শিরোনাম :
অর্থবছরের শুরুতেই বাড়তি প্রবাসী আয়, ১৭ দিনে রেমিট্যান্স ১৮৮ কোটি ডলার কেন অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তন করলো সরকার, সুবিধা কী ? স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সিইসির সঙ্গে আইজিপির জরুরি বৈঠক মহাসড়কে কোনো ধরনের থ্রি হুইলার চলতে দেওয়া হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয় বাড়ল ৯৯৯ কোটি টাকা সৎ-দক্ষ কর্মকর্তাদের সুযোগ দিতে চায় সরকার: প্রধানমন্ত্রী বিয়ের গুঞ্জন উড়িয়ে মুখ খুললেন পূজা চেরী ব্যাংকের মোট ঋণের অন্তত ৪ শতাংশ দিতে হবে কৃষি খাতে মানবতাবিরোধী অপরাধ: ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির মামলার রায় ঢাকায় নারী চালিত গোলাপি ‘মহিলা বাস’ নামছে মঙ্গলবার

কেন অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তন করলো সরকার, সুবিধা কী ?

দীর্ঘদিনের চেনা কাঠামো ভেঙে বাংলাদেশ এবার একেবারে নতুন পথে হাঁটছে। জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত বিস্তৃত পুরোনো অর্থবছরের বদলে সরকার ঠিক করেছে, নতুন অর্থবছর শুরু হবে ১ এপ্রিল থেকে, শেষ হবে পরের বছরের ৩১ মার্চে। মাঝখানের সময়টুকু, অর্থাৎ ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে রূপান্তরের কাল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। মাত্র নয় মাসের এই অর্থবছর পার হওয়ার পরই ২০২৮-২৯ সাল থেকে নতুন সময়সূচি পুরোপুরি চালু হয়ে যাবে।

শুনতে এটি নিছক তারিখের হেরফের মনে হলেও বাস্তবে এর ছায়া পড়বে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে। বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন, কর ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি হিসাবরক্ষণ— সবকিছুকেই নতুন করে সাজাতে হবে নতুন সময়সূচির সঙ্গে মিলিয়ে। এমনকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আর করদাতাদের হিসাব-নিকাশও এই পরিবর্তনের আওতার বাইরে থাকছে না।

তবে এই বিশাল রদবদলের পেছনে যে কারণটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, সেটি প্রশাসনিক সুবিধার চেয়েও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত— বিশেষত বর্ষাকালের সঙ্গে সরকারি উন্নয়নকাজের সময়সূচির দীর্ঘদিনের বেমানান সম্পর্ক ঘোচানো।

অর্থবছর বলতে আসলে কী বোঝায়

সরকারের আর্থিক হিসাব-নিকাশের জন্য নির্দিষ্ট করা বারো মাসের একটি সময়কালকেই বলা হয় অর্থবছর। এই সময়সীমার ভিত্তিতেই ঠিক হয়, কত টাকা রাজস্ব হিসেবে আদায় হবে, কোথায় কত বরাদ্দ যাবে, আর কোন প্রকল্পে কত অর্থ খরচ হবে। দেশের বাজেট, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, সরকারি আয়-ব্যয়, ঋণ ও দায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হিসাব— অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর প্রায় সবই দাঁড়িয়ে আছে অর্থবছরের কাঠামোর উপর।

এত বছর ধরে বাংলাদেশে অর্থবছর মানেই ছিল জুলাই থেকে জুন— ১ জুলাই শুরু হয়ে ৩০ জুনে শেষ। এবার সেই দীর্ঘদিনের কাঠামো ভেঙে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে।

কেন প্রয়োজন হলো এই পরিবর্তনের

সরকারের যুক্তির মূল সুর একটাই— উন্নয়নকাজের বাস্তবতার সঙ্গে দেশের মৌসুমি চরিত্রকে মিলিয়ে নেওয়া। বাংলাদেশে বর্ষা সাধারণত জুন মাস থেকে শুরু হয়ে বেশ কয়েক মাস ধরে চলে। এই সময়ে টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন আর কাদাপানির কারণে রাস্তা, সেতু, কালভার্ট, ভবন, ড্রেন কিংবা বাঁধ নির্মাণের মতো অবকাঠামোগত কাজ প্রায় থমকে যায়।

