শিরোনাম :
সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ও বাস্তবতা ইরাকের ড্রোন হামলায় সৌদি পাইপলাইন বন্ধ, বাড়ছে তেলের দাম শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগবে না স্থানীয় নির্বাচনে: প্রতিমন্ত্রী স্ত্রীসহ ফারইস্ট লাইফের সাবেক চেয়ারম্যানের ৫৭ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক দলীয় প্রতীকবিহীন স্বচ্ছ নির্বাচনের অঙ্গীকার সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর বার্সেলোনায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত থাকছেন ‘মিশরের হালান্ড’ খ্যাত হামজা আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জ করা রিট খারিজ হাইকোর্টে আমিশা প্যাটেলের মুম্বাইয়ের বাড়িতে চুরি, গৃহকর্মী গ্রেফতার হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানের ৭ শর্ত, উত্তেজনা তুঙ্গে বিয়ে থেকে ফেরার পথে মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় ঝরল ৪ প্রাণ

ইরাকের ড্রোন হামলায় সৌদি পাইপলাইন বন্ধ, বাড়ছে তেলের দাম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ক্রমেই নতুন নতুন মাত্রা নিচ্ছে, আর তার সবশেষ ধাক্কা এসে লেগেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল সরবরাহ ব্যবস্থায়। ইরাক থেকে ছোড়া একটি ড্রোন হামলার জেরে সৌদি আরব তাদের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনটি বন্ধ করে দিয়েছে, এমন এক সময়ে যখন ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করছে। দুই দিক থেকে একযোগে চাপ তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে, আর আরব উপদ্বীপ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ইরাকের ভূখণ্ড থেকে ছোড়া একটি ড্রোনকে ঘিরে, যা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় গিয়ে আঘাত হানে। হামলার পরপরই সৌদি কর্তৃপক্ষ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। একই সময়ে ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকা থেকে তোলা স্যাটেলাইট ছবিতে পোড়া মাটি ও ধোঁয়ার চিহ্ন দেখা গেছে, যা হামলার তীব্রতা সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, এই হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং কিছু ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে, তবে সেই ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

ইরাক এ ঘটনার দায় পুরোপুরি অস্বীকার করেনি। বরং দেশটির কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে চালানো এই ড্রোন হামলাটি পরিচালিত হয়েছিল ইরানের সীমান্তবর্তী তাদেরই একটি প্রদেশ থেকে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। এক পৃথক বিবৃতিতে জানানো হয়, তদন্তে নিশ্চিত হওয়ার পরই ইরানের সীমান্তঘেঁষা মাইসান প্রদেশের সংশ্লিষ্ট অপারেশনস কমান্ডারকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কারণ প্রাথমিক তদন্তে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে হামলাটি ওই অঞ্চল থেকেই চালানো হয়েছিল। পাশাপাশি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তও শুরু হয়েছে বলে ইরাকি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

এই ঘটনা প্রথমবার নয়। এর আগেও সৌদি আরব বেশ কয়েকবার অভিযোগ তুলেছিল যে, ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তাদের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। সেই অভিযোগের ধারাবাহিকতায় সৌদি আরব একবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরান-সমর্থিত এসব ইরাকি মিলিশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপও নিয়েছিল। ফলে বর্তমান ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে না দেখে, দীর্ঘদিন ধরে চলা এক উত্তেজনার ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই বিশ্লেষকরা দেখছেন।

তবে এবারের ঘটনায় লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাৎক্ষণিক পাল্টা হামলার পথে হাঁটেনি সৌদি আরব। ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি ফোনালাপের পর দেশটি আপাতত কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব জানিয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরাকের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হামলা প্রতিরোধে ইরাকি সরকারের প্রচেষ্টাকে তারা সমর্থন করবে। এক বিবৃতিতে সৌদি সরকার স্পষ্ট করে বলেছে, “সৌদি আরব তার সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা, স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখা এবং নাগরিক ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে।” এই বক্তব্যে একদিকে যেমন কূটনৈতিক সংযমের ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতে প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

যে পাইপলাইনটি নিয়ে এত উদ্বেগ, তার গুরুত্ব বোঝা জরুরি। প্রায় বারোশ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি সৌদি আরবকে কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির সুযোগ করে দেয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে সৌদি আরবের জন্য এই পাইপলাইন কার্যত একটি বিকল্প জীবনরেখার মতো, বিশেষ করে যখন হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা থাকে। রয়টার্স জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, এই একটি পাইপলাইনই বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের প্রায় চার থেকে পাঁচ শতাংশ বহন করে। ফলে এটি সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরই বিশ্ব তেল বাজারে আলোড়ন তোলার জন্য যথেষ্ট।

এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় নীরব থাকেনি আঞ্চলিক জোটও। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান, কাতার ও কুয়েতকে নিয়ে গঠিত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থাটির মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আলবুদাইউই এক বিবৃতিতে বলেন, “এই হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর জন্য একটি বিপজ্জনক উত্তেজনা এবং অগ্রহণযোগ্য হুমকি। এটি আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালারও স্পষ্ট লঙ্ঘন।” এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো ঘটনাটিকে শুধু সৌদি আরবের বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে না দেখে, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবেই বিবেচনা করছে।

তবে আরব উপদ্বীপের অন্য প্রান্তে, অর্থাৎ ইয়েমেনে, পরিস্থিতি এর চেয়েও বেশি উদ্বেগজনক দিকে মোড় নিয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়ে দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত দাবিটি এসেছে খোদ হুথিদের কাছ থেকেই, তারা জানিয়েছে যে বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে চলে গেছে। লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খালে প্রবেশের এই কৌশলগত প্রবেশপথটি বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে হুথিরা এ-ও দাবি করেছে যে, সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া অন্য সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য এই সমুদ্রপথ এখনো ‘নিরাপদ’।

এই দাবির পাল্টায় বসে থাকেনি ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীও। শুক্রবার বাহিনীর মুখপাত্র মাজিদ আল-নুজাইলি জানান, তারা কৌশলগত উপকূলীয় শহর মোকা ও এর আশপাশের এলাকায় হুথি যোদ্ধাদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় হুথিদের বেশ কিছু যানবাহন ও অস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই পাল্টা হামলা এমন একটি শহরকে ঘিরে চালানো হয়েছে যেটি একদিন আগেই, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার, হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল।

লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত মোকা শহরটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বাব আল-মান্দাব প্রণালি থেকে মাত্র আশি কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। হুথিরা শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সেখান থেকে বহু মানুষ পালিয়ে দক্ষিণের শহর এডেনে আশ্রয় নিয়েছে। এই এডেনেই অবস্থিত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল ও দেশটির সরকার, যে কারণে হুথিদের এই অগ্রগতিকে দেশটির বৈধ কর্তৃপক্ষের জন্য একটি সরাসরি হুমকি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, ইয়েমেন সরকারি বাহিনী পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে লোহিত সাগরের উপকূলীয় তাইজ গভর্নরেট এবং তার নিকটবর্তী ইব্ব গভর্নরেটেও হুথি বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট, যুদ্ধক্ষেত্র এখন কেবল একটি শহরকেন্দ্রিক নেই, বরং উপকূলীয় একটি বিস্তৃত অঞ্চল জুড়েই লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে।

এই সংঘাতের সবচেয়ে করুণ দিকটি হয়তো উঠে এসেছে জাতিসংঘের সবশেষ পরিসংখ্যানে। শনিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে এ পর্যন্ত ইয়েমেনে অন্তত ছিয়াত্তর হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, শুধু গত এক সপ্তাহেই এই সংখ্যা চারগুণ বেড়ে গেছে। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, ইয়েমেনে এখন ‘প্রতি ঘণ্টায় দ্রুত অবনতিশীল বাস্তুচ্যুতি সংকট’ তৈরি হচ্ছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে।

জাতিসংঘের ওই বিবৃতিতে মানবিক সংকটের একটি বাস্তব চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, “পুরো পরিবারগুলো রাতের বেলায় ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে। যাওয়ার মতো তাদের কোনো নিরাপদ জায়গা নেই… তারা ক্লান্ত। তাদের সম্পদ শেষ হয়ে গেছে। অধিকাংশ মানুষ শুধু পরনের কাপড়টুকু নিয়েই পালিয়েছে।” এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, সামরিক অগ্রগতি বা কৌশলগত হিসাব-নিকাশের আড়ালে সাধারণ মানুষের জীবনে যে মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা কতটা তীব্র।

