শিরোনাম :
‘যৌনাঙ্গে বুট দিয়ে মেরেছে”জামা টেনে তুলে দিয়েছে’: দিল্লিতে আটক বিক্ষোভকারী মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুলছে: বিনা খরচে যাবেন ১০ হাজার কর্মী হিন্দুদের দিকে বাঁকা চোখে তাকালে বিষ দাঁত ভেঙে দেব: হুইপ দুলু নতুন বিধিমালা না আসা পর্যন্ত সরকারি দরপত্র ও ক্রয় স্থগিত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ১০ ও হামের উপসর্গে ৭ শিশুর মৃত্যু পেশোয়ারে স্কুলের ছাদ ধসে ২৮ শিশু ও এক শিক্ষকের মৃত্যু দুর্গাপূজায় ৩৩ হাজার মণ্ডপে মোতায়েন থাকবেন দুই লাখের বেশি আনসার মুক্তির আগেই ঝড় তুলল দেবের ‘দেশু ৭’, প্রেক্ষাগৃহে আগামীকাল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ : শামা ওবায়েদ ব্যাংককে বৈঠকে বাংলাদেশকে সহায়তার আশ্বাস যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের

ব্যাংককে বৈঠকে বাংলাদেশকে সহায়তার আশ্বাস যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের

ব্যাংককে চলমান বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সহায়তার আশ্বাস পেয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাদা বৈঠকে বাংলাদেশ সহযোগিতা চাইলে দুই পক্ষই ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের একাধিক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, চীনের এক্সিম ব্যাংক বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ দেখিয়েছে। এ নিয়ে আলোচনার জন্য আগামী সপ্তাহে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের ঢাকা সফরের কথা রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ঋণ ব্যবস্থাপনাসহ নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় দেশটির সমর্থনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ, জ্বালানি তেল ও নিত্যপণ্য আমদানির যে বড় প্রেক্ষাপট রয়েছে, তাতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় মার্কিন অনুদান ও বিশেষ সহযোগিতা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এই চাওয়াকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছে বলে বৈঠক-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এগিয়েছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানিও বাড়িয়েছে। তাই দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সহায়তা পাওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেমন কিছু পাইনি। কিন্তু বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক যেভাবে এগিয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে আমরা আরও সহায়তা প্রত্যাশা করছি।’

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও ইউএস ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টসহ আন্তর্জাতিক অংশীদাররা একমত যে বাংলাদেশ বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব। তাঁর দাবি, সরকার এসব সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করছে, আর সে কারণেই সহযোগিতার আশ্বাস মিলছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এই সহায়তার নিশ্চয়তা ও দৃশ্যমান অগ্রগতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগে জোর

বার্ষিক সভার বিভিন্ন বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রথাগত সার্বভৌম ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইকুইটি বিনিয়োগ ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে জোর দেওয়া হচ্ছে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের সহযোগিতায় যৌথ বিনিয়োগের সুযোগও খোঁজা হচ্ছে।

অর্থনীতির পুনর্গঠনে সরকারের মূল লক্ষ্য চারটি: রাজস্ব বাড়ানো, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সুরক্ষা দেওয়া। করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ এবং রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আহরণের দায়িত্ব আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অংশীদারদের জানানো হয়েছে।

ব্যাংক খাতের সংস্কারেও সময়সীমাভিত্তিক পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। খেলাপি ঋণ কমানো, দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি পুনর্গঠন ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফেরানোর কাজ চলছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা আবার চালু এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ অর্থায়ন প্যাকেজের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

উপদেষ্টা তিতুমীর আরও বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতিকে বর্তমান সরকার কিছু না লুকিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে মোকাবিলা করছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি ও ইউএস ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট সরকারের সংস্কার কৌশলের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে বলেও জানান তিনি।

সামাজিক সুরক্ষায় বিশেষ নজর

মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ থেকে নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক মানুষকে বাঁচাতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে সংস্কার পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, তাই সংস্কারের পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা চলছে বলে অংশীদারদের জানানো হয়েছে।

তরুণ জনগোষ্ঠী: সুযোগ ও চাপ

একই সভায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফ বলেছে, দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে শিক্ষা, দক্ষতা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ না বাড়ালে এবং বেসরকারি খাত ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না বাড়ালে এই জনমিতিক সুবিধা নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।

