রংপুরে ঘুমন্ত শহরে থমকে গেল একটি পরিবারের চার প্রাণ। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী ও ছেলে আয়ুশ—চারজনের নিথর দেহ মিলল নিজেদেরই নির্মাণাধীন বাড়িতে, একেকজন একেক তলায়, একেক কোণে। খুনের কারণ কী, কারা এই নৃশংসতার পেছনে—এখনো অন্ধকারেই রংপুর পুলিশ।
শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে লাশগুলো উদ্ধার হয় রংপুর নগরের কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে, জাহাজ কোম্পানি মোড় থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পূর্বে। ততক্ষণে লাশ পচে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা ভবনে। মরদেহ চারটি পাঠানো হয়েছে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে।
নিহত আগামী চক্রবর্তী রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন। ছোট ভাই আয়ুশ পড়ত রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে। রংপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কে এম নাজমুল কাদের জানিয়েছেন, ঘটনার পর এখনো কোনো মামলা দায়ের হয়নি।
রংপুর সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী বলছেন, তদন্তকারীদের সামনে একাধিক সম্ভাবনা খোলা। হয়তো ঘাতকেরা দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতরেই ছিল, নাকি ডাকাতি করতে গিয়ে খুনে জড়িয়ে পড়েছে দুর্বৃত্তরা—নিশ্চিত করে বলার মতো প্রমাণ এখনো হাতে আসেনি। তদন্ত দল বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে।
নিহত প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ২৬ মিনিটে বোন ও ভাগনি আগামীর সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয় তাঁর, প্রায় দশ মিনিট। এরপর তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। রাত পৌনে তিনটার দিকে বোনের মুঠোফোন থেকে আবার কল আসে, কিন্তু ধরা হয়নি সেই ফোন। শুক্রবার সারাদিন আর কথা হয়নি কারও সঙ্গে।
শনিবার বিকেল থেকে বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগনির ফোনে একটানা চেষ্টা করেও সাড়া না পেয়ে সন্দেহ জাগে পূজার মনে। রাত পৌনে ৯টার দিকে ছুটে যান বোনের বাসায়। মূল ফটকে তালা ঝুলছিল, বেল বাজিয়েও সাড়া মেলেনি। পাশের বাড়ি দিয়ে গিয়ে জানালার কাছে পৌঁছে ভেতরের দৃশ্য দেখে আঁতকে ওঠেন তিনি—ঘরের জিনিসপত্র তছনছ। খবর দেন পুলিশে।
কান্নাভেজা কণ্ঠে পূজা চক্রবর্তী বলেন, ‘কে মারল আমার দিদি, দাদা ও আদরের দুই সন্তানকে? তারা তো কোনো অপরাধ করেনি। তাদের কোনো শত্রু নেই। এটা কোন দেশ? কোথায় বাস করছি আমরা? বাড়িতেও নিরাপত্তা নেই।’
পুলিশ পাশের ভবন দিয়ে ঢুকে দেখে, আলমারি-ড্রয়ার খোলা, কাপড়চোপড় ছড়ানো মেঝে ও বিছানায়। প্রথমে খাটের ফাঁকে মেলে আয়ুশের লাশ, গলায় প্যাঁচানো কাপড়। সিঁড়িতে পাওয়া যায় মা প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামীর দেহ, গলায় দড়ির ফাঁস। তৃতীয় তলার ছাদে মেলে গণপতির লাশ, গলায় গামছা প্যাঁচানো।
সুমিত চৌধুরী জানান, চারজনেরই মুখ কিছুটা ঝলসানো ছিল, ধারণা করা হচ্ছে রাসায়নিক জাতীয় পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে মুখে। শ্বাসরোধেই মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা তদন্তকারীদের। ঘরের টেলিভিশন, ল্যাপটপ, মুঠোফোন কিছুই নেয়নি দুর্বৃত্তরা। আলমারি-ড্রয়ার ভাঙা হয়নি, চাবি দিয়েই খোলা হয়েছে বলে মনে করছে পুলিশ। ঘরে মিলেছে বেশ কিছু চাবির গোছাও। টাকাপয়সা বা গয়না খোয়া গেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
জনবহুল এলাকা হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবেশীদের কেউ কিছু টের পাননি। পাশের বাড়ির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হিমাংশু রায় বলেন, ঘটনার আঁচও পাননি তিনি। প্রতিবেশী নমিতা রানী বলেন, গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের আচরণ ছিল অত্যন্ত ভালো, কারও সঙ্গে বিরোধের কথা কখনো শোনেননি। বৃহস্পতিবার বিকেলেই আয়ুশকে মাঠে খেলতে দেখেছিলেন তিনি, সন্ধ্যার আগে হাঁটতে দেখেছিলেন গণপতি ও তাঁর স্ত্রীকে।
আগামীর সহপাঠী মাহবুবা আক্তার ঘটনাস্থলে ছুটে এসে বিহ্বল কণ্ঠে বলেন, মিশুক ও ভালো মেয়ে ছিলেন আগামী। এই পরিবারকে কেন বা কারা এভাবে হত্যা করতে পারে, তা বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি।
রংপুর সিআইডির পরিদর্শক আবু হাসান কবিরের ভাষায়, ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এত জনবহুল এলাকায় একটি বাড়িতে চারজনকে হত্যা করে চলে গেল ঘাতকেরা, অথচ আশপাশের কেউ কিছুই বুঝতে পারলেন না—এটাই সবচেয়ে বিস্ময়ের।
পুলিশের ধারণা, বৃহস্পতিবার গভীর রাতেই ঘটেছে এই নৃশংস ঘটনা।
গণপতি চক্রবর্তীর গ্রামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। চার ভাইয়ের মধ্যে দুজন আগেই মারা গেছেন, বেঁচে থাকা ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী অসুস্থ, থাকেন গ্রামেই। গোপীনাথের জামাতা বিশ্বজিৎ রায় জানান, ২০১০ সালে মাছুয়াপাড়ায় ছয় শতাংশ জমি কেনেন গণপতি, তিন বছর আগে শুরু হয় তিনতলা বাড়ি নির্মাণের কাজ। অবসর জীবনে হোমিও চিকিৎসা দিতেন তিনি। এমন একজন নিরীহ মানুষ ও তাঁর পরিবারকে কেউ এভাবে শেষ করে দিতে পারে—তা মানতেই পারছেন না বিশ্বজিৎ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















