দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেয়ে দেশের বিচারপতিদের দায় আরও বেশি বলে মন্তব্য করেছেন আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। একই সঙ্গে তিনি ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি, চাটুকারিতা এবং ক্ষমতার সঙ্গে অবস্থান বদলে ফেলার প্রবণতাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি।
আজ শনিবার (২৫ জুলাই) রাজধানীর তোপখানা রোডের সিরডাপ মিলনায়তনে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ আয়োজিত ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য রাখার সময় এসব কথা বলেন তিনি।
‘বিচারপতিদের অপরাধ হাসিনার চেয়েও বেশি’
মাহমুদুর রহমান তার বক্তব্যে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, শেখ হাসিনার চেয়ে যদি কারও বেশি অপরাধ থাকে, তাহলে সেটি বিচারপতিদের। তার ভাষায়, ‘আপনারাই সেই মাঠ তৈরি করেছেন, যার ফলে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।’ বিচার বিভাগের এমন ভূমিকার পেছনে একটি ব্যাখ্যাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, এর মূল কারণ বাংলাদেশের গভীরে প্রোথিত ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রমেই দুর্বল করে দিয়েছে।
বিচার বিভাগের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে মানুষের চরিত্র বদলে যায়। এমনকি যদি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিন মাস বিচার বিভাগ বা হাইকোর্ট বন্ধ রাখা হতো, তাতেও দেশের তেমন কোনো ক্ষতি হতো না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘পুলিশ ছাড়াও বাংলাদেশ সভ্য প্রমাণ করেছে’
নিজের বক্তব্যের সমর্থনে ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময়কার একটি উদাহরণ টানেন মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, সে সময় টানা চার দিন পুলিশ না থাকলেও দেশে আইনশৃঙ্খলার ভয়াবহ কোনো অবনতি হয়নি। অথচ নিউ ইয়র্কের মতো শহরে চার দিন পুলিশ না থাকলে কেউ নিরাপদে থাকতে পারত না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, এই ঘটনাই প্রমাণ করে, বাংলাদেশের মানুষকে যতই খারাপ বলা হোক না কেন, তারা প্রকৃতপক্ষে যথেষ্ট সভ্য।
নিজের ওপর হামলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন সম্পাদক
বক্তব্যের একপর্যায়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, কুষ্টিয়ায় আদালত চত্বরে তার ওপর হামলা হলেও সে সময় বিচার বিভাগ কিংবা সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ আসেনি। তার বিরুদ্ধে তখন ১২৫টি মামলা থাকায় দেশের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে হাজিরা দিতে হতো তাকে। এসব মামলা একত্র করে ঢাকায় স্থানান্তরের আবেদন জানানো হলেও কোনো বিচারপতি তা গ্রহণ করেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, হামলায় আহত হওয়ার পরদিনও সুনামগঞ্জের আদালতে হাজিরা দেওয়ার কথা ছিল তার। সেখানে না গেলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আশঙ্কা ছিল। এমন পরিস্থিতিতে হাইকোর্টে গিয়ে আগাম জামিন চাইতে গেলে একজন বিচারপতি তাকে বলেছিলেন, ‘আপনার চেহারা দেখতে আমাদের ভালো লাগে না। আপনি আর কখনো হাইকোর্টে আসবেন না।’ এই মন্তব্য প্রসঙ্গে মাহমুদুর রহমান বলেন, একজন বিচারপতির মুখে এমন ভাষা উচ্চারণই প্রমাণ করে, বিচার বিভাগ তখন কোন অবস্থায় ছিল। তার দাবি, এসব কারণেই দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
রাষ্ট্রপতির ‘পায়ের ধুলা’ মন্তব্য নিয়ে কটাক্ষ
ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতির কারণে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরাও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেন মাহমুদুর রহমান। এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, একজন রাষ্ট্রপতি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর পায়ের ধুলা আর নিতে পারবেন না বলে তার দুঃখ হচ্ছে।
এই মন্তব্যকে কটাক্ষ করে মাহমুদুর রহমান বলেন, যিনি শেখ হাসিনার পায়ের ধুলা নিতে পেরেছেন, তিনি চাইলে তারেক রহমানের পায়ের ধুলাও নিতে পারতেন—তাহলে হয়তো পদত্যাগ করতে হতো না তাকে। এ ধরনের মানসিকতাকেই তিনি রাষ্ট্র ধ্বংসের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ খারাপ নয়, তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরে চাটুকারিতা ও ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি গভীরভাবে প্রবেশ করেছে। এ কারণেই তিনি অনেকের কাছে অপছন্দের ব্যক্তি, কেননা তিনি সব সময় অপ্রিয় সত্য কথা বলে থাকেন বলে দাবি করেন তিনি।
‘নিজেও একজন ভুক্তভোগী’
নিজের ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে মাহমুদুর রহমান বলেন, তিনি নিজেও একজন ভুক্তভোগী। সাধারণত ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করেন না তিনি, তবে প্রসঙ্গক্রমে সেসব কথা বলতে হয়েছে বলে জানান।
