শিরোনাম :
শাহজাদপুরে মাদক ব্যবসার অভিযোগে নারীর বাড়িতে ভাঙচুর, আইন নিজের হাতে না নেওয়ার আহ্বান পুলিশের ‘জুলাই চেতনা’ নিয়ে ব্যবসা কাম্য নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নতুন নেতৃত্বে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি: সভাপতি শিবা শানু, সাধারণ সম্পাদক জয় চৌধুরী লেভেল ক্রসিংয়ে মৃত্যুফাঁদ: প্রযুক্তি ও অব্যবস্থাপনার গোলকধাঁধায় রেলওয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’: ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৫০ সদস্যের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: ভারতের নজরদারি? সুখরঞ্জন বালি গুমের মামলা: গ্রেপ্তার সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ছেলেকে পাশে রেখে আমিরের ঘোষণা, ‘রোববার বিয়ে করছি’ ‘বাংলা কিউআর’-এর ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ক্যাশলেস অর্থনীতির চিত্র এলপিজির দাম কমল ৩৫৭ টাকা,১২ কেজির নতুন দাম হয়েছে ১ হাজার ৫২৮ টাকা।

লেভেল ক্রসিংয়ে মৃত্যুফাঁদ: প্রযুক্তি ও অব্যবস্থাপনার গোলকধাঁধায় রেলওয়ে

রেলপথ মানেই গন্তব্যে পৌঁছানোর নিরাপদ ও আরামদায়ক মাধ্যম—এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রেলপথের প্রতিটি মোড় যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদ। বিশেষ করে লেভেল ক্রসিংগুলোতে প্রতিনিয়ত ঝরছে তাজা প্রাণ। কখনো গেটম্যানের অবহেলা, কখনো অরক্ষিত ক্রসিং—সব মিলিয়ে রেলের যাত্রাপথ এখন এক আতঙ্কের নাম।

সম্প্রতি কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ঈদের রাতে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেনের সঙ্গে চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা এক বাসের সংঘর্ষে প্রাণ হারান ১২ জন যাত্রী। তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য; দায়িত্বে অবহেলা আর টাকার বিনিময়ে দায়িত্ব বদলের খেলার বলি হয়েছে অসংখ্য প্রাণ।

কেন থামছে না মৃত্যু?

২০১৫ সালে রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলে লেভেল ক্রসিংয়ের উন্নয়নে ৩৩৪ কোটি টাকার বিশাল দুটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। আশা ছিল, আধুনিকায়নের ছোঁয়ায় দুর্ঘটনা কমবে। অথচ কাজের কাজ হয়েছে সামান্যই। প্রকল্প শেষেও গেটম্যানের অমানবিক অবহেলা আর অরক্ষিত ক্রসিংয়ের তালিকা দীর্ঘই হচ্ছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে মোট ৩ হাজার ৪২৮ কিলোমিটার রেলপথে লেভেল ক্রসিং আছে ৩ হাজার ২৮৬টি। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারের সামান্য ব্যবধানেই একটি করে ক্রসিং। উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে ২ হাজার ১৪৪টি ক্রসিং পুরোপুরি অরক্ষিত। শতাংশের হিসাবে দেশের ৬৫ শতাংশ ক্রসিংয়েই কোনো গেটম্যান বা নিরাপত্তা প্রতিবন্ধক নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর বড় একটি অংশই অনুমোদনহীন। স্থানীয় সরকার বা অন্যান্য সংস্থা রেল কর্তৃপক্ষের অগোচরেই রেলপথের ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করেছে। ফলে এসব ক্রসিংয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় নিতে নারাজ রেল বিভাগ। বিপদ এড়াতে দায়সারাভাবে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ‘সতর্কবার্তা’, যা বাস্তবে কোনো কাজেই আসে না।

