সালমান শাহ ও শাবনূরের নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হলেই নব্বইয়ের দশকের রুপালি পর্দার এক মায়াবী সময় চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যে জুটির রসায়ন একসময় দর্শকের হৃদয় জয় করেছিল, তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও কৌতূহলের শেষ নেই। সালমানের আকস্মিক মৃত্যুর পর থেকে আজ অবধি এই প্রশ্ন ঘুরেফিরে এসেছে বারবার—তাঁদের মধ্যে কি সত্যিই প্রেমের সম্পর্ক ছিল, নাকি তা ছিল নিছক ভাইবোনের স্নেহের বন্ধন? শাবনূর নিজে বরাবরই বলে এসেছেন, সালমান তাঁকে দেখতেন ছোট বোনের চোখে। এবার সেই একই কথা জানালেন সালমানের মা নীলা চৌধুরীও।
সাম্প্রতিক সময়ে সালমান শাহ হত্যা মামলায় খল অভিনেতা ডনের গ্রেপ্তারের ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে তিন দশক আগের সেই রহস্যঘেরা প্রসঙ্গগুলো। এই গ্রেপ্তারের সূত্র ধরে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ছেলের সঙ্গে শাবনূরের সম্পর্ক নিয়ে খোলাখুলি মন্তব্য করেন নীলা চৌধুরী। তাঁর ভাষায়, শাবনূরের সঙ্গে সালমানের কোনো প্রেমের সম্পর্ক কখনো ছিল না। বরং নিজের কোনো বোন না থাকায় সালমান শাবনূরকে দেখতেন বোনের মতোই, স্নেহ করতেন আপনজনের মতো।
নীলা চৌধুরী বলেন, তাঁর ছেলের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে শাবনূর অনেক কিছুই জানতেন। তবে দুজনের মধ্যে যে সম্পর্ক ছিল, তা প্রেমের নয়, বরং নির্ভরতার। শাবনূর তখন সালমানের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল ছিলেন, আর সালমান সবসময় চেষ্টা করতেন তাঁকে সাহায্য করার। একই সঙ্গে সালমানের মা কিছুটা আক্ষেপের সুরে জানান, পরবর্তী সময়ে এই সম্পর্ককে ঘিরে নানা রঙ চড়ানো হয়েছে, বাস্তবতার সঙ্গে যার মিল নেই। তাঁর মতে, প্রিয়জনের প্রতি যে ধরনের মমতা ও গভীরতা থাকে, সালমানের অনুভূতি ছিল ঠিক সে রকম—প্রেমিকার প্রতি প্রেমিকের যে টান, তেমনটা নয়।
শাবনূর নিজেও বহুবার এই বিষয়ে মুখ খুলেছেন, আর তাঁর বক্তব্য সবসময় একই সুরে বাঁধা। সালমানকে তিনি কখনো প্রেমিক হিসেবে দেখেননি, বরং শ্রদ্ধা করেছেন আপন ভাইয়ের মতো। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, সালমান তাঁকে আদর করে ডাকতেন ‘পিচ্চি’ বলে। শুধু সালমানের সঙ্গেই নয়, তাঁর পুরো পরিবারের সঙ্গেই শাবনূরের গড়ে উঠেছিল আন্তরিক এক সম্পর্ক, যেখানে সালমানের বাবা-মাও তাঁকে দেখতেন পরিবারেরই একজন হিসেবে।
শাবনূর একাধিকবার স্পষ্ট করে বলেছেন, সালমানের মৃত্যুর পর একশ্রেণির মানুষ তাঁদের সম্পর্ককে পুঁজি করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করেছে। কিছু মহল রটনা ছড়িয়ে আনন্দ পাওয়ার চেষ্টা করেছে, অথচ বাস্তবে তাঁদের সম্পর্কের ভিত্তি ছিল নিখাদ শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসের ওপর। শাবনূরের ভাষায়, নিজের ক্যারিয়ার তিনি গড়ে তুলেছেন অক্লান্ত পরিশ্রম আর নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে, তিল তিল করে। সেই অর্জনকে ঘিরে ছড়ানো মিথ্যা গুঞ্জন তাঁকে দীর্ঘদিন পীড়া দিয়েছে।