সমস্যাটা হলো, বর্তমান কাঠামোয় ঠিক এই সময়টাই, অর্থাৎ এপ্রিল, মে ও জুন— অর্থবছরের শেষ তিন মাস, যখন প্রকল্পের অর্থ খরচ করার তাগিদ সবচেয়ে বেশি থাকে। জুন মাস এলেই তাই বহু প্রকল্পে কাজ দ্রুত গুটিয়ে ফেলার চাপ তৈরি হয়। একদিকে প্রকৃতির বাধা, অন্যদিকে অর্থবছর শেষ করার প্রশাসনিক তাগাদা— এই দুইয়ের ফাঁদে পড়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে তৈরি হয় অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো। সরকারের ধারণা, অর্থবছর এপ্রিল থেকে শুরু হলে এই চিত্রে বড় বদল আসা সম্ভব।

‘জুন রাশ’ ঠেকানোর সুযোগ

বাংলাদেশের সরকারি ব্যয়ে বহু বছরের একটি পরিচিত প্রবণতা হলো, অর্থবছরের একেবারে শেষে এসে ব্যয় হঠাৎ লাফিয়ে বাড়া। বছরের শুরুর দিকে কাজ চলে ধীরগতিতে, কিন্তু শেষের দিকে অর্থ খরচের গতি হুট করে বেড়ে যায়। ফলে জুন মাসে কাজ শেষ করার চাপ, দ্রুত দরপত্র, তড়িঘড়ি নির্মাণ আর তাড়াহুড়োয় বিল পরিশোধের প্রবণতা দেখা যায় নিয়মিতই। এতে একদিকে যেমন কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তেমনি বরাদ্দ পুরোপুরি খরচ করতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের ঝুঁকিও বাড়ে। অর্থনীতির আলোচনায় এই ধারাকে বলা হয় ‘জুন রাশ’।

সাম্প্রতিক এক অর্থবছরের হিসাব এই প্রবণতা স্পষ্ট করে তোলে (এই পরিসংখ্যান মূল সরকারি নথি থেকে যাচাই করে নেওয়া ভালো)। একটি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট প্রায় এক লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছিল বলে জানা যায়, যার মধ্যে শুধু জুন মাসেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা— অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ২৮ শতাংশেরও বেশি। বারো মাসের একটি অর্থবছরে এক মাসেই যদি প্রায় এক-চতুর্থাংশ উন্নয়ন ব্যয় সম্পন্ন হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক— বছরের বাকি সময়টায় কাজের গতি এত কম থাকে কেন। অর্থবছর বদলের পেছনে এই শেষ মুহূর্তের চাপ কমানোর লক্ষ্যও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

এপ্রিল-মার্চে সুবিধা ঠিক কোথায়

নতুন কাঠামোয় অর্থবছরের প্রথম তিন মাস হবে এপ্রিল, মে ও জুন। এই সময়ে অনেক নির্মাণ প্রকল্প শুষ্ক মৌসুমের শেষ ভাগের সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে। এরপর জুলাই-আগস্টের বর্ষা এলেও অর্থবছর তখন সবে শুরুর পর্যায়ে থাকবে বলে কাজ শেষ করার তাড়া থাকবে না। আর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত তুলনামূলক শুষ্ক সময়টিতে অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের একটা বড় অংশ পড়ায় রাস্তা, সেতু, ভবন বা বাঁধের মতো অবকাঠামো নির্মাণের জন্য অপেক্ষাকৃত অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় সরকার বর্ষা এড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘ শুষ্ক সময় ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

শুধু সময় বদলালেই কি সব সমস্যার সমাধান

এখানেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি। অর্থবছর বদলে গেলেই বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের সব জট খুলে যাবে, এমন ভাবার কারণ নেই। প্রকল্প বিলম্বের পেছনে শুধু বর্ষা দায়ী নয়— জমি অধিগ্রহণে দেরি, নকশায় পরিবর্তন, দরপত্র প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, প্রকল্প পরিচালনায় দুর্বলতা, ঠিকাদারের সক্ষমতার ঘাটতি, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা আর জবাবদিহির অভাবও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। তাই নতুন অর্থবছরকে সত্যিকার অর্থে ফলপ্রসূ করতে হলে শুধু ক্যালেন্ডার বদলালেই চলবে না, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায়ও দরকার হবে বাস্তব সংস্কার। এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর একটি সুযোগ তৈরি করে দেবে বটে, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো নির্ভর করবে দক্ষতার উপর।

সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় কী কী বদলাবে

নতুন অর্থবছর চালু হলে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের গোটা চক্রকেই নতুন সময়সূচির সঙ্গে মেলাতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা, ব্যয় পরিকল্পনা, ঋণ ব্যবস্থাপনা, সরকারি হিসাব বন্ধকরণ, আর্থিক প্রতিবেদন— সবকিছুর সময়সূচি নতুন করে সাজাতে হবে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি ও সফটওয়্যারেও আনতে হবে পরিবর্তন, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক তথ্য সংগ্রহ ও পরিসংখ্যান প্রকাশের সময়সূচিও নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। এটি নিঃসন্দেহে বিশাল প্রশাসনিক কাজ। তবে সরকার ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে নয় মাসের রূপান্তরকাল হিসেবে রাখায় প্রস্তুতির জন্য কিছুটা সময় হাতে থাকছে।

বেসরকারি খাতেও পড়বে ছায়া

এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সরকারি কাঠামোর মধ্যেই আটকে থাকবে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন সময়সূচির সঙ্গে তাদের হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে নিতে হবে। বিশেষত বড় প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি এবং যেসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন পুরোপুরি সফটওয়্যারনির্ভর, তাদের হিসাব ব্যবস্থায় বদল আনতে হবে। আয়-ব্যয়ের হিসাব, আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, কর-সংক্রান্ত হিসাব এবং বাজেট পরিকল্পনার সময়সূচিতেও পরিবর্তন আসতে পারে।

স্বাভাবিকভাবেই শুরুতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ঘাড়ে বাড়তি ব্যয় আর প্রশাসনিক চাপ চেপে বসবে। সফটওয়্যার হালনাগাদ, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, হিসাব পদ্ধতির নতুন করে সাজানো— এসবের প্রয়োজন হতে পারে। তবে এটি মূলত এককালীন রূপান্তর ব্যয় হিসেবেই ধরে নেওয়া যায়। দীর্ঘমেয়াদে যদি নতুন সময়সূচি সরকারি ও বেসরকারি হিসাব ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত করে তোলে, তাহলে তার সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব

সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় অর্থবছর পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব খুব বেশি পড়ার কথা নয়। তবে করদাতাদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। আয়কর হিসাব, রিটার্ন দাখিলের সময়, কর রেয়াত পাওয়ার সময়কাল— এসব কিছুকে নতুন অর্থবছরের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।

বর্তমানে যে সময়সীমা ধরে আয় ও করের হিসাব করা হয়, নতুন কাঠামো কার্যকর হলে সেই হিসাবপদ্ধতিও বদলে যাবে। ফলে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদের পর্যন্ত আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণের পদ্ধতিতে বদল আনতে হবে। এ কারণে পরিবর্তনের আগে সরকারের উচিত হবে ব্যাপকভাবে প্রচার আর নির্দেশনা দেওয়া, যাতে করদাতা ও ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পান।

আন্তর্জাতিক হিসাবের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রশ্ন

অর্থবছর বদলের আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক তথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের হিসাবের সামঞ্জস্য বাড়ানো। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ জানুয়ারি-ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছর অনুসরণ করলেও ভারত ও যুক্তরাজ্যের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরই মেনে চলে। বাংলাদেশের এতদিনকার জুলাই-জুন কাঠামোর কারণে আন্তর্জাতিক তথ্যের সঙ্গে তুলনা করতে গেলে বাড়তি সমন্বয়ের দরকার পড়ত। নতুন এপ্রিল-মার্চ কাঠামো দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে তথ্য তুলনার কাজটি খানিকটা সহজ করে দিতে পারে। বিশেষত ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হওয়ায় এই সামঞ্জস্য অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও আঞ্চলিক তুলনায় বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে।

ইতিহাসেও এপ্রিল-মার্চ একেবারে অচেনা নয়

আসলে এপ্রিল-মার্চ কাঠামো বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কোনো ধারণা নয়। ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে রাজস্ব সংগ্রহের হিসাবের সঙ্গে এপ্রিলভিত্তিক সময়ের সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়— ব্রিটিশ শাসনামলেও এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরের চল ছিল। দেশভাগের পর পাকিস্তান জুলাই-জুন অর্থবছর গ্রহণ করে, আর স্বাধীনতার পর বাংলাদেশও সেই ধারা বজায় রাখে। অন্যদিকে ভারত এখনো এপ্রিল থেকে মার্চ পর্যন্ত অর্থবছর অনুসরণ করে চলেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ যে নতুন সময়সূচির দিকে এগোচ্ছে, সেটি আন্তর্জাতিকভাবে বহুল পরীক্ষিত একটি কাঠামো।

পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুফল

সবকিছু মিলিয়ে দেখলে, এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে বাস্তব উন্নয়নকাজের সময়ের সমন্বয়। বর্তমান ব্যবস্থায় অর্থবছরের শেষদিকে বর্ষার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে, নতুন ব্যবস্থায় সেই চাপ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব।

এর ফলে একাধিক ইতিবাচক দিক তৈরি হতে পারে। প্রথমত, উন্নয়ন প্রকল্পে তড়িঘড়ির প্রবণতা কমতে পারে। দ্বিতীয়ত, বর্ষাকালে নির্মাণকাজের কারণে কাজের মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমবে। তৃতীয়ত, অর্থবছরের শেষ মাসে বরাদ্দ খরচ করার তাগিদজনিত অস্বাভাবিক ব্যয়ের চাপ কমতে পারে। চতুর্থত, প্রকল্পের সময় ও অর্থ ব্যবস্থাপনা আরও পরিকল্পিত হয়ে উঠতে পারে। পঞ্চমত, সরকারি ব্যয়ের গতি বছরজুড়ে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ থাকতে পারে। ষষ্ঠত, এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর অনুসরণকারী ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক তথ্য ও নীতিগত বিশ্লেষণে খানিকটা সমন্বয় তৈরি হবে। আর সপ্তমত, অর্থবছর ও বাংলাদেশের মৌসুমি বাস্তবতার মধ্যে সামঞ্জস্য বাড়বে।

তবে ঝুঁকিও কম নয়

এত বড় একটি পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রূপান্তর ব্যবস্থাপনা নিজেই। সরকারি হিসাব ব্যবস্থা, বাজেট পদ্ধতি, কর প্রশাসন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, সরকারি আর্থিক প্রতিবেদন, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা— সবকিছু একসঙ্গে নতুন কাঠামোয় নিয়ে আসতে হবে। এখানে সামান্যতম সমন্বয়হীনতাও বড় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।

বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ২০২৭-২৮ সালের নয় মাসের রূপান্তরকালীন অর্থবছরটি। এই সময়কে শুধু ক্যালেন্ডার বদলের একটি পর্যায় হিসেবে না দেখে বরং নতুন আর্থিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো যাচাই করে দেখার একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা দরকার।

শুধু অর্থবছর বদল, নাকি অর্থ ব্যবস্থাপনার সংস্কার

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, এই পরিবর্তনকে নিছক ‘অর্থবছরের তারিখ বদল’ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে পারে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের কিছু দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার একটি সুযোগ, কেননা অর্থবছর আসলে সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার একটি কাঠামো মাত্র। কাঠামো বদলালে তার সঙ্গে কাজের সংস্কৃতিও বদলাতে হবে।

যদি এপ্রিল-মার্চে যাওয়ার পরও প্রকল্পগুলো বছরের প্রথমার্ধে পড়ে থাকে আর মার্চ মাসে এসে তড়িঘড়ি ব্যয় শুরু হয়, তাহলে ‘জুন রাশ’-এর জায়গা নেবে ‘মার্চ রাশ’। অর্থাৎ মূল সমস্যাটা রয়েই যাবে, শুধু মাসের নাম বদলাবে। তাই নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে বছরের একেবারে শুরু থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থ ছাড়, দরপত্র, জমি অধিগ্রহণ ও ক্রয়প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করে দেওয়া।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং তথা সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের মূল্যায়ন অনুযায়ী, অর্থবছর জুলাই-জুন থেকে এপ্রিল-মার্চে বদলের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য সম্ভাবনাময় একটি উদ্যোগ। বর্ষাকালের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচির অসামঞ্জস্য কমিয়ে এটি প্রকল্পের গতি ও মান বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে তাঁর সতর্কবার্তাও স্পষ্ট— শুধু সময়সূচি বদলালেই উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব কিংবা দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতার মতো পুরোনো সমস্যা আপনাআপনি দূর হবে না। এজন্য বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, সরকারি হিসাব ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, অর্থবছর পরিবর্তন অনেকটা একটি দরজা খুলে দেওয়ার মতো ঘটনা— সেই দরজা দিয়ে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যেতে হলে প্রশাসনিক দক্ষতা, জবাবদিহি ও তদারকি নিশ্চিত করতেই হবে।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