আইএমএফের হিসাবে, উন্নত অর্থনীতি ও কয়েকটি উদীয়মান দেশের জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হচ্ছে। উল্টো দিকে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণের সংখ্যা বাড়ছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও যথাযথ বিনিয়োগ দরকার। পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জন ও পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগও বাড়াতে হবে। সংস্থাটির মতে, শুধু নির্দিষ্ট কিছু চাকরি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে কর্মীদের নতুন কাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল অর্থায়নের দ্রুত বিস্তার নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। আবার এসব প্রযুক্তি শ্রমবাজারে পরিবর্তন আনতে পারে এবং আয়বৈষম্য বাড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, প্রযুক্তির সুফল পেতে ডিজিটাল অবকাঠামো, টেকসই জ্বালানি ও দক্ষ জনশক্তিতে বিনিয়োগ দরকার। একই সঙ্গে এমন নীতিমালা চাই, যাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ার সুফল বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজে লাগে। অর্থাৎ শুধু প্রযুক্তি গ্রহণ করলেই চলবে না; এর সুযোগ যেন কিছু প্রতিষ্ঠান বা মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, তাও নিশ্চিত করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ কেবল তরুণের সংখ্যা নয়; তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, উপযুক্ত দক্ষতা ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই আসল কাজ। কার্যকর বিনিয়োগ করা গেলে তরুণরা প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হতে পারে। না হলে এই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে।

ঢালাও ভর্তুকি কমানোর তাগিদ

সভার তৃতীয় দিনে ‘ফিসক্যাল মনিটর’ বিষয়ক ব্রিফিংয়ে ঢালাও ভর্তুকির বদলে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার তাগিদ দিয়েছে আইএমএফ। বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা ও ঋণের চাপ সামলাতে কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং অযৌক্তিক কর অব্যাহতি কমানোর কথাও বলা হয়েছে। ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দেন আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস, উপপরিচালক এরা দাবলা-নরিস ও ডিভিশন চিফ ডেভিডে ফুরচেরি।

সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, করের আওতা বাড়ানো, অযৌক্তিক অব্যাহতি কমানো ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতি রাজস্ব আয় বাড়াতে পারে। জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যে নির্বিচারে ভর্তুকি না দিয়ে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের সহায়তা দিতে হবে। আইএমএফের মতে, ঢালাও ভর্তুকি সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করে, আর অনেক ক্ষেত্রে এর সুফল দরিদ্রের চেয়ে বেশি ভোগক্ষমতার মানুষের কাছেই বেশি পৌঁছায়। তাই জ্বালানির দাম বাড়লে সবাইকে সমান ভর্তুকি না দিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার ও গণপরিবহনের জন্য সুনির্দিষ্ট সহায়তা দেওয়া উচিত। তবে কর সংস্কার ও ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের সময় দরিদ্র মানুষের ওপর বাড়তি চাপ এড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

‘যৌনাঙ্গে বুট দিয়ে মেরেছে”জামা টেনে তুলে দিয়েছে’: দিল্লিতে আটক বিক্ষোভকারী

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ব্যাংককে বৈঠকে বাংলাদেশকে সহায়তার আশ্বাস যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের

১৫ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ব্যাংককে বৈঠকে বাংলাদেশকে সহায়তার আশ্বাস যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের

আপডেট সময় ১২:২০:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

ব্যাংককে চলমান বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সহায়তার আশ্বাস পেয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাদা বৈঠকে বাংলাদেশ সহযোগিতা চাইলে দুই পক্ষই ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের একাধিক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, চীনের এক্সিম ব্যাংক বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ দেখিয়েছে। এ নিয়ে আলোচনার জন্য আগামী সপ্তাহে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের ঢাকা সফরের কথা রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ঋণ ব্যবস্থাপনাসহ নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় দেশটির সমর্থনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ, জ্বালানি তেল ও নিত্যপণ্য আমদানির যে বড় প্রেক্ষাপট রয়েছে, তাতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় মার্কিন অনুদান ও বিশেষ সহযোগিতা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এই চাওয়াকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছে বলে বৈঠক-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এগিয়েছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানিও বাড়িয়েছে। তাই দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সহায়তা পাওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেমন কিছু পাইনি। কিন্তু বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক যেভাবে এগিয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে আমরা আরও সহায়তা প্রত্যাশা করছি।’

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও ইউএস ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টসহ আন্তর্জাতিক অংশীদাররা একমত যে বাংলাদেশ বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব। তাঁর দাবি, সরকার এসব সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করছে, আর সে কারণেই সহযোগিতার আশ্বাস মিলছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এই সহায়তার নিশ্চয়তা ও দৃশ্যমান অগ্রগতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগে জোর

