ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব: কার হাতে উঠছে সংগঠনের ভার

দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের এক বন্ধুর পথ পেরিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত এই ছাত্র সংগঠনের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির দুই বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের পয়লা মার্চ। রাকিবুল ইসলাম রাকিবের নেতৃত্বাধীন এই কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন নাছির উদ্দিন নাছির।

মেয়াদ ফুরানোর পর থেকেই সংগঠনের অভ্যন্তরে এবং বাইরে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে দলীয় অঙ্গন—সর্বত্রই এখন সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে বিএনপির শীর্ষপর্যায়ে নিয়মিতভাবে চলছে আলোচনা। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য যেসব নাম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে, তার মধ্যে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন আন্দোলন-সংগ্রামে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা এবং রাজপথে ভূমিকা রাখা নেতারা। পদপ্রত্যাশীদের অনেকের মতে, অতীতের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা নেতাদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হলে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও সন্তুষ্ট হবেন।

আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসছে বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমানের নাম, যিনি দলের অভ্যন্তরে পরিচিত দলের দুর্দিনের ভিপি হিসেবে। দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় থাকা এই নেতা বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও শুরু থেকে সামনের কাতারে ছিলেন। বিগত সরকারের আমলে তিনি তিনবার গুমের শিকার হয়েছিলেন এবং সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত-নিপীড়িতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বলে জানা যায়। তার সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়ে দলের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনা বেশ সরব, আর প্রান্তিক পর্যায়ের কর্মী থেকে শুরু করে নেতা-নেত্রীরাও তার ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করে থাকেন।

সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য এখন পর্যন্ত যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইজাজুল কবির রুয়েল, খোরশেদ আলম সোহেল, মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ, ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত, আমান উল্লাহ আমান, মমিনুল ইসলাম জিসান, মোস্তাফিজুর রহমান, শরীফ প্রধান শুভ, গণেশ চন্দ্র রায় সাহস এবং মো. আবু হুরায়রা।

সম্ভাব্য নেতৃত্বের পরিচিতি

বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির দুই নম্বর সহ-সভাপতি ইজাজুল কবির রুয়েল আলোচনায় থাকা অন্যতম প্রধান নাম। বিজ্ঞান অনুষদের এই শিক্ষার্থী এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ছিলেন। আন্দোলন-সংগ্রামের পরিচিত মুখ এই ছাত্রনেতা ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে সবার নজর কাড়েন। ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নিজ বিভাগের পড়াশোনায়ও ভালো ফলের জন্য সুনাম রয়েছে তার। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শুরু থেকেই সব কর্মসূচিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। আন্দোলনে সরব উপস্থিতি, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও শিক্ষার্থীদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা—এসব কারণে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে তাকে এগিয়ে রাখছেন অনেক নেতাকর্মী।

কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেলও রয়েছেন আলোচনায়। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করা সোহেল বিগত সরকারের আমলে আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য।

সহ-সভাপতি মঞ্জুরুল আলম রিয়াদের নামও শোনা যাচ্ছে জোরালোভাবে। কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রিয়াদ বিগত সরকারের সময় আন্দোলনে সক্রিয় থেকে বারবার রিমান্ডে গেছেন, মাসের পর মাস কাটিয়েছেন কারাগারে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল বর্তমানে ছাত্রদলের সহ-সভাপতি। এর আগে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন তিনি। আন্দোলন-সংগ্রামের পরিচিত মুখ হিসেবে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আউয়াল।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি, এর আগে ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। বিগত সরকারের আমলে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকার জন্য পরিচিত বাসেত ২০১৫ সালের অবরোধ কর্মসূচিতে গুলির মুখে চার তলা থেকে পুলিশের হাতে নিক্ষিপ্ত হন। তিন দিন নিখোঁজ থাকার পাশাপাশি একাধিক মামলায় টানা আট মাসের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন তিনি। নেতাকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে সৃজনশীল নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন বাসেত। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনেও তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

