ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের যাবতীয় কর্মকাণ্ড ও খরচের তদন্ত চেয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনের সূত্র ধরে তিনি এই দাবি তোলেন, যেখানে বলা হয়েছে ওই সময়ে সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছিল।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করছি, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের সব কিছুর জন্য আপনি দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নিযুক্ত করুন। দুর্নীতি কোথায় হয়েছে, কীভাবে হয়েছে, কারা করেছেন—সবকিছু খুঁজে বের করুক।” তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বিগত সরকারের কেউ কোনোভাবেই ছাড় পেতে পারেন না।
জুলাই সনদ ও ‘আপস’ বিতর্ক
বাজেট অধিবেশনে এর আগে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি পূর্ববর্তী বক্তব্য টেনে সমালোচনা করেছিলেন। নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে নির্বাচনের স্বার্থে তারা ‘জুলাই সনদে’ আপস করে স্বাক্ষর করেছিলেন। ফলে এই সরকারের সব কথায় সাধারণ মানুষ কীভাবে আস্থা রাখবে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সংসদে নিজের বক্তব্যে সেই সমালোচনার জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, “একটা চরম অস্থির সময় পার করে আমাদের নির্বাচন আদায় করতে হয়েছে। বলা হচ্ছে আমি নাকি সরল স্বীকারোক্তি দিয়েছি যে অনেক কিছু আপস করে আমরা জুলাই সনদে সই করেছি? হ্যাঁ, করেছি। আমরা নির্বাচনের স্বার্থে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে জুলাই সনদে সবাই মিলে সমঝোতায় এসেছি এবং স্বাক্ষর করেছি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “হয়তো আমরা সব বিষয়ে একমত নাও হতে পারতাম, কিন্তু জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের আপস করতে হয়েছে। এটাকে কেন বিকৃত করা হচ্ছে? যাদের পরিকল্পনা ছিল নির্বাচন না দিয়ে পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার, তাদের চক্রান্তও তো আমাদের নজরে রাখতে হয়েছিল।”
আইনশৃঙ্খলা ও বিরোধী দলের সমালোচনা
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যর্থ—বিরোধী দলের এমন বিদ্রুপ ও সমালোচনারও কড়া জবাব দেন সালাহউদ্দিন আহমদ। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো অবনতি হয়নি দাবি করে তিনি সাম্প্রতিক কিছু দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার উদাহরণ টানেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বিরোধীদলীয় নেতা ১৫ দিনের মধ্যে মিরপুরের পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিচার চেয়েছিলেন, কিন্তু মাত্র ৫ কার্যদিবসের মধ্যে সেই বিচার সম্পন্ন হয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রামেও শিশু ধর্ষণের দ্রুত বিচার হয়েছে।” এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে চান যে, অপরাধ দমনে প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা অত্যন্ত তৎপর রয়েছে।
আওয়ামী লীগ আমলের অর্থ পাচার ও বর্তমান বাজেট
বাজেট বক্তৃতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের খতিয়ান তুলে ধরেন। অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্রের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ শাসনামলে দেশ থেকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই সংসদে তৎকালীন সময়ে দুর্নীতিবাজদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। বিগত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ কেবল উন্নয়ন প্রকল্পগুলো থেকেই ২৪ বিলিয়ন ডলারের রাজনৈতিক চাঁদাবাজি করেছে।”
বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এমন একটা ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের এই বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে। একদিকে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতি ও তার প্রভাব, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে মুদ্রা ব্যবস্থার পতন ও দুর্ভিক্ষের হাতছানি—এতসব অস্থিরতার মাঝেও আমাদের সরকার কাজ করে যাচ্ছে।”
তিনি উল্লেখ করেন, দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে তাদের নেতা তারেক রহমানের নির্দেশনায় সরকারের ১০০ দিনের কর্মসূচির সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, দরিদ্র মানুষের সহায়তা এবং কৃষকদের উন্নয়নের সব পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 










