যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে পুনরায় শান্তি আলোচনা শুরুর একটা সুযোগ তৈরি করতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর আপাতত হামলা স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ। গত রোববার মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কূটনীতিকে আরেকটা সুযোগ দিচ্ছেন, যাতে শান্তি আলোচনাকে সামনে এগিয়ে নেওয়া যায়।
এমন এক সময়ে তিনি এই মন্তব্য করলেন, যখন মার্কিন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমে আসার কারণেই ইরানের ওপর হামলা বন্ধের আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প।
এদিকে মার্কিন বাহিনীর পক্ষ থেকে টানা দুই রাত হামলা না চালানোয় ইরানও নিজেদের ‘প্রতিশোধমূলক’ পাল্টা হামলা স্থগিত রেখেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া। রোববার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, চলমান যুদ্ধে ইরান আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে কেবল হামলার জবাবে পাল্টা হামলা চালানোর সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। তার ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্র গত দুই রাতে যেহেতু হামলা বন্ধ রেখেছে, সেজন্য আমরা আমাদের সামরিক অভিযান স্থগিত রেখেছি।”
চল্লিশ দিনের যুদ্ধ থেকে চুক্তি পর্যন্ত
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তা টানা প্রায় চল্লিশ দিন ধরে চলে। এরপর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা শুরু করে ওয়াশিংটন ও তেহরান। দফায় দফায় বৈঠকের এক পর্যায়ে গত জুন মাসে দুই পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সপ্তাহ দুয়েক আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়ে যায়।
এর মধ্যে গত সপ্তাহে হামলা আরও তীব্র করার ইঙ্গিত দেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী। মার্কিন গণমাধ্যম এক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের বা আইআরজিসির বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালাতে সম্প্রতি বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। আইআরজিসির ড্রোন হামলায় মার্কিন সেনা হতাহতের ঘটনাও ঘটে। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই গত শুক্রবার অনেকটা আকস্মিকভাবে ইরানের ওপর হামলা বন্ধের সিদ্ধান্ত জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমে যাওয়াই কি আসল কারণ?
তিনি কি আপাতত যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আর খারাপের দিকে নিতে চাইছেন না—এমন প্রশ্নের জবাবে মি. ওয়াল্টজ আরেক মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসিকে বলেন, “আমি মোটেও অত দূরে যাব না। প্রেসিডেন্ট সব বিকল্পই খোলা রাখছেন।”
তবে নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যে আপাতত ইরানের ওপর সামরিক হামলা বৃদ্ধি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার পেছনের আসল কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমে আসা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে, ইরানের ওপর হামলা আরও বাড়ানো হলে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে আসতে পারে।
এছাড়া পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরান যেভাবে একের পর এক ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্রদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলার শঙ্কাও তৈরি হয়েছিল বলে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সার্বিক বিবেচনাতেই ট্রাম্প হামলা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
তবে মার্কিন গণমাধ্যমের এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ। তিনি বলেন, “এই অভিযানটি যতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন, সেটার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে মজুদ আছে।”
যদিও রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এর আগে নিজের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে এআই দিয়ে তৈরি একটি ছবি পোস্ট করেন তিনি, যেখানে মার্কিন সামরিক বিমানকে ইরানি জাহাজ ও খার্গ দ্বীপে বোমা ফেলতে দেখা যায়।
হরমুজ প্রণালি: যুদ্ধ থামার পথে সবচেয়ে বড় বাধা
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করতে গত শুক্রবার ও শনিবার তেহরানে ইরান ও ওমানের মধ্যে বেশ কয়েক দফায় কারিগরি বৈঠক হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই এখন যুদ্ধ স্থায়ীভাবে শেষ করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা তৈরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রথম দফায় চল্লিশ দিনের যুদ্ধ শেষে শান্তি আলোচনায় বসলেও, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরান—কোনো পক্ষই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি হয়নি। ফলে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি নৌ-অবরোধে এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে উভয়পক্ষ নৌ-অবরোধ তুলে নিয়ে পুনরায় জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করতে সম্মত হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেন, যেখানে পরবর্তী ষাট দিনের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে বিভিন্ন দেশের তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর ইরানি বাহিনীর হামলাকে কেন্দ্র করে গত ১৩ই জুলাই মার্কিন বাহিনী আবারও বিমান হামলা শুরু করে। সেইসঙ্গে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ পুনর্বহাল করেন ট্রাম্প।
জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালাতে থাকে। এসব হামলায় অন্তত চারজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দ্বিতীয় দফা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন হামলায় তাদের দেশে কয়েক ডজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, আহতও হয়েছেন অনেকে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
এখন উভয়পক্ষ হামলা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কূটনৈতিকভাবে সমস্যা সমাধানের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। যদিও যুদ্ধ অবসানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা এখনও নেই বলে মনে করছে ইরান।
যুদ্ধবিরতি পুনরায় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ইরানের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। তাদের কোনো সুস্পষ্ট কৌশল নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তে এবং সেন্টকমের কর্মকাণ্ডে এটিই প্রতিফলিত হয়।”
সব মিলিয়ে বলা যায়, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমে যাওয়া হোক বা কূটনৈতিক সুযোগ তৈরির প্রচেষ্টা—যে কারণেই হোক না কেন, সাময়িক এই বিরতি যুদ্ধের গতিপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে বিবেচিত হচ্ছে। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের অনড় অবস্থান এখনও স্থায়ী শান্তির পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে আছে। আগামী দিনগুলোতে এই আলোচনা কোন দিকে মোড় নেয়, বিশ্ব এখন সেদিকেই তাকিয়ে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 





