সংগীত বিভাগের ছাত্র আমান উল্লাহ আমান বর্তমানে ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক। এর আগে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন তিনি। ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে দুই মাস কারাগারে কাটান আমান। ৫ আগস্টের পর সংগঠনকে সুশৃঙ্খল করা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইতিবাচক রাজনীতি নিয়ে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র মমিনুল ইসলাম জিসান বর্তমানে ছাত্রদলের এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ আমলে একাধিকবার মামলা-হামলার শিকার হয়ে ছয়বার আটক হয়েছেন জিসান, সবচেয়ে দীর্ঘ কারাবাস ছিল প্রায় দুই বছরের। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও শুরু থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র শরীফ প্রধান শুভ বর্তমানে যুগ্ম সম্পাদক পদমর্যাদায় প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে কেন্দ্রীয় সংসদের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক ছিলেন তিনি। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রথম দিন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন শুভ।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্বে থাকা গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বিগত আন্দোলনে ক্যাম্পাসে কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি মো. আবু হুরায়রাও আওয়ামী সরকারের আমলে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এই তালিকার বাইরেও একটি নাম আলোচনায় উঠে এসেছে—তিতুমীর কলেজ ছাত্রনেতা মহিউদ্দিন আলম। বিগত সরকারের সতেরো বছরে সবচেয়ে ত্যাগী ও অবহেলিত, পদবঞ্চিত নেতাদের একজন হিসেবে তার নামও এখন আলোচনার টেবিলে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারেক রহমানের হাতে

পদপ্রত্যাশী নেতারা বলছেন, বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতাদের দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হলে সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, আর তিনি যাকে যে দায়িত্ব দেবেন, তা সবাই মেনে নেবেন।

এ প্রসঙ্গে সহ-সভাপতি ইজাজুল কবির রুয়েল বলেন, যেকোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে, তবে বর্তমান কমিটির কর্মসূচি আগামী তিন তারিখ পর্যন্ত থাকায় এর পরও ঘোষণা আসতে পারে। তিনি আরও বলেন, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং এ নিয়ে আলাদা কোনো বিতর্কের সুযোগ নেই।

সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেলের মতে, নেতাকর্মীদের মধ্যে সুস্থ ধারার প্রতিযোগিতা রয়েছে, কোনো প্রতিহিংসা নেই। তারেক রহমানের নির্দেশনায় ছাত্রদল একটি গুণগত, আদর্শভিত্তিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠবে বলে বিশ্বাস তার।

সহ-সভাপতি মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ বলেন, ছাত্রসমাজের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এমন নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে, যারা ব্যক্তিনির্ভর নয়, বরং নীতি ও কর্মসূচিভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। এমন নেতৃত্বের হাত ধরেই একটি মেধাবী ও দক্ষ প্রজন্ম গড়ে উঠবে বলে তিনি আশাবাদী।

সহ-সভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়ালের ভাষায়, কমিটি গঠন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং স্বাভাবিক নিয়মেই নতুন কমিটি গঠিত হবে। সহ-সভাপতি কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘদিন সম্মুখসারিতে থাকা এবং দলের প্রতি শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতাদের মূল্যায়ন করা হলে সংগঠন আরও গতিশীল ও কার্যকর হবে।

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান জানান, নতুন কমিটির নেতৃত্বে দেশ গঠনে অংশ নেবে ছাত্রদল এবং তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত তার নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সতেরো বছরের লড়াই-সংগ্রামের পর একটি অবৈধ সরকারকে উৎখাত করেছে ছাত্রদল, আর এখন লক্ষ্য দেশ পুনর্গঠনে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করা। মেধাবী, দক্ষ, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ও রাজপথে পরীক্ষিত নেতৃত্বই নির্বাচিত হবে বলে পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেন তিনি।

সব মিলিয়ে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে সংগঠনের ভেতরে-বাইরে বিরাজ করছে টানটান আগ্রহ। কবে নাগাদ ঘোষণা হবে নতুন কমিটি, আর কারা আসছেন নেতৃত্বে—এসব প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় এখন গোটা ছাত্রদল।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

