শিরোনাম :
নোবেল পুরস্কারের সূচনা ও প্রথম বিজয়ীদের গল্প শুদ্ধ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিতের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার পেল রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন সাংবাদিকদের ওপর হামলা; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রাধ্যক্ষকে অব্যাহতি শিশুরা প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেলে দেশের ভিত্তি মজবুত হবে: প্রধানমন্ত্রী আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির বিদায়ী ম্যাচ মঙ্গলবার রাতে, ২১ বছরের অধ্যায়ের ইতি সালমান শাহ হত্যা মামলায় খলনায়ক ডনের জামিন আবেদন ফের নামঞ্জুর রক্তের সম্পর্ক নেই, তবু ৭৪ শিশুর ‘মা’ বিলকিছ বানু সৌদি আরবে দ্রুত সেনা মোতায়েন করবে তুরস্ক ও পাকিস্তান পথশিশু, ডেঙ্গু, ইউপি নির্বাচন ও ডিজেলের দাম—সমসাময়িক খবরের হালখাতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অর্থহীন: ইরান

রক্তের সম্পর্ক নেই, তবু ৭৪ শিশুর ‘মা’ বিলকিছ বানু

আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসার দায়িত্ব নিজের কাঁধে; মাসে ব্যয় সাড়ে ৩ লাখ টাকা
‘গর্ভে ধারণ করা যায় একজন-দুজন সন্তান, কিন্তু মমতার বন্ধনে বুকে ধারণ করা যায় অসংখ্য সন্তান।’—এই বিশ্বাসকে জীবনের ব্রত করেছেন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বিলকিছ বানু। নিজের সন্তান না হয়েও ৭৪ জন ছিন্নমূল ও এতিম শিশুকে বুকে টেনে নিয়ে তাদের মা হয়ে উঠেছেন তিনি। শুধু আশ্রয় নয়, এসব শিশুর শিক্ষা, চিকিৎসা, খাবার ও ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্বও নিয়েছেন এই মানবিক নারী।
একসময় মাত্র ১৩ জন পথশিশুকে আশ্রয় দেওয়ার মধ্য দিয়ে যে উদ্যোগের শুরু, সময়ের পরিক্রমায় তা আজ পরিণত হয়েছে একটি বড় পরিবারের। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘গোলাপ খাঁ শিশু সদন’ এখন ৭৪ জন এতিম ও অসহায় শিশুর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ছেলে ও মেয়েদের জন্য রয়েছে পৃথক আবাসন ব্যবস্থা। তাদের দেখভালের জন্য রয়েছেন ২০ জন শিক্ষক ও কর্মী।
সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য নিজের সম্পত্তিও দান
বিলকিছ বানুর এই মানবিক উদ্যোগে শুরু থেকেই পাশে রয়েছেন তাঁর স্বামী নাগেশ্বরী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক মো. রবিউল ইসলাম। শিশুদের ভবিষ্যৎ যেন কোনোভাবেই অনিশ্চিত না হয়, সে জন্য এই দম্পতি নিজেদের যাবতীয় সম্পত্তি ট্রাস্টের নামে দান করেছেন।
শিশু সদনের নিয়মিত ব্যয় মেটাতে ট্রাস্টের মালিকানাধীন একটি সুপার মার্কেটের প্রায় ৮০টি দোকানের ভাড়া, ছাত্রী হোস্টেলের আয় ও কৃষিজমি থেকে পাওয়া অর্থ ব্যবহার করা হয়। এসব উৎস থেকে পাওয়া অর্থ দিয়েই চলে শিশুদের থাকা, খাওয়া, পোশাক, পড়াশোনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ। প্রতি মাসে শিশুদের পেছনে ব্যয় হয় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা।