অর্থবছরের শুরুতেই বাড়তি প্রবাসী আয়, ১৭ দিনে রেমিট্যান্স ১৮৮ কোটি ডলার

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ঢাকায় নারী চালিত গোলাপি ‘মহিলা বাস’ নামছে মঙ্গলবার

১৭ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

কেন অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তন করলো সরকার, সুবিধা কী ?

আপডেট সময় ০৫:৫৭:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

দীর্ঘদিনের চেনা কাঠামো ভেঙে বাংলাদেশ এবার একেবারে নতুন পথে হাঁটছে। জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত বিস্তৃত পুরোনো অর্থবছরের বদলে সরকার ঠিক করেছে, নতুন অর্থবছর শুরু হবে ১ এপ্রিল থেকে, শেষ হবে পরের বছরের ৩১ মার্চে। মাঝখানের সময়টুকু, অর্থাৎ ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে রূপান্তরের কাল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। মাত্র নয় মাসের এই অর্থবছর পার হওয়ার পরই ২০২৮-২৯ সাল থেকে নতুন সময়সূচি পুরোপুরি চালু হয়ে যাবে।

শুনতে এটি নিছক তারিখের হেরফের মনে হলেও বাস্তবে এর ছায়া পড়বে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে। বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন, কর ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি হিসাবরক্ষণ— সবকিছুকেই নতুন করে সাজাতে হবে নতুন সময়সূচির সঙ্গে মিলিয়ে। এমনকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আর করদাতাদের হিসাব-নিকাশও এই পরিবর্তনের আওতার বাইরে থাকছে না।

তবে এই বিশাল রদবদলের পেছনে যে কারণটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, সেটি প্রশাসনিক সুবিধার চেয়েও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত— বিশেষত বর্ষাকালের সঙ্গে সরকারি উন্নয়নকাজের সময়সূচির দীর্ঘদিনের বেমানান সম্পর্ক ঘোচানো।

অর্থবছর বলতে আসলে কী বোঝায়

সরকারের আর্থিক হিসাব-নিকাশের জন্য নির্দিষ্ট করা বারো মাসের একটি সময়কালকেই বলা হয় অর্থবছর। এই সময়সীমার ভিত্তিতেই ঠিক হয়, কত টাকা রাজস্ব হিসেবে আদায় হবে, কোথায় কত বরাদ্দ যাবে, আর কোন প্রকল্পে কত অর্থ খরচ হবে। দেশের বাজেট, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, সরকারি আয়-ব্যয়, ঋণ ও দায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হিসাব— অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর প্রায় সবই দাঁড়িয়ে আছে অর্থবছরের কাঠামোর উপর।

এত বছর ধরে বাংলাদেশে অর্থবছর মানেই ছিল জুলাই থেকে জুন— ১ জুলাই শুরু হয়ে ৩০ জুনে শেষ। এবার সেই দীর্ঘদিনের কাঠামো ভেঙে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে।

কেন প্রয়োজন হলো এই পরিবর্তনের

সরকারের যুক্তির মূল সুর একটাই— উন্নয়নকাজের বাস্তবতার সঙ্গে দেশের মৌসুমি চরিত্রকে মিলিয়ে নেওয়া। বাংলাদেশে বর্ষা সাধারণত জুন মাস থেকে শুরু হয়ে বেশ কয়েক মাস ধরে চলে। এই সময়ে টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন আর কাদাপানির কারণে রাস্তা, সেতু, কালভার্ট, ভবন, ড্রেন কিংবা বাঁধ নির্মাণের মতো অবকাঠামোগত কাজ প্রায় থমকে যায়।

সমস্যাটা হলো, বর্তমান কাঠামোয় ঠিক এই সময়টাই, অর্থাৎ এপ্রিল, মে ও জুন— অর্থবছরের শেষ তিন মাস, যখন প্রকল্পের অর্থ খরচ করার তাগিদ সবচেয়ে বেশি থাকে। জুন মাস এলেই তাই বহু প্রকল্পে কাজ দ্রুত গুটিয়ে ফেলার চাপ তৈরি হয়। একদিকে প্রকৃতির বাধা, অন্যদিকে অর্থবছর শেষ করার প্রশাসনিক তাগাদা— এই দুইয়ের ফাঁদে পড়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে তৈরি হয় অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো। সরকারের ধারণা, অর্থবছর এপ্রিল থেকে শুরু হলে এই চিত্রে বড় বদল আসা সম্ভব।

