নতুন মোড়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক

পানি বণ্টনের প্রশ্নে জলবিজ্ঞান, পরিবেশগত বাস্তবতা এবং আগামী দিনের জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা জোরালো হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টিও দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বহুদিন ধরেই। ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, এমন কোনো সমস্যা নেই যার সমাধান অসম্ভব—কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বক্তব্য আশা জাগানিয়া হলেও, বাস্তবে সমাধানের পথ খুলতে দিল্লির পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের প্রসঙ্গ, যা নিয়ে দিল্লির আগ্রহও প্রকাশ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই সফর বাস্তবায়িত হলে তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দুই দেশের সম্পর্কে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন সফরে আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে তিস্তা ও গঙ্গার পানি বণ্টন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ, দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, রেল-সড়ক যোগাযোগ, পারস্পরিক বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে সাজাতে দিল্লি এখন কেন এতটা তৎপর হয়ে উঠেছে। এর জবাব খুঁজতে হলে তাকাতে হবে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, শিল্পাঞ্চল ও যোগাযোগ খাতে চীন উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। একই সময়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রও তার কৌশলগত অবস্থান আরও মজবুত করার চেষ্টা করছে। এই আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মাঝে বাংলাদেশ চেষ্টা করছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে। বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লি চায় না বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো শূন্যতা তৈরি হোক, যা পূরণ করতে পারে অন্য কোনো শক্তিধর রাষ্ট্র।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এই সমীকরণে সমান গুরুত্ব বহন করে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি বড় রপ্তানি বাজার, আবার ভারতও বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে বিবেচিত। সীমান্ত বাণিজ্য, বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানি, নৌপথ ও রেলপথে যোগাযোগ, আঞ্চলিক ট্রানজিট সুবিধা এবং শিল্প খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা—এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। এমন অবস্থায় রাজনৈতিক দূরত্ব দীর্ঘায়িত হলে তা অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় সফল কূটনীতি নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকাঠামোর ওপর, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ওপর নয়। এই উপলব্ধি থেকেই দিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিচ্ছে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশেরও উচিত জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এমন একটি সুষম পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা, যেখানে প্রতিবেশীর সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক অটুট থাকবে, আবার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সার্বভৌম সক্ষমতাও ক্ষুণ্ন হবে না।
শেষ কথা হলো, ভারতের সাম্প্রতিক অবস্থান পরিবর্তনকে কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে দেখলে পুরো চিত্র স্পষ্ট হবে না। এর নেপথ্যে কাজ করছে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল শক্তি ভারসাম্য, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা প্রশ্ন, আঞ্চলিক বাণিজ্য বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সংযোগের বাস্তবতা। বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, কেননা সমতা, পারস্পরিক সম্মান ও বাস্তবসম্মত কূটনীতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কই দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর হতে পারে।
ইতিহাস বারবার একটি শিক্ষাই দিয়ে গেছে—ব্যক্তি আসে, ব্যক্তি চলে যায়, সরকার বদলায়, কিন্তু রাষ্ট্রের স্বার্থ থেকে যায় অপরিবর্তিত। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক যদি ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বাইরে গিয়ে সত্যিকারের রাষ্ট্রকেন্দ্রিক, পারস্পরিক মর্যাদাপূর্ণ ও জনমুখী অংশীদারত্বে রূপ নিতে পারে, তবেই তা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও শান্তির পথে সবচেয়ে ইতিবাচক বার্তা বহন করবে।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

মানুষের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণে প্রকল্প নেওয়ার নির্দেশ মির্জা ফখরুলের

২৯ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

নতুন মোড়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক

আপডেট সময় ০৭:১৫:২৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬

পানি বণ্টনের প্রশ্নে জলবিজ্ঞান, পরিবেশগত বাস্তবতা এবং আগামী দিনের জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা জোরালো হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টিও দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বহুদিন ধরেই। ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, এমন কোনো সমস্যা নেই যার সমাধান অসম্ভব—কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বক্তব্য আশা জাগানিয়া হলেও, বাস্তবে সমাধানের পথ খুলতে দিল্লির পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের প্রসঙ্গ, যা নিয়ে দিল্লির আগ্রহও প্রকাশ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই সফর বাস্তবায়িত হলে তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দুই দেশের সম্পর্কে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন সফরে আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে তিস্তা ও গঙ্গার পানি বণ্টন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ, দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, রেল-সড়ক যোগাযোগ, পারস্পরিক বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে সাজাতে দিল্লি এখন কেন এতটা তৎপর হয়ে উঠেছে। এর জবাব খুঁজতে হলে তাকাতে হবে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, শিল্পাঞ্চল ও যোগাযোগ খাতে চীন উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। একই সময়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রও তার কৌশলগত অবস্থান আরও মজবুত করার চেষ্টা করছে। এই আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মাঝে বাংলাদেশ চেষ্টা করছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে। বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লি চায় না বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো শূন্যতা তৈরি হোক, যা পূরণ করতে পারে অন্য কোনো শক্তিধর রাষ্ট্র।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এই সমীকরণে সমান গুরুত্ব বহন করে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি বড় রপ্তানি বাজার, আবার ভারতও বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে বিবেচিত। সীমান্ত বাণিজ্য, বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানি, নৌপথ ও রেলপথে যোগাযোগ, আঞ্চলিক ট্রানজিট সুবিধা এবং শিল্প খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা—এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। এমন অবস্থায় রাজনৈতিক দূরত্ব দীর্ঘায়িত হলে তা অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় সফল কূটনীতি নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকাঠামোর ওপর, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ওপর নয়। এই উপলব্ধি থেকেই দিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিচ্ছে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশেরও উচিত জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এমন একটি সুষম পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা, যেখানে প্রতিবেশীর সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক অটুট থাকবে, আবার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সার্বভৌম সক্ষমতাও ক্ষুণ্ন হবে না।
শেষ কথা হলো, ভারতের সাম্প্রতিক অবস্থান পরিবর্তনকে কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে দেখলে পুরো চিত্র স্পষ্ট হবে না। এর নেপথ্যে কাজ করছে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল শক্তি ভারসাম্য, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা প্রশ্ন, আঞ্চলিক বাণিজ্য বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সংযোগের বাস্তবতা। বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, কেননা সমতা, পারস্পরিক সম্মান ও বাস্তবসম্মত কূটনীতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কই দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর হতে পারে।
ইতিহাস বারবার একটি শিক্ষাই দিয়ে গেছে—ব্যক্তি আসে, ব্যক্তি চলে যায়, সরকার বদলায়, কিন্তু রাষ্ট্রের স্বার্থ থেকে যায় অপরিবর্তিত। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক যদি ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বাইরে গিয়ে সত্যিকারের রাষ্ট্রকেন্দ্রিক, পারস্পরিক মর্যাদাপূর্ণ ও জনমুখী অংশীদারত্বে রূপ নিতে পারে, তবেই তা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও শান্তির পথে সবচেয়ে ইতিবাচক বার্তা বহন করবে।

Share this news as a Photo Card