চেকের মামলায় পাওনা শোধ ও সমঝোতা হলে কারাদণ্ড নয়: হাইকোর্ট

চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত মামলায় গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় দায়ের হওয়া মামলায় যদি চেকে উল্লেখ করা পুরো টাকা পরিশোধ করা হয় এবং দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা সম্পন্ন হয়, তাহলে অভিযুক্তকে কারাগারে পাঠানো বা তার কারাদণ্ড বহাল রাখা যুক্তিসংগত নয়।
আদালত তার পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত মামলাগুলোর মূল লক্ষ্য কাউকে দণ্ড দেওয়া বা শাস্তির আওতায় আনা নয়। বরং এই ধরনের মামলার মূল উদ্দেশ্য হলো, পাওনাদার যেন তার প্রাপ্য অর্থ ফিরে পান, সেই নিশ্চয়তা দেওয়া। টাকা আদায় হয়ে গেলে এবং দুই পক্ষ নিজেদের মধ্যে বিরোধ মিটিয়ে ফেললে দণ্ড বহাল রাখার আর কোনো যৌক্তিকতা থাকে না বলে মনে করছেন আদালত।
একটি ক্রিমিনাল আপিলের শুনানি শেষে বিচারপতি মো. বশির উল্লাহর নেতৃত্বাধীন একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। মো. আবদুল হান্নান মাস্টার বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য শিরোনামের এই মামলায় গত ৬ সেপ্টেম্বর রায়টি দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার সময় আবেদনকারীর পক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তবে বিবাদী পক্ষ, অর্থাৎ ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের হয়ে আইনি লড়াই পরিচালনা করেন আইনজীবী মো. জিসান মাহমুদ, তার সহযোগী হিসেবে ছিলেন আইনজীবী তাসনুভা কায়সার। এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সিরাজুল করিম।
মামলার ঘটনাক্রম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি চেকের অর্থ ও ব্যাংকের অন্যান্য পাওনা সম্পূর্ণভাবে মিটিয়ে দিয়েছিলেন এবং এর মাধ্যমে উভয়পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা সম্পন্ন হয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আদালত তার এক বছরের কারাদণ্ড বাতিল করে দেন। পাশাপাশি, আপিল দায়েরের আগে নিম্ন আদালতে জমা দেওয়া ১৪ হাজার ১০০ টাকা ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের কাছে ফেরত দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে এই রায়ে।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, এই রায়টি চেক ডিজঅনার মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশে ব্যবসায়িক লেনদেনে চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়, আর এ নিয়ে প্রতি বছর অসংখ্য মামলা আদালতে জমা পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি পরবর্তীতে পাওনাদারের সঙ্গে বোঝাপড়া করে পুরো টাকা মিটিয়ে দেন, তারপরও ফৌজদারি প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং কারাদণ্ডের ঝুঁকি থেকে যায়। হাইকোর্টের এই রায় সেই বাস্তবতা পরিবর্তনের একটি দিকনির্দেশনা দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে, চেক ডিজঅনার আইনের মূল স্পিরিট হলো লেনদেনে আস্থা রক্ষা এবং পাওনাদারের আর্থিক ক্ষতি পূরণ নিশ্চিত করা। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা মূলত এই লক্ষ্য অর্জনের একটি মাধ্যম মাত্র, চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়। তাই টাকা ফেরত পাওয়ার পর এবং উভয়পক্ষের সম্মতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে গেলে দণ্ড কার্যকর রাখা ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে আদালতের এই পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়।
এই রায়ের ফলে ভবিষ্যতে অনুরূপ পরিস্থিতিতে থাকা ব্যক্তিরা আইনি সুরক্ষা পাওয়ার একটি পথ খুঁজে পেতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি পর্যায়ের ঋণগ্রহীতাদের জন্য এই ধরনের রায় স্বস্তির কারণ হতে পারে, যারা আর্থিক সংকটের কারণে সাময়িকভাবে চেক ডিজঅনারের মতো পরিস্থিতিতে পড়েন কিন্তু পরবর্তীতে দায় মিটিয়ে দেন।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ফ্যামিলি কার্ডের নামে টাকা নেওয়ায় এনসিপি নেত্রী গ্রেপ্তার