‘জুন রাশ’ ঠেকানোর সুযোগ

বাংলাদেশের সরকারি ব্যয়ে বহু বছরের একটি পরিচিত প্রবণতা হলো, অর্থবছরের একেবারে শেষে এসে ব্যয় হঠাৎ লাফিয়ে বাড়া। বছরের শুরুর দিকে কাজ চলে ধীরগতিতে, কিন্তু শেষের দিকে অর্থ খরচের গতি হুট করে বেড়ে যায়। ফলে জুন মাসে কাজ শেষ করার চাপ, দ্রুত দরপত্র, তড়িঘড়ি নির্মাণ আর তাড়াহুড়োয় বিল পরিশোধের প্রবণতা দেখা যায় নিয়মিতই। এতে একদিকে যেমন কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তেমনি বরাদ্দ পুরোপুরি খরচ করতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের ঝুঁকিও বাড়ে। অর্থনীতির আলোচনায় এই ধারাকে বলা হয় ‘জুন রাশ’।

সাম্প্রতিক এক অর্থবছরের হিসাব এই প্রবণতা স্পষ্ট করে তোলে (এই পরিসংখ্যান মূল সরকারি নথি থেকে যাচাই করে নেওয়া ভালো)। একটি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট প্রায় এক লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছিল বলে জানা যায়, যার মধ্যে শুধু জুন মাসেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা— অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ২৮ শতাংশেরও বেশি। বারো মাসের একটি অর্থবছরে এক মাসেই যদি প্রায় এক-চতুর্থাংশ উন্নয়ন ব্যয় সম্পন্ন হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক— বছরের বাকি সময়টায় কাজের গতি এত কম থাকে কেন। অর্থবছর বদলের পেছনে এই শেষ মুহূর্তের চাপ কমানোর লক্ষ্যও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

এপ্রিল-মার্চে সুবিধা ঠিক কোথায়

নতুন কাঠামোয় অর্থবছরের প্রথম তিন মাস হবে এপ্রিল, মে ও জুন। এই সময়ে অনেক নির্মাণ প্রকল্প শুষ্ক মৌসুমের শেষ ভাগের সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে। এরপর জুলাই-আগস্টের বর্ষা এলেও অর্থবছর তখন সবে শুরুর পর্যায়ে থাকবে বলে কাজ শেষ করার তাড়া থাকবে না। আর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত তুলনামূলক শুষ্ক সময়টিতে অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের একটা বড় অংশ পড়ায় রাস্তা, সেতু, ভবন বা বাঁধের মতো অবকাঠামো নির্মাণের জন্য অপেক্ষাকৃত অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় সরকার বর্ষা এড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘ শুষ্ক সময় ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

শুধু সময় বদলালেই কি সব সমস্যার সমাধান

এখানেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি। অর্থবছর বদলে গেলেই বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের সব জট খুলে যাবে, এমন ভাবার কারণ নেই। প্রকল্প বিলম্বের পেছনে শুধু বর্ষা দায়ী নয়— জমি অধিগ্রহণে দেরি, নকশায় পরিবর্তন, দরপত্র প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, প্রকল্প পরিচালনায় দুর্বলতা, ঠিকাদারের সক্ষমতার ঘাটতি, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা আর জবাবদিহির অভাবও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। তাই নতুন অর্থবছরকে সত্যিকার অর্থে ফলপ্রসূ করতে হলে শুধু ক্যালেন্ডার বদলালেই চলবে না, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায়ও দরকার হবে বাস্তব সংস্কার। এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর একটি সুযোগ তৈরি করে দেবে বটে, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো নির্ভর করবে দক্ষতার উপর।

সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় কী কী বদলাবে

নতুন অর্থবছর চালু হলে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের গোটা চক্রকেই নতুন সময়সূচির সঙ্গে মেলাতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা, ব্যয় পরিকল্পনা, ঋণ ব্যবস্থাপনা, সরকারি হিসাব বন্ধকরণ, আর্থিক প্রতিবেদন— সবকিছুর সময়সূচি নতুন করে সাজাতে হবে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি ও সফটওয়্যারেও আনতে হবে পরিবর্তন, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক তথ্য সংগ্রহ ও পরিসংখ্যান প্রকাশের সময়সূচিও নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। এটি নিঃসন্দেহে বিশাল প্রশাসনিক কাজ। তবে সরকার ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে নয় মাসের রূপান্তরকাল হিসেবে রাখায় প্রস্তুতির জন্য কিছুটা সময় হাতে থাকছে।

বেসরকারি খাতেও পড়বে ছায়া

এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সরকারি কাঠামোর মধ্যেই আটকে থাকবে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন সময়সূচির সঙ্গে তাদের হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে নিতে হবে। বিশেষত বড় প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি এবং যেসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন পুরোপুরি সফটওয়্যারনির্ভর, তাদের হিসাব ব্যবস্থায় বদল আনতে হবে। আয়-ব্যয়ের হিসাব, আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, কর-সংক্রান্ত হিসাব এবং বাজেট পরিকল্পনার সময়সূচিতেও পরিবর্তন আসতে পারে।

স্বাভাবিকভাবেই শুরুতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ঘাড়ে বাড়তি ব্যয় আর প্রশাসনিক চাপ চেপে বসবে। সফটওয়্যার হালনাগাদ, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, হিসাব পদ্ধতির নতুন করে সাজানো— এসবের প্রয়োজন হতে পারে। তবে এটি মূলত এককালীন রূপান্তর ব্যয় হিসেবেই ধরে নেওয়া যায়। দীর্ঘমেয়াদে যদি নতুন সময়সূচি সরকারি ও বেসরকারি হিসাব ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত করে তোলে, তাহলে তার সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব

সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় অর্থবছর পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব খুব বেশি পড়ার কথা নয়। তবে করদাতাদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। আয়কর হিসাব, রিটার্ন দাখিলের সময়, কর রেয়াত পাওয়ার সময়কাল— এসব কিছুকে নতুন অর্থবছরের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।

বর্তমানে যে সময়সীমা ধরে আয় ও করের হিসাব করা হয়, নতুন কাঠামো কার্যকর হলে সেই হিসাবপদ্ধতিও বদলে যাবে। ফলে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদের পর্যন্ত আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণের পদ্ধতিতে বদল আনতে হবে। এ কারণে পরিবর্তনের আগে সরকারের উচিত হবে ব্যাপকভাবে প্রচার আর নির্দেশনা দেওয়া, যাতে করদাতা ও ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পান।

আন্তর্জাতিক হিসাবের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রশ্ন

অর্থবছর বদলের আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক তথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের হিসাবের সামঞ্জস্য বাড়ানো। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ জানুয়ারি-ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছর অনুসরণ করলেও ভারত ও যুক্তরাজ্যের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরই মেনে চলে। বাংলাদেশের এতদিনকার জুলাই-জুন কাঠামোর কারণে আন্তর্জাতিক তথ্যের সঙ্গে তুলনা করতে গেলে বাড়তি সমন্বয়ের দরকার পড়ত। নতুন এপ্রিল-মার্চ কাঠামো দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে তথ্য তুলনার কাজটি খানিকটা সহজ করে দিতে পারে। বিশেষত ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হওয়ায় এই সামঞ্জস্য অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও আঞ্চলিক তুলনায় বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে।

ইতিহাসেও এপ্রিল-মার্চ একেবারে অচেনা নয়

আসলে এপ্রিল-মার্চ কাঠামো বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কোনো ধারণা নয়। ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে রাজস্ব সংগ্রহের হিসাবের সঙ্গে এপ্রিলভিত্তিক সময়ের সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়— ব্রিটিশ শাসনামলেও এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরের চল ছিল। দেশভাগের পর পাকিস্তান জুলাই-জুন অর্থবছর গ্রহণ করে, আর স্বাধীনতার পর বাংলাদেশও সেই ধারা বজায় রাখে। অন্যদিকে ভারত এখনো এপ্রিল থেকে মার্চ পর্যন্ত অর্থবছর অনুসরণ করে চলেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ যে নতুন সময়সূচির দিকে এগোচ্ছে, সেটি আন্তর্জাতিকভাবে বহুল পরীক্ষিত একটি কাঠামো।

পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুফল

সবকিছু মিলিয়ে দেখলে, এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে বাস্তব উন্নয়নকাজের সময়ের সমন্বয়। বর্তমান ব্যবস্থায় অর্থবছরের শেষদিকে বর্ষার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে, নতুন ব্যবস্থায় সেই চাপ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব।

এর ফলে একাধিক ইতিবাচক দিক তৈরি হতে পারে। প্রথমত, উন্নয়ন প্রকল্পে তড়িঘড়ির প্রবণতা কমতে পারে। দ্বিতীয়ত, বর্ষাকালে নির্মাণকাজের কারণে কাজের মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমবে। তৃতীয়ত, অর্থবছরের শেষ মাসে বরাদ্দ খরচ করার তাগিদজনিত অস্বাভাবিক ব্যয়ের চাপ কমতে পারে। চতুর্থত, প্রকল্পের সময় ও অর্থ ব্যবস্থাপনা আরও পরিকল্পিত হয়ে উঠতে পারে। পঞ্চমত, সরকারি ব্যয়ের গতি বছরজুড়ে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ থাকতে পারে। ষষ্ঠত, এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর অনুসরণকারী ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক তথ্য ও নীতিগত বিশ্লেষণে খানিকটা সমন্বয় তৈরি হবে। আর সপ্তমত, অর্থবছর ও বাংলাদেশের মৌসুমি বাস্তবতার মধ্যে সামঞ্জস্য বাড়বে।

তবে ঝুঁকিও কম নয়

এত বড় একটি পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রূপান্তর ব্যবস্থাপনা নিজেই। সরকারি হিসাব ব্যবস্থা, বাজেট পদ্ধতি, কর প্রশাসন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, সরকারি আর্থিক প্রতিবেদন, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা— সবকিছু একসঙ্গে নতুন কাঠামোয় নিয়ে আসতে হবে। এখানে সামান্যতম সমন্বয়হীনতাও বড় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।

বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ২০২৭-২৮ সালের নয় মাসের রূপান্তরকালীন অর্থবছরটি। এই সময়কে শুধু ক্যালেন্ডার বদলের একটি পর্যায় হিসেবে না দেখে বরং নতুন আর্থিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো যাচাই করে দেখার একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা দরকার।

শুধু অর্থবছর বদল, নাকি অর্থ ব্যবস্থাপনার সংস্কার

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, এই পরিবর্তনকে নিছক ‘অর্থবছরের তারিখ বদল’ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে পারে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের কিছু দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার একটি সুযোগ, কেননা অর্থবছর আসলে সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার একটি কাঠামো মাত্র। কাঠামো বদলালে তার সঙ্গে কাজের সংস্কৃতিও বদলাতে হবে।

যদি এপ্রিল-মার্চে যাওয়ার পরও প্রকল্পগুলো বছরের প্রথমার্ধে পড়ে থাকে আর মার্চ মাসে এসে তড়িঘড়ি ব্যয় শুরু হয়, তাহলে ‘জুন রাশ’-এর জায়গা নেবে ‘মার্চ রাশ’। অর্থাৎ মূল সমস্যাটা রয়েই যাবে, শুধু মাসের নাম বদলাবে। তাই নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে বছরের একেবারে শুরু থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থ ছাড়, দরপত্র, জমি অধিগ্রহণ ও ক্রয়প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করে দেওয়া।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং তথা সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের মূল্যায়ন অনুযায়ী, অর্থবছর জুলাই-জুন থেকে এপ্রিল-মার্চে বদলের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য সম্ভাবনাময় একটি উদ্যোগ। বর্ষাকালের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচির অসামঞ্জস্য কমিয়ে এটি প্রকল্পের গতি ও মান বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে তাঁর সতর্কবার্তাও স্পষ্ট— শুধু সময়সূচি বদলালেই উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব কিংবা দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতার মতো পুরোনো সমস্যা আপনাআপনি দূর হবে না। এজন্য বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, সরকারি হিসাব ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, অর্থবছর পরিবর্তন অনেকটা একটি দরজা খুলে দেওয়ার মতো ঘটনা— সেই দরজা দিয়ে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যেতে হলে প্রশাসনিক দক্ষতা, জবাবদিহি ও তদারকি নিশ্চিত করতেই হবে।

Share this news as a Photo Card