রাজধানীর বাস টার্মিনাল স্থানান্তর: নির্দেশনার পরও থমকে আছে বাস্তবায়ন।
ঢাকা শহরের যানজট সমস্যা সমাধানে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত এখনো কার্যকর হয়নি বললেই চলে। রাজধানীর ভেতরে থাকা চারটি প্রধান আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বেশ কয়েক মাস আগে, কিন্তু বাস্তবে সেই পরিকল্পনার অগ্রগতি অত্যন্ত ধীরগতির।
যানজটের নগরী ঢাকা
রাজধানীতে বসবাসকারী মানুষের কাছে যানজট এখন নিত্যদিনের এক বাস্তবতা। শুধু চারটি নির্ধারিত আন্তঃজেলা টার্মিনালই নয়, রাস্তার ওপর গড়ে ওঠা অসংখ্য অনানুষ্ঠানিক বাস স্টপেজও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। নটর ডেম কলেজের বিপরীত পাশের সড়ক, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কাছাকাছি একটি পরিবহন সংস্থার নির্ধারিত স্টপেজ, শ্যামলী, কল্যাণপুর ও আসাদগেট এলাকা, এমনকি ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দোলাইরপাড় চৌরাস্তা—সবখানেই দেখা যায় একই চিত্র। এসব জায়গায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যানবাহনের দীর্ঘ সারি লেগেই থাকে।
নগর পরিবহনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও নাজুক। নির্দিষ্ট কোনো স্টপেজ ছাড়াই যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো এখন স্বাভাবিক দৃশ্য। বিশেষ করে মালিবাগ থেকে রামপুরা হয়ে কুড়িল পর্যন্ত সড়কে নির্দিষ্ট বাস স্টপেজের কোনো বালাই নেই। যাত্রী দেখলেই বাস থামে, আবার ইচ্ছেমতো জায়গায় নেমেও পড়েন যাত্রীরা। এই বিশৃঙ্খল চিত্রই মূলত ঢাকাকে যানজটের শহরে পরিণত করেছে।
সরকারের সিদ্ধান্ত এবং পরিকল্পনা
গত জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সরকারপ্রধান রাজধানীর যানজট নিরসন ও পরিবহন ব্যবস্থা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে চারটি আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল দ্রুত শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। এই চারটি টার্মিনাল হলো ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান, গাবতলী, মহাখালী এবং সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গুলিস্তান এলাকার ফুলবাড়িয়া টার্মিনালটি স্থানান্তরিত হবে কেরানীগঞ্জে। মহাখালী টার্মিনাল অস্থায়ীভাবে পূর্বাচলে সরিয়ে নেওয়ার পর স্থায়ীভাবে তা টঙ্গীর কাছাকাছি এলাকায় প্রতিষ্ঠা করার কথা রয়েছে। গাবতলী টার্মিনালের নতুন ঠিকানা হবে হেমায়েতপুর, আর সায়েদাবাদ টার্মিনাল যাবে কাঁচপুরে।
বাস্তবায়নে ধীরগতি কেন
তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল ছাড়া বাকি তিনটি টার্মিনাল আপাতত শহর থেকে সরছে না। এর পরিবর্তে সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী টার্মিনাল থেকে আলাদাভাবে বাস ডিপো স্থাপনের কাজ চলছে। এজন্য প্রাথমিকভাবে পূর্বাচল, নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ এলাকাকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—সরকারপ্রধানের সুস্পষ্ট নির্দেশনার পরও কেন টার্মিনালগুলো সরানো যাচ্ছে না। এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন, সেতু, নৌপরিবহন ও রেলপথ বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ঢাকার বাইরে সরিয়ে নিতে দুই থেকে আড়াই বছরের মতো সময় লাগতে পারে। সচিবালয়ের গণমাধ্যম কেন্দ্রে সাংবাদিকদের এক সংগঠনের আয়োজিত একটি সংলাপ অনুষ্ঠানে তিনি এ বক্তব্য দেন।
মন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সরকারপ্রধানের নির্দেশনা এখনই বাস্তবায়িত হচ্ছে না। অর্থাৎ আগামী আড়াই বছরেও রাজধানীর যানজট পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম।
মহাখালীর বাস্তব চিত্র
ইতিমধ্যে মহাখালী টার্মিনাল থেকে কিছু বাস পূর্বাচলে পাঠানো হলেও চালকদের মধ্যে সেখানে যাওয়ার আগ্রহ কম দেখা যাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, নতুন এলাকায় খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই, গাড়ি মেরামতের জন্য দক্ষ মিস্ত্রি পাওয়া যায় না, এমনকি গাড়ি ধোয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানি সরবরাহও নিশ্চিত নয়।
