বিগত তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে দেশীয় চলচ্চিত্রশিল্প। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজতে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে বসেছিল এক সেমিনার। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির আয়োজনে ‘আমাদের চলচ্চিত্রে সংকট, করণীয় ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক এই আলোচনায় প্রযোজক, পরিচালক, পরিবেশক, প্রদর্শক ও গণমাধ্যমকর্মীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও প্রস্তাব তুলে ধরেন।
দুপুর ২টায় শুরু হয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে অনুষ্ঠান। প্রযোজনা, পরিবেশনা, প্রদর্শন, সরকারি সহায়তা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা ঘিরে নানা প্রস্তাব আসে। বক্তাদের অনেকেই বলেন, সংকট কাটাতে নীতিমালা তৈরি করতে হবে এবং খুঁজে নিতে হবে নতুন আয়ের উৎস।
বিশেষ অতিথি ছিলেন হেলাল খান। সভাপতিত্ব করেন পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমন। মঞ্চে আরও ছিলেন সমিতির শীর্ষ কর্মকর্তা শাহীন কবির টুটুল, কবিরুল ইসলাম রানা এবং বরেণ্য নির্মাতা কাজী হায়াৎ, ছটকু আহমেদ, শাহ আলম কিরণ, হাবিবুল ইসলাম হাবীব ও সাইমন তারিক।
বেসরকারি ব্র্যান্ড ও ফিল্ম সিটির ভাবনা
স্বাগত বক্তব্যে শাহীন কবির টুটুল বলেন, দেশের বেসরকারি ব্র্যান্ডগুলোকে কীভাবে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে এখনই ভাবতে হবে।
শাহীন সুমন তুলনা টানেন ভারতের আঞ্চলিক চলচ্চিত্রশিল্প মালায়ালামের সঙ্গে। তাঁর প্রশ্ন, ‘মালায়ালাম যদি পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না?’ তিনি জানান, কবিরপুরে ফিল্ম সিটির জন্য সরকারের বিশাল জায়গা পড়ে আছে। সেই জায়গা সিনেমার উন্নয়নে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে আট-দশজনের একটি প্রতিনিধিদলের সরকারের সঙ্গে বসা উচিত বলে মত দেন তিনি।
ইকোসিস্টেম, হল ও গল্পের কথা
বর্ষীয়ান নির্মাতা মতিন রহমান বলেন, চলচ্চিত্রে সৃজনশীল পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার দরকার। বাণিজ্যিক ও শৈল্পিক, দুই ধারার ছবিই বানাতে হবে। শুধু বেশি বাজেটের নয়, স্বল্প ও মাঝারি বাজেটের ছবিও তৈরি করা জরুরি। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা সবাই স্ট্রাকচার নির্মাণে ব্যস্ত। কিন্তু আমার মতে, পুরো ইকোসিস্টেম নিয়ে কাজ করতে হবে।’
হলসংকট মোকাবিলায় তিনি শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তন ও কমিউনিটি সেন্টারগুলো ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, সারা দেশে এসব জায়গা হল হিসেবে ব্যবহার করে কম টাকায় সিনেমা দেখানো গেলে কিশোর গ্যাংয়ের মতো সমস্যার অনেকটাই সমাধান হতে পারে।
প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বলের বক্তব্য, ভালো সিনেমা তৈরি হলে ভালো হলও এমনিতেই গড়ে উঠবে।
নির্মাতা সালাহউদ্দিন লাভলু বলেন, এক-দুজন তারকার ওপর ভর করে শিল্প চলতে পারে না। আগে ১৫-২০ জন নায়ক-নায়িকা ছিলেন, এখন ১৫-২০ কোটি টাকার ছবি এক-দুজন শিল্পীকে নিয়েই হচ্ছে।
প্রযোজকদের কথা
ভার্সেটাইল মিডিয়ার কর্ণধার আরশাদ আদনান বলেন, প্রযোজক ও হলমালিক, সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাঁর মতে, সৃজনশীলতার অভাবে নতুন পরিচালক ও শিল্পী তুলে আনা যাচ্ছে না। তিনি দাবি করেন, কালো টাকা সাদা করে সিনেমা বানানোর অভিযোগের কারণে অনেক সিনিয়র শিল্পী কাজ করতে চান না। বিনিয়োগ ও করের স্বচ্ছতা এলে এ প্রবণতা কমবে এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহী হবে বলে তাঁর বিশ্বাস। বিদ্যমান নীতিমালায় যথেষ্ট দুর্বলতা আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আলফা আইয়ের কর্ণধার শাহরিয়ার শাকিল গুরুত্ব দেন সঠিক বাণিজ্যিক পরিকল্পনার ওপর। তাঁর কথায়, একটি সিনেমার আয় আসতে হবে বিভিন্ন উৎস থেকে। নীতিমালা তৈরি হলে হল ও সিনেমা, দুটিই তৈরি হবে বলে মনে করেন তিনি। আয় ভাগাভাগির অভিজ্ঞতাও শোনান তিনি। তাঁর ভাষ্য, স্টার সিনেপ্লেক্স আগে ১৭-১৮ শতাংশের বেশি অংশ দিত না। কয়েকজন মিলে আলোচনায় বসে প্রথম দুই সপ্তাহের জন্য সেটি ৩০ শতাংশে নিয়ে গিয়েছিলেন।