তবে সালমান আর শাবনূরের গল্পটা শুধু বিতর্কের নয়, বরং তার চেয়ে অনেক বেশি রঙিন ছিল তাঁদের পর্দার রসায়ন আর কর্মজীবনের বন্ধুত্ব। ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবি দিয়ে চলচ্চিত্রে পা রাখেন সালমান শাহ, যেখানে তাঁর বিপরীতে ছিলেন মৌসুমী। এরপর ‘তুমি আমার’ ছবির হাত ধরে শুরু হয় সালমান-শাবনূর জুটির যাত্রা, যে জুটি পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত ও জনপ্রিয় জুটি। মাত্র চার বছরের সংক্ষিপ্ত অভিনয়জীবনে সালমান মোট ২৭টি ছবিতে কাজ করেছেন, যার মধ্যে ১৪টিতেই তাঁর নায়িকা ছিলেন শাবনূর।
‘তুমি আমার’ থেকে শুরু করে ‘সুজন সখী’, ‘বিচার হবে’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘মহামিলন’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘প্রেম পিয়াসী’, ‘স্বপ্নের নায়ক’ কিংবা ‘আনন্দ অশ্রু’—একের পর এক ছবিতে এই জুটি মাতিয়ে রেখেছিল দর্শকদের। তাঁদের অভিনীত অধিকাংশ ছবিই ব্যবসায়িকভাবে দারুণ সাফল্য পেয়েছিল, আর সেই সাফল্যের মূলে ছিল দুজনের মধ্যকার অসাধারণ বোঝাপড়া। শাবনূর নিজেই বলেছেন, কাজ করতে করতেই তাঁদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল গভীর এক বন্ধুত্ব।
সালমান সম্পর্কে শাবনূরের মূল্যায়ন বরাবরই ছিল শ্রদ্ধামিশ্রিত। তাঁর ভাষায়, সালমান ছিলেন উদার মনের মানুষ, বয়সে বড় সবাইকে যথাযথ সম্মান দিতেন, অহংকারের লেশমাত্র ছিল না তাঁর মধ্যে। সহশিল্পীদের প্রতি ছিলেন আন্তরিক, আর কাজের প্রতি ছিল প্রবল নিষ্ঠা। শাবনূরের কথায়, তাঁদের দুজনের বোঝাপড়া ছিল এতটাই গভীর যে চোখের ইশারাতেই একে অপরকে বুঝে নিতে পারতেন।
শুধু সালমানের সঙ্গেই নয়, তাঁর স্ত্রী সামিরার সঙ্গেও শাবনূরের গড়ে উঠেছিল অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব। শুটিংয়ের সময় সামিরা প্রায়ই তাঁদের সঙ্গী হতেন, আর একসঙ্গে ঘোরাঘুরি, খাওয়াদাওয়া আর আড্ডায় কেটে যেত সময়। এভাবেই ধীরে ধীরে দুই পরিবারের মধ্যে তৈরি হয়েছিল এক আন্তরিক সম্পর্ক। শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে চলত আনন্দ-আড্ডা, যার স্মৃতি আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে শাবনূরের মনে। কক্সবাজারে শুটিংয়ের সময় রাতে সমুদ্রপাড়ে আয়োজন করা হতো ক্যান্ডেল লাইট নৈশভোজের, যেখানে দুই পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও উপস্থিত থাকতেন সহশিল্পী ও পরিচালকেরাও।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় নিজ বাসভবনে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় সালমান শাহর। এই মৃত্যুরহস্য আজও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি, আর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও এই প্রসঙ্গ ঘিরে আগ্রহ এতটুকু কমেনি। সালমানের ব্যক্তিজীবন, তাঁর মৃত্যু এবং সহশিল্পীদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সময়ে সময়ে নানা তথ্য উঠে এসেছে জনসমক্ষে। এসবের মধ্যে সালমান-শাবনূরের সম্পর্কের প্রশ্নটি বারবার ফিরে এসেছে আলোচনায়। শাবনূর যেখানে শুরু থেকেই তাঁদের বন্ধনকে ভাইবোনের সম্পর্ক বলে দাবি করে এসেছেন, সেখানে এবার সালমানের মায়ের মুখেও উঠে এল একই সত্য—ছেলের সঙ্গে শাবনূরের মধ্যে কখনোই প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