মূলত মহাখালী টার্মিনালটি এখন কার্যত একটি বাস ডিপোতে পরিণত হয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে আসা বাসগুলো এখানে বিরতি নেয় এবং রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও রং করার কাজও এখানেই সম্পন্ন হয়। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে টার্মিনালের ভেতরে জায়গার সংকুলান হয় না, ফলে যাত্রী ওঠানামার কাজ চলে যায় ব্যস্ততম সড়কে।
এ প্রসঙ্গে রাজধানীর একটি পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জানান, টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তরিত হবে এটি নিশ্চিত এবং এ লক্ষ্যে উপযুক্ত স্থান নির্ধারণের কাজ চলমান রয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, হঠাৎ করে দূরের কোনো জেলার যাত্রীকে শহরের বাইরের একটি প্রান্তে নামিয়ে দিলে তার পক্ষে শহরে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এ কারণেই একটি পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন টার্মিনাল গড়ে তোলার পরই স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
চাঁদাবাজির পুরনো অভিযোগ
গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দেশের সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় সংগঠনের অধীনে সারাদেশে ২৫৩টি ইউনিয়ন রয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে এই সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ ছিল একজন প্রভাবশালী নেতার হাতে, যার নেতৃত্বে সারাদেশের এই ইউনিয়নগুলো থেকে উচ্চহারে চাঁদা আদায় করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই সংগঠনের দায়িত্ব নতুন নেতৃত্বের হাতে যায়, যারা দায়িত্ব নেওয়ার পর অতিরিক্ত চাঁদা আদায় বন্ধ করে দেন। বর্তমানে শুধু সংগঠন পরিচালনার প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে সমঝোতার ভিত্তিতে সামান্য পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয় বলে জানা গেছে।
এছাড়া দেশের পরিবহন মালিক ও ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান সংশ্লিষ্ট একাধিক সংগঠন পৃথকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে, যাদের প্রতিটি জেলাতেই আলাদা শাখা সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠনও নির্দিষ্ট হারে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে।
এ প্রসঙ্গে পরিবহন মালিক সমিতির ওই নেতা দাবি করেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মালিকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের কোনো অভিযোগ নেই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোম্পানির অধীনে পরিচালিত গাড়িগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অফিস ব্যবস্থাপনা ও কর্মী বেতনের খরচ মালিকরা নিজেরাই বহন করেন, যাকে অনেকে ভুলভাবে চাঁদাবাজি বলে ব্যাখ্যা করেন।
বিশেষজ্ঞের পর্যবেক্ষণ
একজন পরিবহন বিশেষজ্ঞ বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, একটি টার্মিনালের মূল কাজ হওয়া উচিত বাস আসা-যাওয়া ও যাত্রী পরিবহনের সুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে এসব টার্মিনাল ক্রমেই ডিপোতে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, শহরের বাইরে টার্মিনাল স্থানান্তরের পরও যেন একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, অর্থাৎ নতুন টার্মিনালও যেন ডিপোতে পরিণত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন।
সামনের পথ
সব মিলিয়ে রাজধানীর যানজট নিরসনে নেওয়া এই উদ্যোগ কাগজে-কলমে যতটা এগিয়েছে, বাস্তবে ততটা অগ্রগতি হয়নি। নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে গেলেও চারটি টার্মিনালের মধ্যে মাত্র একটির স্থানান্তর প্রক্রিয়া কার্যত শুরু হয়েছে। বাকিগুলোর ক্ষেত্রে আপাতত ডিপো আলাদা করার মধ্য দিয়ে সাময়িক সমাধানের চেষ্টা চলছে। বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে টার্মিনাল স্থানান্তর করলে তা কার্যকর ফল বয়ে আনবে না। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে অবকাঠামো তৈরি করে তারপর স্থানান্তর সম্পন্ন করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ততদিন পর্যন্ত রাজধানীবাসীকে যানজটের এই দুর্ভোগ সয়েই চলতে হবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।
এস কে চন্দন (স্টাফ রিপোর্টার) 



