অতীতের স্মৃতি ও অনুদানের নীতি
কাজী হায়াৎ ফিরে যান অতীতের প্রেক্ষাগৃহ-ব্যবস্থায়। তিনি জানান, আগে বড় হলগুলো এক সপ্তাহ চালানোর খরচ কেটে নিয়ে বাকি অর্থ থেকে প্রযোজককে তাঁর অংশ দিত। এই নিয়মের কারণে সরকারি অনুদানে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’র প্রিন্ট বলাকা হলে আটকে পড়েছিল। পরে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় এক সাংবাদিক ছবিটির সমালোচনা লিখলে দর্শকের আগ্রহ বাড়ে। এরপর ছবিটি রাজশাহীর একটি হলে এবং আবার ঢাকায় মুক্তি পায়। তাঁর ভাষ্য, সমালোচনা পড়ে দুই জায়গাতেই দর্শক ছবিটি দেখতে আগ্রহী হন।
সরকারি অনুদান প্রক্রিয়ায় কয়েকবার যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে নির্মাতা অমিতাভ রেজা বলেন, অনুদানের নীতিমালা স্পষ্ট করতে তিনি কিছু প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রস্তাব ছিল, অনুদান কয়েক ধাপে দেওয়া হবে। প্রথমে স্ক্রিপ্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড, যা কোনোভাবেই পাঁচ লাখ টাকার বেশি হবে না। এরপর প্রোডাকশন ফান্ড এবং তারপর পোস্ট-প্রোডাকশন ফান্ড। তিনি আরও বলেন, এফডিসির বিশাল কাঠামো আধুনিকায়ন করতে হবে এবং ঢাকার বাইরেও স্টুডিও নিতে হবে। পাঁচটি বিভাগীয় শহরে পাঁচটি স্টুডিও করা যেতে পারে। চিত্রনাট্য উন্নয়নে স্ক্রিপ্ট ল্যাব প্রতিষ্ঠায় তহবিল বরাদ্দ এবং গণমাধ্যমে চলচ্চিত্রের ব্যবসার নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশের কথাও বলেন তিনি।
‘সবকিছু সরকার করে দেবে না’
হিমেল আশরাফ বলেন, দেশে চিত্রনাট্যকারের অভাব আছে এবং সিনিয়র শিল্পীরা কাজ করতে চান না। বাধ্য হয়ে বিদেশে যেতে হয়। তাঁর মতে, কাজের মানসিকতার ঘাটতি নেই, দরকার কেবল উপযুক্ত পরিবেশ।
অভিনেতা ও নির্মাতা শাহরিয়ার নাজিম জয় বলেন, ইউটিউবের নাটকের বাজেট দুই-তিন লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। নাটকের মানুষ সরকারের সহায়তা ছাড়াই দর্শকের চাওয়া বুঝে কাজ করে এ জায়গায় এসেছেন। তাঁর কথায়, ‘সিনেমার মানুষদের এটা নিয়ে ভাবতে হবে, সবকিছু সরকার করে দেবে না।’ ‘এক শাকিব খানের ওপরই কেন ভরসা’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আরেকজন শাকিব খান তৈরি করতে হলে সেই পরিমাণ অর্থ লগ্নি করতে হবে, ঝুঁকি নিতে হবে এবং ভালো সিনেমা বানাতে হবে। কম বাজেটে এ বিকল্প তৈরি সম্ভব নয়।
স্ট্রিমিং, বক্স অফিস ও ঐক্য
প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু অ্যামাজন ও নেটফ্লিক্সের মতো বৈশ্বিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সিনেমা পৌঁছে দেওয়ার উপায় নিয়ে ভাবতে বলেন। চলচ্চিত্র সাংবাদিক সৈকত সালাউদ্দিন বলেন, বক্স অফিসের তথ্য প্রকাশ নির্ভর করে পরিচালক ও প্রযোজকদের সদিচ্ছার ওপর।
টেজাব সভাপতি নাজমুল আলম রানার মতে, পরিচালক, প্রযোজক ও প্রদর্শকদের মধ্যে ঐক্য নেই। তাঁর অভিযোগ, এফডিসিকেন্দ্রিক নির্মাতারা সময়োপযোগী সিনেমা বানাচ্ছেন না। গত কয়েক বছরে যেসব সিনেমা আলোচনা ও ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছে, সেগুলো এই গণ্ডির বাইরের নির্মাতাদের। গণমাধ্যমের পাশাপাশি শিল্পীদেরও দায়বদ্ধতা আছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, তাঁদের নিয়েই পরিচালক ও প্রযোজকদের সেমিনার করা উচিত।
এ ছাড়া প্রযোজক-পরিচালক মো. ইকবাল, পরিচালক জাকির হোসেন রাজু ও ছটকু আহমেদসহ অনেকে বক্তব্য দেন।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