বার্ষিক সভার বিভিন্ন বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রথাগত সার্বভৌম ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইকুইটি বিনিয়োগ ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে জোর দেওয়া হচ্ছে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের সহযোগিতায় যৌথ বিনিয়োগের সুযোগও খোঁজা হচ্ছে।

অর্থনীতির পুনর্গঠনে সরকারের মূল লক্ষ্য চারটি: রাজস্ব বাড়ানো, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সুরক্ষা দেওয়া। করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ এবং রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আহরণের দায়িত্ব আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অংশীদারদের জানানো হয়েছে।

ব্যাংক খাতের সংস্কারেও সময়সীমাভিত্তিক পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। খেলাপি ঋণ কমানো, দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি পুনর্গঠন ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফেরানোর কাজ চলছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা আবার চালু এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ অর্থায়ন প্যাকেজের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

উপদেষ্টা তিতুমীর আরও বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতিকে বর্তমান সরকার কিছু না লুকিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে মোকাবিলা করছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি ও ইউএস ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট সরকারের সংস্কার কৌশলের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে বলেও জানান তিনি।

সামাজিক সুরক্ষায় বিশেষ নজর

মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ থেকে নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক মানুষকে বাঁচাতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে সংস্কার পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, তাই সংস্কারের পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা চলছে বলে অংশীদারদের জানানো হয়েছে।

তরুণ জনগোষ্ঠী: সুযোগ ও চাপ

একই সভায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফ বলেছে, দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে শিক্ষা, দক্ষতা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ না বাড়ালে এবং বেসরকারি খাত ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না বাড়ালে এই জনমিতিক সুবিধা নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।

আইএমএফের হিসাবে, উন্নত অর্থনীতি ও কয়েকটি উদীয়মান দেশের জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হচ্ছে। উল্টো দিকে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণের সংখ্যা বাড়ছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও যথাযথ বিনিয়োগ দরকার। পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জন ও পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগও বাড়াতে হবে। সংস্থাটির মতে, শুধু নির্দিষ্ট কিছু চাকরি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে কর্মীদের নতুন কাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল অর্থায়নের দ্রুত বিস্তার নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। আবার এসব প্রযুক্তি শ্রমবাজারে পরিবর্তন আনতে পারে এবং আয়বৈষম্য বাড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, প্রযুক্তির সুফল পেতে ডিজিটাল অবকাঠামো, টেকসই জ্বালানি ও দক্ষ জনশক্তিতে বিনিয়োগ দরকার। একই সঙ্গে এমন নীতিমালা চাই, যাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ার সুফল বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজে লাগে। অর্থাৎ শুধু প্রযুক্তি গ্রহণ করলেই চলবে না; এর সুযোগ যেন কিছু প্রতিষ্ঠান বা মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, তাও নিশ্চিত করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ কেবল তরুণের সংখ্যা নয়; তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, উপযুক্ত দক্ষতা ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই আসল কাজ। কার্যকর বিনিয়োগ করা গেলে তরুণরা প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হতে পারে। না হলে এই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে।

ঢালাও ভর্তুকি কমানোর তাগিদ

সভার তৃতীয় দিনে ‘ফিসক্যাল মনিটর’ বিষয়ক ব্রিফিংয়ে ঢালাও ভর্তুকির বদলে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার তাগিদ দিয়েছে আইএমএফ। বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা ও ঋণের চাপ সামলাতে কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং অযৌক্তিক কর অব্যাহতি কমানোর কথাও বলা হয়েছে। ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দেন আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস, উপপরিচালক এরা দাবলা-নরিস ও ডিভিশন চিফ ডেভিডে ফুরচেরি।

সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, করের আওতা বাড়ানো, অযৌক্তিক অব্যাহতি কমানো ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতি রাজস্ব আয় বাড়াতে পারে। জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যে নির্বিচারে ভর্তুকি না দিয়ে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের সহায়তা দিতে হবে। আইএমএফের মতে, ঢালাও ভর্তুকি সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করে, আর অনেক ক্ষেত্রে এর সুফল দরিদ্রের চেয়ে বেশি ভোগক্ষমতার মানুষের কাছেই বেশি পৌঁছায়। তাই জ্বালানির দাম বাড়লে সবাইকে সমান ভর্তুকি না দিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার ও গণপরিবহনের জন্য সুনির্দিষ্ট সহায়তা দেওয়া উচিত। তবে কর সংস্কার ও ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের সময় দরিদ্র মানুষের ওপর বাড়তি চাপ এড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

Share this news as a Photo Card