অসুস্থ সন্তানদের চিকিৎসাতেও থামেননি ‘মা’
শিশুদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি তাদের চিকিৎসার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন বিলকিছ বানু। সম্প্রতি গুইলিয়ান-বারে সিন্ড্রোমে আক্রান্ত প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী তুষারের চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ফাতেমার চিকিৎসাও চলছে নিয়মিত।
চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে বর্তমানে ট্রাস্টের তহবিল প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। তবুও শিশুদের ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন না বিলকিছ বানু।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, “চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে তহবিল শূন্য হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই বাচ্চাদের কোথায় ফেলে দেব? ওরা তো আমারই পেটের সন্তানের মতো।”
‘মা-বাবা’ ডাকেই তাদের পৃথিবী
গোলাপ খাঁ শিশু সদনের কো-অর্ডিনেটর সব্যসাচী সাহা জানান, এখানকার শিশুরা বিলকিছ বানু ও তাঁর স্বামী রবিউল ইসলামকে ভালোবেসে ‘মা’ ও ‘বাবা’ বলে ডাকে। এই প্রতিষ্ঠানে বেড়ে ওঠা অনেক শিশু বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। কেউ কেউ পড়াশোনা করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও।
বাধা এসেছে, থামেনি পথচলা
দীর্ঘ এই পথচলায় নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে এই দম্পতিকে। করোনাভাইরাস মহামারির সময় যেমন অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল, তেমনি ট্রাস্টের প্রায় সাড়ে সাত বিঘা জমি নিয়েও জমি-সংক্রান্ত জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে কোনো সংকটই তাদের মানবিক উদ্যোগ থামাতে পারেনি।
রবিউল ইসলাম বলেন, “যতদিন বেঁচে আছি, আমাদের যা কিছু আছে তা দিয়ে এই সন্তানদের পাশে থাকব।”
আরও বড় স্বপ্ন
৭৪ শিশুকে নিয়ে থেমে থাকতে চান না বিলকিছ বানু ও রবিউল ইসলাম। স্থানীয় প্রশাসন, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা পেলে ‘গোলাপ খাঁ শিশু সদন’কে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চান তারা।
যেখানে অনেক অসহায় শিশু পরিচয়হীনতা, অনিশ্চয়তা আর দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বেড়ে ওঠে, সেখানে বিলকিছ বানু তাদের জন্য তৈরি করেছেন একটি পরিবার। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মমতা, দায়িত্ব আর ভালোবাসার বন্ধনে ৭৪ শিশুর কাছে তিনি আজ সত্যিই একজন ‘মা’।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

“শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত”—এই প্রতিপাদ্যে সিরাজগঞ্জে শিশু দিবস উদযাপন 

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অর্থহীন: ইরান

০৬ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

রক্তের সম্পর্ক নেই, তবু ৭৪ শিশুর ‘মা’ বিলকিছ বানু

আপডেট সময় ১২:১৫:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসার দায়িত্ব নিজের কাঁধে; মাসে ব্যয় সাড়ে ৩ লাখ টাকা
‘গর্ভে ধারণ করা যায় একজন-দুজন সন্তান, কিন্তু মমতার বন্ধনে বুকে ধারণ করা যায় অসংখ্য সন্তান।’—এই বিশ্বাসকে জীবনের ব্রত করেছেন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বিলকিছ বানু। নিজের সন্তান না হয়েও ৭৪ জন ছিন্নমূল ও এতিম শিশুকে বুকে টেনে নিয়ে তাদের মা হয়ে উঠেছেন তিনি। শুধু আশ্রয় নয়, এসব শিশুর শিক্ষা, চিকিৎসা, খাবার ও ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্বও নিয়েছেন এই মানবিক নারী।
একসময় মাত্র ১৩ জন পথশিশুকে আশ্রয় দেওয়ার মধ্য দিয়ে যে উদ্যোগের শুরু, সময়ের পরিক্রমায় তা আজ পরিণত হয়েছে একটি বড় পরিবারের। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘গোলাপ খাঁ শিশু সদন’ এখন ৭৪ জন এতিম ও অসহায় শিশুর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ছেলে ও মেয়েদের জন্য রয়েছে পৃথক আবাসন ব্যবস্থা। তাদের দেখভালের জন্য রয়েছেন ২০ জন শিক্ষক ও কর্মী।
সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য নিজের সম্পত্তিও দান
বিলকিছ বানুর এই মানবিক উদ্যোগে শুরু থেকেই পাশে রয়েছেন তাঁর স্বামী নাগেশ্বরী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক মো. রবিউল ইসলাম। শিশুদের ভবিষ্যৎ যেন কোনোভাবেই অনিশ্চিত না হয়, সে জন্য এই দম্পতি নিজেদের যাবতীয় সম্পত্তি ট্রাস্টের নামে দান করেছেন।
শিশু সদনের নিয়মিত ব্যয় মেটাতে ট্রাস্টের মালিকানাধীন একটি সুপার মার্কেটের প্রায় ৮০টি দোকানের ভাড়া, ছাত্রী হোস্টেলের আয় ও কৃষিজমি থেকে পাওয়া অর্থ ব্যবহার করা হয়। এসব উৎস থেকে পাওয়া অর্থ দিয়েই চলে শিশুদের থাকা, খাওয়া, পোশাক, পড়াশোনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ। প্রতি মাসে শিশুদের পেছনে ব্যয় হয় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা।
অসুস্থ সন্তানদের চিকিৎসাতেও থামেননি ‘মা’
শিশুদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি তাদের চিকিৎসার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন বিলকিছ বানু। সম্প্রতি গুইলিয়ান-বারে সিন্ড্রোমে আক্রান্ত প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী তুষারের চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ফাতেমার চিকিৎসাও চলছে নিয়মিত।
চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে বর্তমানে ট্রাস্টের তহবিল প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। তবুও শিশুদের ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন না বিলকিছ বানু।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, “চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে তহবিল শূন্য হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই বাচ্চাদের কোথায় ফেলে দেব? ওরা তো আমারই পেটের সন্তানের মতো।”
‘মা-বাবা’ ডাকেই তাদের পৃথিবী
গোলাপ খাঁ শিশু সদনের কো-অর্ডিনেটর সব্যসাচী সাহা জানান, এখানকার শিশুরা বিলকিছ বানু ও তাঁর স্বামী রবিউল ইসলামকে ভালোবেসে ‘মা’ ও ‘বাবা’ বলে ডাকে। এই প্রতিষ্ঠানে বেড়ে ওঠা অনেক শিশু বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। কেউ কেউ পড়াশোনা করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও।
বাধা এসেছে, থামেনি পথচলা
দীর্ঘ এই পথচলায় নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে এই দম্পতিকে। করোনাভাইরাস মহামারির সময় যেমন অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল, তেমনি ট্রাস্টের প্রায় সাড়ে সাত বিঘা জমি নিয়েও জমি-সংক্রান্ত জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে কোনো সংকটই তাদের মানবিক উদ্যোগ থামাতে পারেনি।
রবিউল ইসলাম বলেন, “যতদিন বেঁচে আছি, আমাদের যা কিছু আছে তা দিয়ে এই সন্তানদের পাশে থাকব।”
আরও বড় স্বপ্ন
৭৪ শিশুকে নিয়ে থেমে থাকতে চান না বিলকিছ বানু ও রবিউল ইসলাম। স্থানীয় প্রশাসন, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা পেলে ‘গোলাপ খাঁ শিশু সদন’কে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চান তারা।
যেখানে অনেক অসহায় শিশু পরিচয়হীনতা, অনিশ্চয়তা আর দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বেড়ে ওঠে, সেখানে বিলকিছ বানু তাদের জন্য তৈরি করেছেন একটি পরিবার। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মমতা, দায়িত্ব আর ভালোবাসার বন্ধনে ৭৪ শিশুর কাছে তিনি আজ সত্যিই একজন ‘মা’।

Share this news as a Photo Card