামিকে দণ্ড দেওয়া হয়। তবে বিচার প্রক্রিয়া চলাকালেই কয়েকজন আসামি আত্মগোপনে চলে যান, যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) মো. মোজাফফর হোসেন। দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েও দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি ছদ্মবেশে জীবনযাপন করেন, আইনের চোখ এড়িয়ে থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অবশেষে দীর্ঘ অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা তৎপরতার মধ্য দিয়ে বুধবার রাতে রাজধানীর বনানী থেকে তাকে আটক করে ডিবি পুলিশ। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ফেরারি থাকার পর তার এই গ্রেপ্তার শুধু একটি পুরনো মামলার অগ্রগতি নয়, বরং জাতির এক বেদনাদায়ক অধ্যায়ের প্রতি নতুন করে দৃষ্টি ফেরানোর সুযোগও তৈরি করেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, আটকের পরপরই তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, যেখানে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
একটি ইতিহাসের প্রতিধ্বনি
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা, সেনাপ্রধান এবং রাষ্ট্রপ্রধানের এমন করুণ পরিণতি জাতিকে বহু বছর ধরে শোকাহত করে রেখেছিল। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।
দীর্ঘদিন পলাতক থাকা আসামির গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে এই মামলার প্রায়-সমাপ্ত অধ্যায়ে যুক্ত হলো নতুন এক মাত্রা। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে সময় যত গড়াক না কেন, ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া থেমে থাকে না। আইনের দীর্ঘ হাত অবশেষে পৌঁছে যায় সেই ব্যক্তির কাছে, যিনি দশকের পর দশক নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলেন সমাজের অলক্ষ্যে।
এখন দেখার বিষয়, সেনাবাহিনীর হাতে হস্তান্তরিত হওয়া মেজর মোজাফফর হোসেনের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কোন পথে এগোয়। তবে এতটুকু নিশ্চিত যে, দীর্ঘ ৪৫ বছরের রহস্য-ঘেরা পলাতক জীবনের অবসান ঘটিয়ে এই গ্রেপ্তার আবারও জাতির সামনে তুলে ধরেছে ইতিহাসের সেই বেদনাবিধুর অধ্যায়, যা আজও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 





