এই দুই ফ্রন্টের সংঘাত, অর্থাৎ একদিকে ইরাক-সৌদি সীমান্তে ড্রোন হামলা ও পাইপলাইন বন্ধ হওয়া, অন্যদিকে ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রগতি, একসঙ্গে মিলে বিশ্ব তেল বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। আরব উপদ্বীপের দুই প্রান্তে একযোগে তৈরি হওয়া এই অস্থিরতার প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের দাম গত জুলাই মাসের পর প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি একশ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। প্রসঙ্গত, এই ঘটনাপ্রবাহ এমন এক সময়ে ঘটছে যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ ইতিমধ্যে সপ্তম মাসে গড়িয়েছে, ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু তেল বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, এর প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে বিভিন্ন দেশে, যার ফলে সরকারি ঋণের খরচও আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এনার্জি অ্যাসপেক্টসের বিশ্লেষক রিচার্ড ব্রোঞ্জ জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা শুরুর আগেই সৌদি তেল সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরে এবং পরে আফ্রিকা ঘুরিয়ে পরিবহন করতে গিয়ে জাহাজ চলাচলের সময় প্রায় ত্রিশ দিন বেড়ে গিয়েছিল, যার ফলে পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

তার মতে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত যে মজুত ও অতিরিক্ত সক্ষমতা তেলের বাজারকে এই সংকট সামাল দিতে সাহায্য করেছে, সেগুলোর বেশিরভাগই শেষ হয়ে গেছে। তাই দুই সংকটই চলতে থাকলে তেলের দাম আরও বাড়বে।” তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় রয়েছে ডিজেলের বাজার, যেখানে দাম ইতিমধ্যে রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। যেহেতু উৎপাদন ও পরিবহন খাতে ডিজেলের ব্যবহার ব্যাপক, তাই এর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শিগগিরই অন্যান্য পণ্যের দামেও প্রতিফলিত হতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পূর্বাভাসটিও এসেছে একই বিশ্লেষকের কাছ থেকে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, “মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি একশ বিশ ডলারে ফিরে যেতে পারে, যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে দাম উঠেছিল। এবং এর চেয়েও বেশি হতে পারে।” অর্থাৎ, বর্তমান পরিস্থিতি কোনোভাবে প্রশমিত না হলে বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

সব মিলিয়ে, আরব উপদ্বীপকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই দ্বিমুখী সংঘাত এখন কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং তা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও অর্থনীতির জন্যও একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ইরাক-সৌদি সীমান্তে চলমান উত্তেজনা কূটনৈতিক সংযমের মধ্য দিয়ে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রগতি ও তার জেরে তৈরি হওয়া মানবিক সংকট প্রতিদিনই আরও গভীর হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে এই দুই সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং বিশ্ব তেলের বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগস

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ও বাস্তবতা

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

বিয়ে থেকে ফেরার পথে মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় ঝরল ৪ প্রাণ

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ইরাকের ড্রোন হামলায় সৌদি পাইপলাইন বন্ধ, বাড়ছে তেলের দাম

আপডেট সময় ০২:২৫:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ক্রমেই নতুন নতুন মাত্রা নিচ্ছে, আর তার সবশেষ ধাক্কা এসে লেগেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল সরবরাহ ব্যবস্থায়। ইরাক থেকে ছোড়া একটি ড্রোন হামলার জেরে সৌদি আরব তাদের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনটি বন্ধ করে দিয়েছে, এমন এক সময়ে যখন ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করছে। দুই দিক থেকে একযোগে চাপ তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে, আর আরব উপদ্বীপ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ইরাকের ভূখণ্ড থেকে ছোড়া একটি ড্রোনকে ঘিরে, যা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় গিয়ে আঘাত হানে। হামলার পরপরই সৌদি কর্তৃপক্ষ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। একই সময়ে ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকা থেকে তোলা স্যাটেলাইট ছবিতে পোড়া মাটি ও ধোঁয়ার চিহ্ন দেখা গেছে, যা হামলার তীব্রতা সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, এই হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং কিছু ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে, তবে সেই ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

ইরাক এ ঘটনার দায় পুরোপুরি অস্বীকার করেনি। বরং দেশটির কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে চালানো এই ড্রোন হামলাটি পরিচালিত হয়েছিল ইরানের সীমান্তবর্তী তাদেরই একটি প্রদেশ থেকে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। এক পৃথক বিবৃতিতে জানানো হয়, তদন্তে নিশ্চিত হওয়ার পরই ইরানের সীমান্তঘেঁষা মাইসান প্রদেশের সংশ্লিষ্ট অপারেশনস কমান্ডারকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কারণ প্রাথমিক তদন্তে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে হামলাটি ওই অঞ্চল থেকেই চালানো হয়েছিল। পাশাপাশি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তও শুরু হয়েছে বলে ইরাকি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