০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

চেকের মামলায় পাওনা শোধ ও সমঝোতা হলে কারাদণ্ড নয়: হাইকোর্ট

আপডেট সময় ১২:৫৬:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত মামলায় গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় দায়ের হওয়া মামলায় যদি চেকে উল্লেখ করা পুরো টাকা পরিশোধ করা হয় এবং দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা সম্পন্ন হয়, তাহলে অভিযুক্তকে কারাগারে পাঠানো বা তার কারাদণ্ড বহাল রাখা যুক্তিসংগত নয়।
আদালত তার পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত মামলাগুলোর মূল লক্ষ্য কাউকে দণ্ড দেওয়া বা শাস্তির আওতায় আনা নয়। বরং এই ধরনের মামলার মূল উদ্দেশ্য হলো, পাওনাদার যেন তার প্রাপ্য অর্থ ফিরে পান, সেই নিশ্চয়তা দেওয়া। টাকা আদায় হয়ে গেলে এবং দুই পক্ষ নিজেদের মধ্যে বিরোধ মিটিয়ে ফেললে দণ্ড বহাল রাখার আর কোনো যৌক্তিকতা থাকে না বলে মনে করছেন আদালত।
একটি ক্রিমিনাল আপিলের শুনানি শেষে বিচারপতি মো. বশির উল্লাহর নেতৃত্বাধীন একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। মো. আবদুল হান্নান মাস্টার বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য শিরোনামের এই মামলায় গত ৬ সেপ্টেম্বর রায়টি দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার সময় আবেদনকারীর পক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তবে বিবাদী পক্ষ, অর্থাৎ ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের হয়ে আইনি লড়াই পরিচালনা করেন আইনজীবী মো. জিসান মাহমুদ, তার সহযোগী হিসেবে ছিলেন আইনজীবী তাসনুভা কায়সার। এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সিরাজুল করিম।
মামলার ঘটনাক্রম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি চেকের অর্থ ও ব্যাংকের অন্যান্য পাওনা সম্পূর্ণভাবে মিটিয়ে দিয়েছিলেন এবং এর মাধ্যমে উভয়পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা সম্পন্ন হয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আদালত তার এক বছরের কারাদণ্ড বাতিল করে দেন। পাশাপাশি, আপিল দায়েরের আগে নিম্ন আদালতে জমা দেওয়া ১৪ হাজার ১০০ টাকা ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের কাছে ফেরত দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে এই রায়ে।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, এই রায়টি চেক ডিজঅনার মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশে ব্যবসায়িক লেনদেনে চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়, আর এ নিয়ে প্রতি বছর অসংখ্য মামলা আদালতে জমা পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি পরবর্তীতে পাওনাদারের সঙ্গে বোঝাপড়া করে পুরো টাকা মিটিয়ে দেন, তারপরও ফৌজদারি প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং কারাদণ্ডের ঝুঁকি থেকে যায়। হাইকোর্টের এই রায় সেই বাস্তবতা পরিবর্তনের একটি দিকনির্দেশনা দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে, চেক ডিজঅনার আইনের মূল স্পিরিট হলো লেনদেনে আস্থা রক্ষা এবং পাওনাদারের আর্থিক ক্ষতি পূরণ নিশ্চিত করা। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা মূলত এই লক্ষ্য অর্জনের একটি মাধ্যম মাত্র, চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়। তাই টাকা ফেরত পাওয়ার পর এবং উভয়পক্ষের সম্মতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে গেলে দণ্ড কার্যকর রাখা ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে আদালতের এই পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়।
এই রায়ের ফলে ভবিষ্যতে অনুরূপ পরিস্থিতিতে থাকা ব্যক্তিরা আইনি সুরক্ষা পাওয়ার একটি পথ খুঁজে পেতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি পর্যায়ের ঋণগ্রহীতাদের জন্য এই ধরনের রায় স্বস্তির কারণ হতে পারে, যারা আর্থিক সংকটের কারণে সাময়িকভাবে চেক ডিজঅনারের মতো পরিস্থিতিতে পড়েন কিন্তু পরবর্তীতে দায় মিটিয়ে দেন।

Share this news as a Photo Card