ভবিষ্যতে যেন আর কখনো এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে নিজে সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং অন্যদেরও সত্য তথ্য নিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার আহ্বান জানান, যাতে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা মেলে।
বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের ইতিহাস তুলে ধরলেন
বক্তব্যে বিএনপির সঙ্গে ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পর্কের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মাহমুদুর রহমান। তিনি স্মরণ করেন, একসময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জনসভায় গেলে ‘আমার দেশ’-এর একটি কপি সঙ্গে নিয়ে যেতেন এবং বক্তব্যের সময় সেখান থেকে সংবাদ উদ্ধৃত করতেন। সে সময় সরকারপক্ষ ‘আমার দেশ’কে বিএনপির পত্রিকা বলে আখ্যা দিয়ে তার ওপর নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করত বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যখন অনেকেই সে বিষয়ে নীরব ছিলেন, তখন ‘আমার দেশ’ প্রথম বলেছিল এটি ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি। পরবর্তী সময়ে সেই কথাই সত্য প্রমাণিত হয় বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষায়, এখনো ‘আমার দেশ’ ভুক্তভোগীদের কথা তুলে ধরে চলেছে। এমনকি আটজন ভুক্তভোগীর কাহিনি ‘আমার দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও অন্য কোনো সংবাদপত্র তা প্রকাশ করেনি বলে দাবি করেন তিনি।
‘অলিগার্কদের নিয়ন্ত্রণে দেশের বেশিরভাগ সংবাদপত্র’
বাংলাদেশের অধিকাংশ সংবাদপত্রকে অলিগার্কদের নিয়ন্ত্রিত বলে মন্তব্য করেন মাহমুদুর রহমান। তার মতে, নানা ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকায় এসব পত্রিকা ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করতে পারে না। তবে ‘আমার দেশ’-এর কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ না থাকায় তারা লড়াই চালিয়ে যেতে পারছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, যে বিএনপি একসময় ‘আমার দেশ’কে নিজেদের ঘনিষ্ঠ পত্রিকা হিসেবে দেখত, এখন ক্ষমতায় গিয়ে সেই দলই পত্রিকাটিকে জামায়াতের পত্রিকা বলে আখ্যা দিচ্ছে। তার ব্যাখ্যায়, সরকারকে তোষামোদ বা চাটুকারিতা না করলেই এমন তকমা জুটে যায়। ক্ষমতায় গেলেই সবাই কেবল প্রশংসা শুনতে চায়—এটিই যেন বাংলাদেশের জাতীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি এবং এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান।
হিটলারের জার্মানি ও ইসরায়েলের তুলনা
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট টেনে মাহমুদুর রহমান বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ‘নেভার এগেইন’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল, যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো গণহত্যা না ঘটে। কিন্তু আজ যাদের জন্য সেই অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তারাই এখন অন্যদের ওপর একই ধরনের নির্যাতন চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হিটলারের জার্মানি ও বর্তমান ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধে তিন দফা প্রস্তাব
বাংলাদেশে যেন ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্যাসিবাদ ফিরে না আসে, সে জন্য তিনটি বিষয়কে জরুরি বলে উল্লেখ করেন মাহমুদুর রহমান।
প্রথমত, দল-মতনির্বিশেষে সব অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার আশা না করে। দ্বিতীয়ত, প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সরকারের যুক্তিসংগত ও বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করার মতো পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বর্তমান সরকারকে মনে রাখতে হবে যে তারাও দীর্ঘ ১৭ বছর ভুক্তভোগী ছিল; তাই তারা যেন নতুন করে অত্যাচারীতে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
‘গ্রেপ্তারের জন্য প্রস্তুত আছি’
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে নিজের বিরুদ্ধে চলমান মামলার তথ্যও তুলে ধরেন মাহমুদুর রহমান। তিনি জানান, তার বিরুদ্ধে একসময় মোট ১২৫টি মামলা ছিল, যার মধ্যে ৬৫টির নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ৫০টি মামলা বহাল রয়েছে বলে জানান তিনি। সরকার চাইলে এসব মামলায় যেকোনো সময় তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে বলে মন্তব্য করে তিনি জানান, এ জন্য তিনি প্রস্তুত আছেন।
সেমিনারে দেওয়া তার এই বক্তব্য দেশের বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফ্যাসিবাদ-উত্তর বাংলাদেশে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে করণীয় নিয়ে তার মন্তব্য বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 




















