দিল্লিতে সদ্যসমাপ্ত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন মোড় লক্ষ করা গেছে। সম্মেলনে পহেলগামে সংঘটিত সন্ত্রাসবাদী হামলার কড়া নিন্দা জানিয়ে সদস্য দেশগুলো একযোগে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির পক্ষে অবস্থান নেয়। এই ঘোষণাপত্রে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীনও স্বাক্ষর করায় তা আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
ঘোষণাপত্রে সরাসরি পাকিস্তানের নাম উল্লেখ না থাকলেও, ভারতের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতি বেইজিংয়ের এই সম্মতি কূটনৈতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চীন ও পাকিস্তানের বহু বছরের ‘অল-ওয়েদার’ বা লোহার মতো কঠিন সম্পর্কে এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে সূক্ষ্ম পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই পরিবর্তনের নেপথ্যে কাজ করছে প্রধানত তিনটি কারণ। প্রথমত, পাকিস্তানে কর্মরত চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতা ক্রমেই বেইজিংয়ের ধৈর্যের সীমা পরীক্ষা করছে। বিশেষত বালুচিস্তানে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর তথা সিপেক প্রকল্পে যুক্ত চীনা প্রযুক্তিবিদ ও কর্মীদের ওপর বারবার জঙ্গি হামলার ঘটনা বেইজিংকে ইসলামাবাদের ওপর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কড়া অবস্থান নিতে বাধ্য করছে।
দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকট ও বকেয়া ঋণের বোঝা চীনের একাধিক বড় সংস্থাকে নতুন বিনিয়োগ থেকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। ফলে অন্ধ সহায়তার পুরোনো নীতি থেকে সরে এসে বেইজিং এখন বাণিজ্যিক মুনাফা ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তৃতীয় কারণ হিসেবে উঠে আসছে ভারত-চীন সম্পর্কের নতুন সমীকরণ। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘাতের তিক্ততা কাটিয়ে দুই দেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে হাঁটছে। দিল্লির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে পাকিস্তানের সব সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়া থেকে চীন এখন বিরত থাকতে চাইছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে চীন পাকিস্তানকে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিচ্ছে। ২০২৬ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সিপেক ২.০ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছেন। পাশাপাশি, ভারতের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পাকিস্তানও নিজেদের স্বার্থেই চীনকে পাশে চাইছে।
জানা গেছে, দুই দেশের মধ্যে আর্থিক লেনদেনের পুরোনো নিয়মেও পরিবর্তন আসছে। অতীতে চীন পাকিস্তানকে নিঃশর্তে অর্থনৈতিক সহায়তা ও কূটনৈতিক আশ্রয় দিয়ে এসেছে। তবে এখন থেকে নগদ সহায়তা অব্যাহত থাকলেও, তার শর্ত হিসেবে চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা ও বিনিয়োগের নিশ্চয়তা দিতে হবে বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে বেইজিং।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে চীন আর আগের মতো নিঃশর্তভাবে পাকিস্তানের পক্ষ নেবে না— ব্রিকস সম্মেলনে পহেলগাম ইস্যুতে বেইজিংয়ের সম্মতি তারই ইঙ্গিত বহন করছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি ভারতের কূটনৈতিক কৌশলের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সম্পা সুত্রধর 



