এই ঘটনা প্রথমবার নয়। এর আগেও সৌদি আরব বেশ কয়েকবার অভিযোগ তুলেছিল যে, ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তাদের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। সেই অভিযোগের ধারাবাহিকতায় সৌদি আরব একবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরান-সমর্থিত এসব ইরাকি মিলিশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপও নিয়েছিল। ফলে বর্তমান ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে না দেখে, দীর্ঘদিন ধরে চলা এক উত্তেজনার ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই বিশ্লেষকরা দেখছেন।

তবে এবারের ঘটনায় লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাৎক্ষণিক পাল্টা হামলার পথে হাঁটেনি সৌদি আরব। ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি ফোনালাপের পর দেশটি আপাতত কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব জানিয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরাকের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হামলা প্রতিরোধে ইরাকি সরকারের প্রচেষ্টাকে তারা সমর্থন করবে। এক বিবৃতিতে সৌদি সরকার স্পষ্ট করে বলেছে, “সৌদি আরব তার সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা, স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখা এবং নাগরিক ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে।” এই বক্তব্যে একদিকে যেমন কূটনৈতিক সংযমের ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতে প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

যে পাইপলাইনটি নিয়ে এত উদ্বেগ, তার গুরুত্ব বোঝা জরুরি। প্রায় বারোশ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি সৌদি আরবকে কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির সুযোগ করে দেয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে সৌদি আরবের জন্য এই পাইপলাইন কার্যত একটি বিকল্প জীবনরেখার মতো, বিশেষ করে যখন হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা থাকে। রয়টার্স জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, এই একটি পাইপলাইনই বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের প্রায় চার থেকে পাঁচ শতাংশ বহন করে। ফলে এটি সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরই বিশ্ব তেল বাজারে আলোড়ন তোলার জন্য যথেষ্ট।

এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় নীরব থাকেনি আঞ্চলিক জোটও। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান, কাতার ও কুয়েতকে নিয়ে গঠিত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থাটির মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আলবুদাইউই এক বিবৃতিতে বলেন, “এই হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর জন্য একটি বিপজ্জনক উত্তেজনা এবং অগ্রহণযোগ্য হুমকি। এটি আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালারও স্পষ্ট লঙ্ঘন।” এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো ঘটনাটিকে শুধু সৌদি আরবের বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে না দেখে, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবেই বিবেচনা করছে।

তবে আরব উপদ্বীপের অন্য প্রান্তে, অর্থাৎ ইয়েমেনে, পরিস্থিতি এর চেয়েও বেশি উদ্বেগজনক দিকে মোড় নিয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়ে দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত দাবিটি এসেছে খোদ হুথিদের কাছ থেকেই, তারা জানিয়েছে যে বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে চলে গেছে। লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খালে প্রবেশের এই কৌশলগত প্রবেশপথটি বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে হুথিরা এ-ও দাবি করেছে যে, সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া অন্য সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য এই সমুদ্রপথ এখনো ‘নিরাপদ’।

এই দাবির পাল্টায় বসে থাকেনি ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীও। শুক্রবার বাহিনীর মুখপাত্র মাজিদ আল-নুজাইলি জানান, তারা কৌশলগত উপকূলীয় শহর মোকা ও এর আশপাশের এলাকায় হুথি যোদ্ধাদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় হুথিদের বেশ কিছু যানবাহন ও অস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই পাল্টা হামলা এমন একটি শহরকে ঘিরে চালানো হয়েছে যেটি একদিন আগেই, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার, হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল।

লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত মোকা শহরটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বাব আল-মান্দাব প্রণালি থেকে মাত্র আশি কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। হুথিরা শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সেখান থেকে বহু মানুষ পালিয়ে দক্ষিণের শহর এডেনে আশ্রয় নিয়েছে। এই এডেনেই অবস্থিত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল ও দেশটির সরকার, যে কারণে হুথিদের এই অগ্রগতিকে দেশটির বৈধ কর্তৃপক্ষের জন্য একটি সরাসরি হুমকি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, ইয়েমেন সরকারি বাহিনী পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে লোহিত সাগরের উপকূলীয় তাইজ গভর্নরেট এবং তার নিকটবর্তী ইব্ব গভর্নরেটেও হুথি বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট, যুদ্ধক্ষেত্র এখন কেবল একটি শহরকেন্দ্রিক নেই, বরং উপকূলীয় একটি বিস্তৃত অঞ্চল জুড়েই লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে।

