দেশে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিলসহ রান্নার পাত্র নিরাপদ কি না, তা যাচাইয়ের কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেই। সারা দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া এসব পণ্যের মান দেখারও কেউ নেই। সম্প্রতি এক গবেষণায় এসব পাত্র থেকে ভাত ও খিচুড়িতে সিসা মেশার তথ্য উঠে আসার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ধরনের পাত্র তৈরির ধাতু কিংবা পাত্রে সিসার মাত্রা নিয়ে কোনো মানদণ্ডই নেই।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে
গবেষণাটি করেছে আইসিডিডিআর,বি ও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। ফল প্রকাশিত হয়েছে ন্যাচারের জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজিতে। স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে রান্না করলে খাবারে কতটা সিসা মিশতে পারে, তা এতে পরীক্ষা করা হয়েছে।
আইসিডিডিআর,বি জানিয়েছে, গবেষকেরা বিভিন্ন পরিবার থেকে সংগ্রহ করা সাতটি ব্যবহৃত পাত্র এবং বাজার থেকে কেনা ২০টি নতুন পাত্র পরীক্ষা করেছেন। প্রথমে পাত্রের ধাতুতে সিসার উপস্থিতি ও পরিমাণ মাপা হয়। এরপর পাত্র গরম করে ভাত ও খিচুড়ি রান্না করা হয়। পরে পরীক্ষাগারে পানি ও রান্না করা খাবারে সিসার পরিমাণ নির্ণয় করা হয়।
সংস্থার বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পরীক্ষা করা প্রতিটি পাত্র থেকেই খাবারে সিসা মিশেছে, পাত্র নতুন হোক বা পুরনো। নতুন পাত্রে প্রথমবার রান্নার সময় প্রতি কেজি সাদা ভাতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে সর্বোচ্চ ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে। শিশুদের খাবারে সিসার সীমা যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) নির্ধারণ করেছে প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম। গবেষকদের হিসাবে, এমন পাত্রে রান্না করা ভাত খেলে একটি শিশু দৈনিক যে পরিমাণ সিসা গ্রহণ করতে পারে, তা এফডিএর নির্ধারিত মাত্রার পাঁচ গুণেরও বেশি।
পাত্র কীভাবে পরিষ্কার করা হয়, তার ওপরও সিসা মেশার পরিমাণ নির্ভর করে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। নতুন পাত্র স্টিলের তারের মাজুনি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে না ঘষে ব্যবহারের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সিসা খাবারে মিশেছে। ধাতব খুন্তি দিয়ে নাড়লেও এর পরিমাণ বেড়েছে।
ঝুঁকি কোথায়
আইসিডিডিআর,বি বলছে, সিসা একটি বিষাক্ত ধাতু, যা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা নেই, যাকে নিরাপদ বলা যায়।
সংস্থাটির ভাষ্য, স্থানীয়ভাবে তৈরি অনেক অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র পুরনো স্ক্র্যাপ ধাতু গলিয়ে বানানো হয়। এসব ধাতু ঠিকমতো পরীক্ষা না করলে পাত্রে সিসা থেকে যেতে পারে। দেশে পুরনো হাঁড়ি-পাতিলের বদলে নতুন পাত্র নেওয়া বা পুরনো কাপড়ের বিনিময়ে পাত্র কেনার চল আছে। তাই নতুন বা চকচকে হলেই পাত্র নিরাপদ, এমন ভাবার সুযোগ নেই বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সংস্থার পরিবেশগত স্বাস্থ্য ও ওয়াশ বিভাগের বিজ্ঞানী ডা. জেসমিন সুলতানা বলেন, এসব পাত্র ব্যবহার করতে হলে স্টিলের তারের স্ক্রাবারে ঘষা এড়ানো উচিত। টক বা অম্লীয় খাবার রান্না না করাই ভালো। তবে এসব সতর্কতাও দূষিত পাত্রকে পুরোপুরি নিরাপদ করে না।
কারখানায় যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেই
বাংলাদেশে অ্যালুমিনিয়ামের কুকওয়্যার তৈরির সবচেয়ে বড় কেন্দ্র চট্টগ্রাম অঞ্চল। চট্টগ্রাম অ্যালুমিনিয়াম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি হারুনুর রশিদ স্বীকার করেছেন, বেশির ভাগ কারখানায় মান যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাঁর ভাষ্য, এটি পুরো শিল্পের সমস্যা এবং সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে মিলে এর সমাধান করতে হবে। স্ক্র্যাপ ধাতুতে সিসা বা ক্ষতিকর কিছু আছে কি না, তা পরীক্ষার কোনো পদ্ধতি আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন কোনো প্রক্রিয়া নেই; অ্যালুমিনিয়াম পুনর্ব্যবহার করা হয়, কিন্তু ক্ষতিকর উপাদান যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই।
সমিতির সাবেক সভাপতি একরামুল হকের বক্তব্য, বড় কিছু প্রতিষ্ঠান যাচাই করলেও বহু প্রতিষ্ঠান জাহাজের ক্ষতিকর স্ক্র্যাপ ব্যবহার করে। ছোট অনেক প্রতিষ্ঠান কোনো নিয়ম মানে না, আর তাদের খোঁজ নেওয়ারও কেউ নেই।
কর্তৃপক্ষ কী বলছে
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে খাবারে সিসা মিশছে। তাঁর ভাষ্য, এ কারণে কর্তৃপক্ষ অনেক দিন ধরেই এসব পাত্র ব্যবহার না করতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে মিলিয়ে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয়ে মান নির্ধারণের কাজ সময়সাপেক্ষ, তবে তা চলমান।
বাজারে পণ্যের মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরিচালক মো. আলাউদ্দিন হুসাইন জানান, তাঁরা অ্যালুমিনিয়াম কুকওয়্যারের ৩৯টি উৎপাদক প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে দুই দফা বৈঠক করেছেন, কিন্তু কার্যকর সাড়া পাননি। তাঁর দাবি, উৎপাদকেরা পণ্য স্বাস্থ্যসম্মত কি না কিংবা হেভি মেটাল আছে কি না, তা-ই বোঝেন না। আগে পণ্যটি অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় ছিল না, এখন এসেছে। তাই অভিযান শুরু হবে এবং একটি নিরাপত্তা মান প্রণয়ন করা হবে।
গবেষণা সংস্থার প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ডা. মো. মাহবুবুর রহমান নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে খাবারে সিসা মেশা নিয়ে স্পষ্ট নিরাপত্তা মান ঠিক করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিএসটিআইকে রান্নার পাত্রের জন্য সিসাসংক্রান্ত মান তৈরির অনুরোধ করেছেন।
বাস্তবতা হলো, দেশের ঘরে ঘরে এবং অসংখ্য খাবারের দোকানে রান্নায় অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 

