শিশুদের সঠিক গড়ে ওঠার ওপর গুরুত্ব দিলেন প্রধানমন্ত্রী

২৮ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব: কার হাতে উঠছে সংগঠনের ভার

আপডেট সময় ০৫:১৭:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের এক বন্ধুর পথ পেরিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত এই ছাত্র সংগঠনের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির দুই বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের পয়লা মার্চ। রাকিবুল ইসলাম রাকিবের নেতৃত্বাধীন এই কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন নাছির উদ্দিন নাছির।

মেয়াদ ফুরানোর পর থেকেই সংগঠনের অভ্যন্তরে এবং বাইরে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে দলীয় অঙ্গন—সর্বত্রই এখন সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে বিএনপির শীর্ষপর্যায়ে নিয়মিতভাবে চলছে আলোচনা। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য যেসব নাম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে, তার মধ্যে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন আন্দোলন-সংগ্রামে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা এবং রাজপথে ভূমিকা রাখা নেতারা। পদপ্রত্যাশীদের অনেকের মতে, অতীতের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা নেতাদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হলে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও সন্তুষ্ট হবেন।

আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসছে বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমানের নাম, যিনি দলের অভ্যন্তরে পরিচিত দলের দুর্দিনের ভিপি হিসেবে। দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় থাকা এই নেতা বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও শুরু থেকে সামনের কাতারে ছিলেন। বিগত সরকারের আমলে তিনি তিনবার গুমের শিকার হয়েছিলেন এবং সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত-নিপীড়িতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বলে জানা যায়। তার সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়ে দলের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনা বেশ সরব, আর প্রান্তিক পর্যায়ের কর্মী থেকে শুরু করে নেতা-নেত্রীরাও তার ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করে থাকেন।

সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য এখন পর্যন্ত যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইজাজুল কবির রুয়েল, খোরশেদ আলম সোহেল, মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ, ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত, আমান উল্লাহ আমান, মমিনুল ইসলাম জিসান, মোস্তাফিজুর রহমান, শরীফ প্রধান শুভ, গণেশ চন্দ্র রায় সাহস এবং মো. আবু হুরায়রা।

সম্ভাব্য নেতৃত্বের পরিচিতি

বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির দুই নম্বর সহ-সভাপতি ইজাজুল কবির রুয়েল আলোচনায় থাকা অন্যতম প্রধান নাম। বিজ্ঞান অনুষদের এই শিক্ষার্থী এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ছিলেন। আন্দোলন-সংগ্রামের পরিচিত মুখ এই ছাত্রনেতা ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে সবার নজর কাড়েন। ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নিজ বিভাগের পড়াশোনায়ও ভালো ফলের জন্য সুনাম রয়েছে তার। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শুরু থেকেই সব কর্মসূচিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। আন্দোলনে সরব উপস্থিতি, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও শিক্ষার্থীদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা—এসব কারণে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে তাকে এগিয়ে রাখছেন অনেক নেতাকর্মী।

কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেলও রয়েছেন আলোচনায়। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করা সোহেল বিগত সরকারের আমলে আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য।

সহ-সভাপতি মঞ্জুরুল আলম রিয়াদের নামও শোনা যাচ্ছে জোরালোভাবে। কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রিয়াদ বিগত সরকারের সময় আন্দোলনে সক্রিয় থেকে বারবার রিমান্ডে গেছেন, মাসের পর মাস কাটিয়েছেন কারাগারে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল বর্তমানে ছাত্রদলের সহ-সভাপতি। এর আগে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন তিনি। আন্দোলন-সংগ্রামের পরিচিত মুখ হিসেবে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আউয়াল।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি, এর আগে ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। বিগত সরকারের আমলে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকার জন্য পরিচিত বাসেত ২০১৫ সালের অবরোধ কর্মসূচিতে গুলির মুখে চার তলা থেকে পুলিশের হাতে নিক্ষিপ্ত হন। তিন দিন নিখোঁজ থাকার পাশাপাশি একাধিক মামলায় টানা আট মাসের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন তিনি। নেতাকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে সৃজনশীল নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন বাসেত। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনেও তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

