প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: ভারতের নজরদারি?

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর এবং এর ফলে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন মোড় ভারতের নীতিনির্ধারকদের নজর কেড়েছে। বিশেষ করে চীন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডর তৈরির যে প্রস্তাব বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এসেছে, তার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নয়াদিল্লি বেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের বিভিন্ন দিক নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর যেকোনো ধরনের ঘটনাপ্রবাহ ভারত অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

অর্থনৈতিক করিডর: পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ঢাকা

গত মাসের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর করেন। এই সফরের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং কর্তৃক উত্থাপিত একটি প্রস্তাব। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং যোগাযোগ ও অর্থনীতির পরিধি আরও বিস্তৃত করতে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছেন।

তবে চীনের এই উচ্চাভিলাষী প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ খুব সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এ বিষয়ে জানান, চীনের প্রস্তাবিত করিডরের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা নিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে ঢাকা এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত অবস্থান গ্রহণ করেনি।

যুদ্ধবিমান কেনা ও ভারতের উদ্বেগ

নয়াদিল্লির ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকালে বাংলাদেশের যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহের বিষয়টি সামনে আনেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সফরে চীন থেকে জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ বা চীন—কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নিশ্চিত করেনি। এমনকি ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এ সংক্রান্ত প্রশ্নে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের মনোভাব জানতে চাইলে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সরাসরি কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। তিনি বলেন, “এসব ক্ষেত্রে যে ধরনের আলোচনা হয়, তার সবকিছুই ভারত নিরীক্ষণ করে। যখন যেমন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হয়, ভারত তা নেয়।” তবে এই ধরনের সামরিক উদ্যোগ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো ঝুঁকির কারণ কি না, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর দেননি।

তিস্তা প্রকল্প ও উন্নয়ন অংশীদারিত্ব

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে তিস্তা প্রকল্প এবং মোংলা বন্দরের উন্নয়ন নিয়ে চীনের সাথে যে আলোচনা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ভারতের সহযোগিতার বিষয়টি দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় এবং সেই রোডম্যাপ নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়।

তিস্তা নদী প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান প্রসঙ্গে মুখপাত্র স্পষ্ট করে বলেন, “এই বিষয়টি নিয়ে ভারতের মনোভাবের কথা বাংলাদেশকে আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। এই বিষয়ে যে কোনো অগ্রগতি সার্বিক আলোচনার ভিত্তিতেই সম্পন্ন হবে।”

ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক ভূ-রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে উন্নয়ন ও নিরাপত্তার স্বার্থে চীন ও ভারত—উভয় দেশের সঙ্গেই কৌশলগত সম্পর্ক রক্ষা করা অপরিহার্য। চীনের অর্থনৈতিক প্রস্তাবনাগুলো যেমন বাংলাদেশের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, তেমনি ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্কের সমীকরণ ঠিক রাখাটাও ঢাকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

চীনের সাথে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডর এবং সামরিক সরঞ্জাম কেনার আগ্রহ নিয়ে ভারত যে নীরব অথচ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, তা আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্যে কেমন প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

রাইসা-লাবণ চ্যাম্পিয়ন, ১০ স্বল্পদৈর্ঘ্যে নতুন শিল্পীদের অভিষেক

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

খেলাপির শীর্ষে জনতা, সরকারি ব্যাংকে টাকা রাখা মানেই কি নিরাপদ?

১৯ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: ভারতের নজরদারি?

আপডেট সময় ০৯:০৯:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর এবং এর ফলে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন মোড় ভারতের নীতিনির্ধারকদের নজর কেড়েছে। বিশেষ করে চীন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডর তৈরির যে প্রস্তাব বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এসেছে, তার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নয়াদিল্লি বেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের বিভিন্ন দিক নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর যেকোনো ধরনের ঘটনাপ্রবাহ ভারত অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

অর্থনৈতিক করিডর: পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ঢাকা

গত মাসের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর করেন। এই সফরের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং কর্তৃক উত্থাপিত একটি প্রস্তাব। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং যোগাযোগ ও অর্থনীতির পরিধি আরও বিস্তৃত করতে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছেন।

তবে চীনের এই উচ্চাভিলাষী প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ খুব সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এ বিষয়ে জানান, চীনের প্রস্তাবিত করিডরের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা নিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে ঢাকা এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত অবস্থান গ্রহণ করেনি।

যুদ্ধবিমান কেনা ও ভারতের উদ্বেগ

নয়াদিল্লির ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকালে বাংলাদেশের যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহের বিষয়টি সামনে আনেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সফরে চীন থেকে জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ বা চীন—কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নিশ্চিত করেনি। এমনকি ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এ সংক্রান্ত প্রশ্নে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের মনোভাব জানতে চাইলে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সরাসরি কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। তিনি বলেন, “এসব ক্ষেত্রে যে ধরনের আলোচনা হয়, তার সবকিছুই ভারত নিরীক্ষণ করে। যখন যেমন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হয়, ভারত তা নেয়।” তবে এই ধরনের সামরিক উদ্যোগ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো ঝুঁকির কারণ কি না, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর দেননি।

তিস্তা প্রকল্প ও উন্নয়ন অংশীদারিত্ব

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে তিস্তা প্রকল্প এবং মোংলা বন্দরের উন্নয়ন নিয়ে চীনের সাথে যে আলোচনা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ভারতের সহযোগিতার বিষয়টি দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় এবং সেই রোডম্যাপ নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়।

তিস্তা নদী প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান প্রসঙ্গে মুখপাত্র স্পষ্ট করে বলেন, “এই বিষয়টি নিয়ে ভারতের মনোভাবের কথা বাংলাদেশকে আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। এই বিষয়ে যে কোনো অগ্রগতি সার্বিক আলোচনার ভিত্তিতেই সম্পন্ন হবে।”

ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক ভূ-রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে উন্নয়ন ও নিরাপত্তার স্বার্থে চীন ও ভারত—উভয় দেশের সঙ্গেই কৌশলগত সম্পর্ক রক্ষা করা অপরিহার্য। চীনের অর্থনৈতিক প্রস্তাবনাগুলো যেমন বাংলাদেশের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, তেমনি ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্কের সমীকরণ ঠিক রাখাটাও ঢাকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

চীনের সাথে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডর এবং সামরিক সরঞ্জাম কেনার আগ্রহ নিয়ে ভারত যে নীরব অথচ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, তা আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্যে কেমন প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

Share this news as a Photo Card