পঞ্চগড় সদর উপজেলার একটি চা বাগানের আংশিক জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্থানীয়দের বিরোধ এবার নতুন মোড় নিয়েছে। এই বিরোধের জের ধরে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে বাগানের জমি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন চা বাগান কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, স্থানীয় অন্তত পঞ্চাশ জন ব্যক্তি বাগানে প্রবেশ করে শ্রমিকদের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেছেন এবং কাজে বাধা সৃষ্টি করেছেন।
শনিবার (২ আগস্ট) দুপুরে উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের পাহাড়বাড়ি এলাকার একটি চা এস্টেটে এই ঘটনা ঘটে। খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও চিত্র হাতে এসেছে, যেখানে দেখা গেছে বাগানে কর্মরত শ্রমিকদের মাঝে হঠাৎ একদল লোক প্রবেশ করেন। তাদের কারো হাতে দেখা যায় লাঠি, কারো হাতে কুড়াল। বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে এক ব্যক্তিকে কুড়াল উঁচিয়ে এক চা শ্রমিকের প্রতি মারমুখী আচরণ করতে দেখা যায় ভিডিওতে।
বাগান কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় মসজিদ কমিটির সদস্যসহ স্থানীয় কিছু মানুষ বাগানের জমির দাবি তুলে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার জিন্নাতপাড়া গ্রামের কয়েকজনের নেতৃত্বে অন্তত পঞ্চাশজন লাঠি-সোঁটা ও কুড়াল নিয়ে অবৈধভাবে বাগানে প্রবেশ করেন এবং কর্মরত শ্রমিকদের কাজে বাধা দেন। এমনকি শ্রমিকদের হাত থেকে বাগান থেকে তোলা কাঁচা চা পাতাও কেড়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। প্রতিবাদ করলে শ্রমিকদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন তারা এবং মারমুখী হয়ে হুমকি দেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পার্শ্ববর্তী জিন্নাতপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, বাগানের ভেতরে উত্তর জিন্নাতপাড়া জামে মসজিদের জমি রয়েছে। এই বিরোধ মীমাংসার জন্য একাধিকবার শালিস-বৈঠক বসলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধানে পৌঁছানো যায়নি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চা এস্টেটের ব্যবস্থাপক সোহেল রানা বলেন, জিন্নাতপাড়া গ্রামের লোকজন দাবি করছেন এখানে মসজিদের জমি রয়েছে, কিন্তু একাধিকবার শালিস বসলেও তারা কখনো এর সপক্ষে কোনো বৈধ কাগজপত্র উপস্থাপন করতে পারেননি। সর্বশেষ থানায় বৈঠক বসেও তারা নিজেদের অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, বিরোধপূর্ণ এই জমি তাদের প্রতিষ্ঠান ক্রয়সূত্রে মালিক এবং আর.এস রেকর্ডসহ প্রতিষ্ঠানের নামে খতিয়ানভুক্ত। প্রতি বছর নিয়মিতভাবে এই জমির খাজনাও পরিশোধ করা হয়ে থাকে। এছাড়া তাদের দখলে থাকা চা বাগানটি চা বোর্ডের অধীনে নিবন্ধিত বলেও জানান তিনি। কারও কোনো অভিযোগ থাকলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন জিন্নাতপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আলম। তিনি বলেন, সর্বশেষ থানায় বৈঠক বসলেও কোনো সুরাহা হয়নি। এরপর আবার বসার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে শর্ত ছিল, বিষয়টির সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত বাগানের বিরোধপূর্ণ অংশের চা পাতা তোলা বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু বাগান কর্তৃপক্ষ সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি বলে অভিযোগ তার। এ কারণেই ক্ষুব্ধ হয়ে গ্রামবাসী গিয়ে বাধা দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
ঘটনার বিষয়ে পঞ্চগড় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোখলেসুর রহমান জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ উভয়পক্ষকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত না করার জন্য পরামর্শ দেয়।
স্থানীয়ভাবে এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। চা বাগান-সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে জমি নিয়ে এ ধরনের বিরোধ নতুন কিছু নয়, তবে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সরাসরি বাগানে ঢুকে শ্রমিকদের কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। এলাকাবাসীর অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনিকভাবে দ্রুত এই বিরোধের একটি স্থায়ী সমাধান না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
এ ঘটনার পর থেকে বাগান এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। শ্রমিকরা আতঙ্কের মধ্যে থাকলেও কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি বলে জানা গেছে। স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 