প্রযুক্তির খোঁজে রেলওয়ে

বারবার প্রাণহানির ঘটনায় টনক নড়েছে নীতিনির্ধারকদের। গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে লেভেল ক্রসিং নিরাপদ করতে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে রেলওয়ে এখন একটি স্বল্পমূল্যের ‘রেডিও ওয়ার্নিং সিস্টেম’ চালুর পরিকল্পনা করছে।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হাদীউজ্জামান বলেন, “আমরা এমন একটি ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছি যা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে দেশীয় প্রযুক্তির মিশেল ঘটাবে। এতে ট্রেন আসার সময় ও গতিপথ সম্পর্কে ক্রসিংয়ে স্বয়ংক্রিয় সংকেত পৌঁছাবে। এর ফলে গেটম্যানের ওপর নির্ভরশীলতা কমে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।”

এই প্রকল্পে প্রতিটি ক্রসিংয়ে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা ব্যয় হবে। জিপিএস প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থা সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে চলবে, যা দীর্ঘমেয়াদে রেলের নিরাপত্তার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দায় কি শুধুই গেটম্যানের?

রেলওয়ের বর্তমান সংকেতব্যবস্থায় মাত্র ১৫৪টি লেভেল ক্রসিংয়ে অটোমেশন আছে। বাকিগুলো এখনো গেটম্যানের হাতের ইশারায় বা ফোনের বার্তার ওপর নির্ভরশীল। কুমিল্লায় ট্রেনের নিচে বাস চলে আসার ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, গেটম্যানের সামান্য বিচ্যুতি বা দায়িত্ব বদলের দুর্নীতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র প্রযুক্তি বসিয়ে দুর্ঘটনা ঠেকানো সম্ভব নয়, যদি না এর তদারকি এবং কর্মীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। রেলের নিচের সারির কর্মীদের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে পুরো সংকেতব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজ করা এখন সময়ের দাবি।

৩৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যেখানে লেভেল ক্রসিংগুলো নিরাপদ হলো না, সেখানে নতুন এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হয়, তা দেখার অপেক্ষায় দেশবাসী। তবে নিশ্চিত করে বলা যায়, প্রতিটি সেকেন্ডের ভুল মানেই সড়কের কোনো পরিবারে দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার। আর সেই অন্ধকার ঘুচিয়ে নিরাপদ রেলযাত্রা নিশ্চিত করাই এখন রেল কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

শাহজাদপুরে মাদক ব্যবসার অভিযোগে নারীর বাড়িতে ভাঙচুর, আইন নিজের হাতে না নেওয়ার আহ্বান পুলিশের

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

এলপিজির দাম কমল ৩৫৭ টাকা,১২ কেজির নতুন দাম হয়েছে ১ হাজার ৫২৮ টাকা।

০২ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

লেভেল ক্রসিংয়ে মৃত্যুফাঁদ: প্রযুক্তি ও অব্যবস্থাপনার গোলকধাঁধায় রেলওয়ে

আপডেট সময় ০১:১৫:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬

রেলপথ মানেই গন্তব্যে পৌঁছানোর নিরাপদ ও আরামদায়ক মাধ্যম—এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রেলপথের প্রতিটি মোড় যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদ। বিশেষ করে লেভেল ক্রসিংগুলোতে প্রতিনিয়ত ঝরছে তাজা প্রাণ। কখনো গেটম্যানের অবহেলা, কখনো অরক্ষিত ক্রসিং—সব মিলিয়ে রেলের যাত্রাপথ এখন এক আতঙ্কের নাম।

সম্প্রতি কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ঈদের রাতে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেনের সঙ্গে চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা এক বাসের সংঘর্ষে প্রাণ হারান ১২ জন যাত্রী। তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য; দায়িত্বে অবহেলা আর টাকার বিনিময়ে দায়িত্ব বদলের খেলার বলি হয়েছে অসংখ্য প্রাণ।

কেন থামছে না মৃত্যু?

