লাওসে বাংলাদেশি শ্রমিকের ভিসা স্থগিত, কারণ এখনও অজানা
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওস বাংলাদেশি শ্রমিকদের নতুন নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসা দেওয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। সিদ্ধান্তটির পেছনে ঠিক কী কারণ, তা এখনও জানা যায়নি। ঢাকা বলছে, লাওসে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বড় না হলেও সেখানে কর্মীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তাই অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে নানা সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে।
কী বলা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে
বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২৮ সেপ্টেম্বর একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। তাতে জানানো হয়, লাওসের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ৯ সেপ্টেম্বর একটি আদেশ দিয়েছে। সেই আদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের শ্রমিক নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিটসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সাময়িকভাবে থামিয়ে দেওয়ার নির্দেশ আছে। শ্রমিক শ্রেণির এলএ-বি২ ভিসা ইস্যুও আপাতত বন্ধ থাকবে।
স্থগিতাদেশের মেয়াদ ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর, অর্থাৎ চার মাস। মেয়াদ শেষের পর কী হবে, তা বিজ্ঞপ্তিতে বলা নেই।
বিজ্ঞপ্তিতে লাওসগামী কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত সব কার্যক্রমে এই নির্দেশ মেনে চলতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছে। ভুয়া ভিসা ও অনুমোদনহীন রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতারণা এড়াতে আগ্রহীদের কাছে আরও দুটি অনুরোধ আছে। তাঁরা যেন কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে পাসপোর্ট জমা না রাখেন এবং কোনো আর্থিক লেনদেনও না করেন।
কারণ নিয়ে অস্পষ্টতা
কেন এই সিদ্ধান্ত, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে কিছু বলা হয়নি। প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হকও বলেছেন, লাওসের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো কারণ তাঁদের জানানো হয়নি। তিনি জানান, লাওসে বাংলাদেশের নিজস্ব দূতাবাস নেই। তাই পাশের একটি দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে বিষয়টি খোঁজ করা হচ্ছে। সেখানকার শ্রমবাজারের পরিস্থিতি কেমন এবং বাংলাদেশের সুযোগ কতটা, তা জানিয়ে প্রতিবেদন দিতে ওই দূতাবাসকে বলা হয়েছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ধারণা দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, লাওসে বাংলাদেশি শ্রমিকেরা মূলত নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। অনেক কোম্পানিতে কাজ কমে গেছে, সে কারণেই হয়তো দেশটি এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তাঁর মতে, এটি সাময়িক হতে পারে এবং পরে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। তবে এটি ওই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ধারণা, সরকারিভাবে নিশ্চিত করা কোনো ব্যাখ্যা নয়।
লাওসের সংবাদমাধ্যমে যা এসেছে
লাওসের ইংরেজি সংবাদপত্র দ্য লাওশিয়ান টাইমস ১৪ সেপ্টেম্বর এই আদেশ নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপে। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশিদের নতুন ওয়ার্ক পারমিট, শ্রমিক আমদানির পরিকল্পনা ও শ্রম প্রকল্পের অনুমোদন স্থগিত থাকবে। তবে লাওস সরকারের অনুমোদিত অগ্রাধিকারমূলক বড় প্রকল্প, যেগুলোর কাজের সময়সূচি চুক্তিতে নির্ধারিত, সেগুলো এর বাইরে থাকবে।
প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, অবৈধ প্রবেশ, মানব পাচার, অননুমোদিত শ্রমিক সরবরাহকারী এবং বিদেশ থেকে শ্রমিক এনে দায় এড়িয়ে যাওয়া নিয়োগদাতাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এই পদক্ষেপ। তবে শুধু বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেই কেন এটি প্রযোজ্য হলো, লাওসের আদেশে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই বলেও পত্রিকাটি জানিয়েছে।
আদেশের কারণে কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি, নিয়োগদাতা বা লেবার অপারেটর নিজের উদ্যোগে বাংলাদেশিদের প্রবেশ বা কাজের অনুমতি দিতে পারবেন না। লঙ্ঘন করলে জরিমানা, দেশে ফেরত পাঠানো এবং ব্যবসার লাইসেন্স বাতিলের মতো ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।
জরিমানার অঙ্ক
দ্য লাওশিয়ান টাইমসের তথ্য অনুযায়ী জরিমানা হবে এ রকম:
- অনুমোদন ছাড়া শ্রমিক আনলে বা নিয়োগ দিলে নিয়োগদাতাকে প্রতিটি ঘটনায় শ্রমিকপ্রতি ২৫ লাখ লাও কিপ, যা প্রায় ১১০ মার্কিন ডলার। অন্য শ্রমিক ইউনিটে নিয়োগের জন্য শ্রমিক আনলেও একই অঙ্ক প্রযোজ্য।
- অন্য ইউনিটের জন্য নির্ধারিত শ্রমিককে কাজে লাগালে বা গ্রহণ করলে শ্রমিকপ্রতি ২০ লাখ কিপ, যা প্রায় ৮৯ ডলার।
- অনুমোদনহীন কর্মস্থলে কাজ করলে শ্রমিককে ১০ লাখ কিপ, যা প্রায় ৪৪ ডলার, জরিমানা দিতে হবে। এ ছাড়া ৩০ দিনের মধ্যে তাঁকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
শ্রমিকদের দেশে ফেরানোর যাতায়াত খরচ বহন করতে হবে নিয়োগদাতা বা নিয়ম ভঙ্গকারী পক্ষকে। একই অপরাধ আবার ঘটলে জরিমানা হবে তিন গুণ, সঙ্গে অন্য আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
প্রতারণা নিয়ে সরকারের অবস্থান
প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক জানান, লাওস ও কম্বোডিয়ার মতো দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতারণার শিকার হওয়ার খবর আসছে। সে কারণে এসব দেশে কর্মী পাঠানোর আগে কাগজপত্র আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে। কর্মীরা কী কাজে যাচ্ছেন, কত দিনের জন্য যাচ্ছেন এবং কোথায় যাচ্ছেন, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তাঁর অভিযোগ, কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি এক-দুটি ভুয়া কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশে চাহিদাপত্র এনে কর্মী পাঠিয়েছে, এখনও পাঠাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সেখানে ওই ধরনের কাজ নেই। এ কারণেই যাচাই-বাছাই কড়াকড়ি করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, কেবল লাওস বা কম্বোডিয়া নয়, ইউরোপের যেসব দেশে বাংলাদেশিরা অবৈধ পথে যান, সেটিও ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। ইতালি কিংবা সার্বিয়া হয়ে অবৈধভাবে যাওয়া এবং ভূমধ্যসাগরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি দেওয়া বন্ধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও দেশের ভেতরে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
লাওসে কারা যান
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, লাওসে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকেরা সাধারণত নির্মাণ ও উৎপাদন খাতে কাজ করেন। দেশটিতে মোট কতজন বাংলাদেশি কর্মী আছেন, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব প্রতিমন্ত্রীর কাছেও নেই।
বাংলাদেশের একটি সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে প্রায় তিন হাজার কর্মী লাওস যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছেন। বাংলাদেশি কর্মী অভিবাসনের তালিকায় লাওসের অবস্থান তেরোতম। গত বছর ছাড়পত্র নিয়েছিলেন তিন হাজার ৮৩৫ জন।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, লাওসের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো নয়। চীনা কিছু প্রকল্পে অল্প সংখ্যক বাংলাদেশি যান, এটুকুই সরকার জানে। বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের গন্তব্য হিসেবে লাওস তেমন পরিচিত দেশ নয়।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : 




















