আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে ‘নিখোঁজ’ হওয়া সুখরঞ্জন বালিকে গুমের চাঞ্চল্যকর মামলায় অবশেষে আইনি পদক্ষেপ শুরু হলো। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে অবসরপ্রাপ্ত সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. ফজলুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
আজ শুক্রবার বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম শুনানি শেষে এই আদেশ প্রদান করেন। যদিও শুনানির সময় শারীরিক অসুস্থতা বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণে ফজলুর রহমানকে এজলাসে সরাসরি হাজির করা হয়নি, তিনি আদালতের হাজতখানাতেই ছিলেন।
যেভাবে গ্রেপ্তার হলেন ফজলুর রহমান
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত বৃহস্পতিবার রাতে। রাজধানীর বাড্ডার নিজ বাসা থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়। আজ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা মো. হেলালুল ইসলাম তাকে আদালতে হাজির করে গুমের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানানো হয়।
ট্রাইব্যুনাল চত্বর থেকে যেভাবে ‘নিখোঁজ’ হন বালি
তদন্ত সংস্থার নথিপত্রে উঠে এসেছে সেই ভয়াবহ ঘটনার বিবরণ। ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সুখরঞ্জন বালি তার আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পুরোনো হাইকোর্ট ভবনের প্রধান ফটকের সামনে পৌঁছান। অভিযোগ রয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক গাড়ি থেকে নামিয়ে একটি সাদা ডাবল কেবিন গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, সুখরঞ্জন বালিকে চোখ বেঁধে প্রায় দুই মাস একটি অন্ধকার কক্ষে আটকে রেখে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের পর তাকে জোরপূর্বক সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে ভারতের দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে দীর্ঘ পাঁচ বছর কারাবন্দী ছিলেন তিনি। পরে বিষয়টি ভারতের গণমাধ্যমে উঠে এলে তার ছেলে অপূর্ব বালি ভারতে গিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় বাবাকে জামিনে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনেন।
তদন্তে মিলল সম্পৃক্ততার প্রমাণ
তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, ঘটনার দিন ডিবি পুলিশের দুটি ডাবল কেবিন গাড়ি ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই গাড়িতে ফজলুর রহমান ও তার সঙ্গীরা সুখরঞ্জন বালিকে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ থেকে তুলে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যান। পরবর্তীতে তাকে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। তদন্তে এই ঘটনায় ফজলুর রহমানের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
ঘটনার পটভূমি: একটি আলোচিত গুম
২০১২ সালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে আসা সুখরঞ্জন বালির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। তৎকালীন আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তাকে সীমান্ত এলাকায় পাওয়া গেছে। তবে তার পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে শুরু থেকেই অভিযোগ ছিল যে, ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকেই তাকে গুম করা হয়েছিল।
২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুখরঞ্জন বালি মৃত্যুবরণ করেন। এর আগে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, একই বছরের ২১ আগস্ট তিনি নিজেই প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। তার সেই অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহাসহ ৩২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। তালিকায় নাম ছিল ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমসহ তৎকালীন সরকারের উচ্চপদস্থ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও কর্মকর্তার।
বর্তমানে ফজলুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর মাধ্যমে এই আলোচিত মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 