এই সংঘাতের সবচেয়ে করুণ দিকটি হয়তো উঠে এসেছে জাতিসংঘের সবশেষ পরিসংখ্যানে। শনিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে এ পর্যন্ত ইয়েমেনে অন্তত ছিয়াত্তর হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, শুধু গত এক সপ্তাহেই এই সংখ্যা চারগুণ বেড়ে গেছে। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, ইয়েমেনে এখন ‘প্রতি ঘণ্টায় দ্রুত অবনতিশীল বাস্তুচ্যুতি সংকট’ তৈরি হচ্ছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে।

জাতিসংঘের ওই বিবৃতিতে মানবিক সংকটের একটি বাস্তব চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, “পুরো পরিবারগুলো রাতের বেলায় ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে। যাওয়ার মতো তাদের কোনো নিরাপদ জায়গা নেই… তারা ক্লান্ত। তাদের সম্পদ শেষ হয়ে গেছে। অধিকাংশ মানুষ শুধু পরনের কাপড়টুকু নিয়েই পালিয়েছে।” এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, সামরিক অগ্রগতি বা কৌশলগত হিসাব-নিকাশের আড়ালে সাধারণ মানুষের জীবনে যে মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা কতটা তীব্র।

এই দুই ফ্রন্টের সংঘাত, অর্থাৎ একদিকে ইরাক-সৌদি সীমান্তে ড্রোন হামলা ও পাইপলাইন বন্ধ হওয়া, অন্যদিকে ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রগতি, একসঙ্গে মিলে বিশ্ব তেল বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। আরব উপদ্বীপের দুই প্রান্তে একযোগে তৈরি হওয়া এই অস্থিরতার প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের দাম গত জুলাই মাসের পর প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি একশ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। প্রসঙ্গত, এই ঘটনাপ্রবাহ এমন এক সময়ে ঘটছে যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ ইতিমধ্যে সপ্তম মাসে গড়িয়েছে, ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু তেল বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, এর প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে বিভিন্ন দেশে, যার ফলে সরকারি ঋণের খরচও আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এনার্জি অ্যাসপেক্টসের বিশ্লেষক রিচার্ড ব্রোঞ্জ জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা শুরুর আগেই সৌদি তেল সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরে এবং পরে আফ্রিকা ঘুরিয়ে পরিবহন করতে গিয়ে জাহাজ চলাচলের সময় প্রায় ত্রিশ দিন বেড়ে গিয়েছিল, যার ফলে পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

তার মতে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত যে মজুত ও অতিরিক্ত সক্ষমতা তেলের বাজারকে এই সংকট সামাল দিতে সাহায্য করেছে, সেগুলোর বেশিরভাগই শেষ হয়ে গেছে। তাই দুই সংকটই চলতে থাকলে তেলের দাম আরও বাড়বে।” তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় রয়েছে ডিজেলের বাজার, যেখানে দাম ইতিমধ্যে রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। যেহেতু উৎপাদন ও পরিবহন খাতে ডিজেলের ব্যবহার ব্যাপক, তাই এর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শিগগিরই অন্যান্য পণ্যের দামেও প্রতিফলিত হতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পূর্বাভাসটিও এসেছে একই বিশ্লেষকের কাছ থেকে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, “মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি একশ বিশ ডলারে ফিরে যেতে পারে, যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে দাম উঠেছিল। এবং এর চেয়েও বেশি হতে পারে।” অর্থাৎ, বর্তমান পরিস্থিতি কোনোভাবে প্রশমিত না হলে বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

সব মিলিয়ে, আরব উপদ্বীপকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই দ্বিমুখী সংঘাত এখন কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং তা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও অর্থনীতির জন্যও একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ইরাক-সৌদি সীমান্তে চলমান উত্তেজনা কূটনৈতিক সংযমের মধ্য দিয়ে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রগতি ও তার জেরে তৈরি হওয়া মানবিক সংকট প্রতিদিনই আরও গভীর হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে এই দুই সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং বিশ্ব তেলের বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি।

Share this news as a Photo Card