সংগীত বিভাগের ছাত্র আমান উল্লাহ আমান বর্তমানে ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক। এর আগে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন তিনি। ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে দুই মাস কারাগারে কাটান আমান। ৫ আগস্টের পর সংগঠনকে সুশৃঙ্খল করা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইতিবাচক রাজনীতি নিয়ে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র মমিনুল ইসলাম জিসান বর্তমানে ছাত্রদলের এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ আমলে একাধিকবার মামলা-হামলার শিকার হয়ে ছয়বার আটক হয়েছেন জিসান, সবচেয়ে দীর্ঘ কারাবাস ছিল প্রায় দুই বছরের। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও শুরু থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র শরীফ প্রধান শুভ বর্তমানে যুগ্ম সম্পাদক পদমর্যাদায় প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে কেন্দ্রীয় সংসদের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক ছিলেন তিনি। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রথম দিন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন শুভ।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্বে থাকা গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বিগত আন্দোলনে ক্যাম্পাসে কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি মো. আবু হুরায়রাও আওয়ামী সরকারের আমলে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এই তালিকার বাইরেও একটি নাম আলোচনায় উঠে এসেছে—তিতুমীর কলেজ ছাত্রনেতা মহিউদ্দিন আলম। বিগত সরকারের সতেরো বছরে সবচেয়ে ত্যাগী ও অবহেলিত, পদবঞ্চিত নেতাদের একজন হিসেবে তার নামও এখন আলোচনার টেবিলে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারেক রহমানের হাতে

পদপ্রত্যাশী নেতারা বলছেন, বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতাদের দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হলে সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, আর তিনি যাকে যে দায়িত্ব দেবেন, তা সবাই মেনে নেবেন।

এ প্রসঙ্গে সহ-সভাপতি ইজাজুল কবির রুয়েল বলেন, যেকোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে, তবে বর্তমান কমিটির কর্মসূচি আগামী তিন তারিখ পর্যন্ত থাকায় এর পরও ঘোষণা আসতে পারে। তিনি আরও বলেন, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং এ নিয়ে আলাদা কোনো বিতর্কের সুযোগ নেই।

সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেলের মতে, নেতাকর্মীদের মধ্যে সুস্থ ধারার প্রতিযোগিতা রয়েছে, কোনো প্রতিহিংসা নেই। তারেক রহমানের নির্দেশনায় ছাত্রদল একটি গুণগত, আদর্শভিত্তিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠবে বলে বিশ্বাস তার।

সহ-সভাপতি মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ বলেন, ছাত্রসমাজের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এমন নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে, যারা ব্যক্তিনির্ভর নয়, বরং নীতি ও কর্মসূচিভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। এমন নেতৃত্বের হাত ধরেই একটি মেধাবী ও দক্ষ প্রজন্ম গড়ে উঠবে বলে তিনি আশাবাদী।

সহ-সভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়ালের ভাষায়, কমিটি গঠন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং স্বাভাবিক নিয়মেই নতুন কমিটি গঠিত হবে। সহ-সভাপতি কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘদিন সম্মুখসারিতে থাকা এবং দলের প্রতি শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতাদের মূল্যায়ন করা হলে সংগঠন আরও গতিশীল ও কার্যকর হবে।

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান জানান, নতুন কমিটির নেতৃত্বে দেশ গঠনে অংশ নেবে ছাত্রদল এবং তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত তার নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সতেরো বছরের লড়াই-সংগ্রামের পর একটি অবৈধ সরকারকে উৎখাত করেছে ছাত্রদল, আর এখন লক্ষ্য দেশ পুনর্গঠনে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করা। মেধাবী, দক্ষ, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ও রাজপথে পরীক্ষিত নেতৃত্বই নির্বাচিত হবে বলে পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেন তিনি।

সব মিলিয়ে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে সংগঠনের ভেতরে-বাইরে বিরাজ করছে টানটান আগ্রহ। কবে নাগাদ ঘোষণা হবে নতুন কমিটি, আর কারা আসছেন নেতৃত্বে—এসব প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় এখন গোটা ছাত্রদল।

Share this news as a Photo Card