২০১৫ সালে রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলে লেভেল ক্রসিংয়ের উন্নয়নে ৩৩৪ কোটি টাকার বিশাল দুটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। আশা ছিল, আধুনিকায়নের ছোঁয়ায় দুর্ঘটনা কমবে। অথচ কাজের কাজ হয়েছে সামান্যই। প্রকল্প শেষেও গেটম্যানের অমানবিক অবহেলা আর অরক্ষিত ক্রসিংয়ের তালিকা দীর্ঘই হচ্ছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে মোট ৩ হাজার ৪২৮ কিলোমিটার রেলপথে লেভেল ক্রসিং আছে ৩ হাজার ২৮৬টি। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারের সামান্য ব্যবধানেই একটি করে ক্রসিং। উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে ২ হাজার ১৪৪টি ক্রসিং পুরোপুরি অরক্ষিত। শতাংশের হিসাবে দেশের ৬৫ শতাংশ ক্রসিংয়েই কোনো গেটম্যান বা নিরাপত্তা প্রতিবন্ধক নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর বড় একটি অংশই অনুমোদনহীন। স্থানীয় সরকার বা অন্যান্য সংস্থা রেল কর্তৃপক্ষের অগোচরেই রেলপথের ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করেছে। ফলে এসব ক্রসিংয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় নিতে নারাজ রেল বিভাগ। বিপদ এড়াতে দায়সারাভাবে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ‘সতর্কবার্তা’, যা বাস্তবে কোনো কাজেই আসে না।

প্রযুক্তির খোঁজে রেলওয়ে

বারবার প্রাণহানির ঘটনায় টনক নড়েছে নীতিনির্ধারকদের। গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে লেভেল ক্রসিং নিরাপদ করতে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে রেলওয়ে এখন একটি স্বল্পমূল্যের ‘রেডিও ওয়ার্নিং সিস্টেম’ চালুর পরিকল্পনা করছে।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হাদীউজ্জামান বলেন, “আমরা এমন একটি ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছি যা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে দেশীয় প্রযুক্তির মিশেল ঘটাবে। এতে ট্রেন আসার সময় ও গতিপথ সম্পর্কে ক্রসিংয়ে স্বয়ংক্রিয় সংকেত পৌঁছাবে। এর ফলে গেটম্যানের ওপর নির্ভরশীলতা কমে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।”

এই প্রকল্পে প্রতিটি ক্রসিংয়ে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা ব্যয় হবে। জিপিএস প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থা সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে চলবে, যা দীর্ঘমেয়াদে রেলের নিরাপত্তার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দায় কি শুধুই গেটম্যানের?

রেলওয়ের বর্তমান সংকেতব্যবস্থায় মাত্র ১৫৪টি লেভেল ক্রসিংয়ে অটোমেশন আছে। বাকিগুলো এখনো গেটম্যানের হাতের ইশারায় বা ফোনের বার্তার ওপর নির্ভরশীল। কুমিল্লায় ট্রেনের নিচে বাস চলে আসার ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, গেটম্যানের সামান্য বিচ্যুতি বা দায়িত্ব বদলের দুর্নীতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র প্রযুক্তি বসিয়ে দুর্ঘটনা ঠেকানো সম্ভব নয়, যদি না এর তদারকি এবং কর্মীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। রেলের নিচের সারির কর্মীদের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে পুরো সংকেতব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজ করা এখন সময়ের দাবি।

৩৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যেখানে লেভেল ক্রসিংগুলো নিরাপদ হলো না, সেখানে নতুন এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হয়, তা দেখার অপেক্ষায় দেশবাসী। তবে নিশ্চিত করে বলা যায়, প্রতিটি সেকেন্ডের ভুল মানেই সড়কের কোনো পরিবারে দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার। আর সেই অন্ধকার ঘুচিয়ে নিরাপদ রেলযাত্রা নিশ্চিত করাই এখন রেল কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Share this news as a Photo Card