২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও আলিম পরীক্ষার ফলাফলে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ব্যবধান। কোনো প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাসের সাফল্য, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানে অধিকাংশ পরীক্ষার্থীই অকৃতকার্য। বিশেষ করে মাইদাম কলেজ ও চর বড়ুইটারী আলিম মাদ্রাসার নিম্ন পাসের হার এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে জিপিএ-৫ না পাওয়ার ঘটনায় উপজেলার শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড ও বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন উপজেলার ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। এর মধ্যে সাধারণ কলেজগুলোর পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে ধলডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজ। অন্যদিকে মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে এগিয়ে রয়েছে ভূরুঙ্গামারী ফাজিল মাদ্রাসা। জিপিএ-৫ অর্জনে সাধারণ কলেজগুলোর মধ্যে শীর্ষে ভূরুঙ্গামারী মহিলা ডিগ্রি কলেজ এবং মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে শীর্ষে ভূরুঙ্গামারী ফাজিল মাদ্রাসা।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, ধলডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের (১২২১২৭) একমাত্র পরীক্ষার্থী পাস করেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার শতভাগ। তবে প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত অবস্থা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। সরেজমিনে দেখা যায়, কলেজটির দুটি কক্ষে বেড়া নেই এবং নেই কোনো অফিসকক্ষ। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রধান মো. রিয়াজুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে ভূরুঙ্গামারী ফাজিল মাদ্রাসা (১২২১০৫) থেকে ৭১ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে ৪৯ জন। পাসের হার ৬৯.০১ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি থেকে সর্বোচ্চ ৪টি জিপিএ-৫ অর্জিত হয়েছে। সাধারণ বিভাগে ৬৩ জনের মধ্যে ৪১ জন পাস করেছে। বিজ্ঞান বিভাগে ১১ জনের মধ্যে পাস করেছে ৮ জন।
বলদিয়া কলেজ (১৩৭৭৫৭) থেকে ৯৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬১ জন পাস করেছে। পাসের হার ৬৩.১৬ শতাংশ। মানবিক বিভাগের ৮৮ জনের মধ্যে ৫৪ জন পাস করেছে এবং এ বিভাগ থেকে একজন জিপিএ-৫ পেয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগের ছয়জন পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করলেও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের একমাত্র পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।
ভূরুঙ্গামারী মহিলা ডিগ্রি কলেজ (১২২১২৩) থেকে ২৫৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১২০ জন। পাসের হার ৪৬.৮৮ শতাংশ। তবে জিপিএ-৫ অর্জনে প্রতিষ্ঠানটি উপজেলার সাধারণ কলেজগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান থেকে তিনজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এর মধ্যে মানবিক বিভাগের ২৩০ জনের মধ্যে ৯৭ জন পাস করেছে।
সোনাহাট ডিগ্রি কলেজ (১২২১২৪) থেকে ২৬৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১৫ জন। পাসের হার ৪৩.৪০ শতাংশ। মানবিক বিভাগের ২৫৩ জনের মধ্যে ১০৬ জন, বিজ্ঞান বিভাগের ১০ জনের মধ্যে ৮ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের দুজনের মধ্যে একজন পাস করেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি থেকে কেউ জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেনি।
ভূরুঙ্গামারী সরকারি কলেজ (১২২১২২) থেকে ৩৬৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১২২ জন। পাসের হার ৩৩.৪২ শতাংশ। মানবিক বিভাগের ২৮৫ জনের মধ্যে ৮৪ জন পাস করেছে। এ বিভাগ থেকে একজন জিপিএ-৫ পেয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগে ৪১ জনের মধ্যে ২৫ জন পাস, ১৫ জন ফেল এবং একজন বহিষ্কৃত হয়েছে। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ৪০ জনের মধ্যে পাস করেছে ১৪ জন।
মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে বাউশমারী ফাজিল মাদ্রাসা থেকে সাধারণ বিভাগের ১২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে সাতজন পাস করেছে। পাসের হার ৫৮.৩৩ শতাংশ। তবে প্রতিষ্ঠানটি থেকে কেউ জিপিএ-৫ পায়নি।
অন্যদিকে চর বড়ুইটারী আলিম মাদ্রাসা (১২২১০৭) থেকে ২৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ছয়জন। পাসের হার ২৫ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির ফলাফল মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
সাধারণ কলেজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে হতাশাজনক ফলাফল করেছে মাইদাম কলেজ (১২২১২৫)। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র পাঁচজন। পাসের হার ১৭.৮৬ শতাংশ। মানবিক বিভাগের ২৬ জনের মধ্যে পাঁচজন পাস করলেও বিজ্ঞান বিভাগের দুজনই অকৃতকার্য হয়েছে।
এদিকে ভূরুঙ্গামারী টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের এইচএসসি (বিএমটি) পরীক্ষার ফলাফলেও দেখা গেছে হতাশাজনক চিত্র। প্রতিষ্ঠানটির ২৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র তিনজন। অকৃতকার্য হয়েছে ২৪ জন। পাসের হার ১১.১১ শতাংশ। তবে দিয়াডাঙ্গা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ অন্যান্য কারিগরি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
সামগ্রিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানভেদে পাসের হারে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। একদিকে শতভাগ পাসের সাফল্য, অন্যদিকে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ২০ শতাংশেরও নিচে। আবার জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রেও রয়েছে অসমতা। সোনাহাট ডিগ্রি কলেজ, মাইদাম কলেজ, বাউশমারী ফাজিল মাদ্রাসা ও চর বড়ুইটারী আলিম মাদ্রাসা থেকে কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি।
শিক্ষার মানোন্নয়ন, নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের জবাবদিহি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। তাঁদের মতে, শুধু পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ নয়, বরং নিম্ন ফলাফলের কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায় উপজেলার শিক্ষার সামগ্রিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
নুরুল আমিন, স্টাফ রিপোর্টার 














