শিরোনাম :
অপারেশন ক্লিন হার্টের মতো বিশেষ অভিযানের পরিকল্পনা নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কুড়িগ্রামে ছেলের ছুরিকাঘাতে মা নিহত, বাবা গুরুতর আহত, ছেলে আটক ষড়যন্ত্রে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে: রিজভী ধর্মীয় সম্প্রদায় ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় কমিটি চান রাষ্ট্রপতি সৌদিগামী ৮৬ ফ্লাইট বাতিল-স্থগিত, বিপাকে ১৩ হাজার ৪৯০ যাত্রী ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে পাঁচজন ও হামের উপসর্গ নিয়ে সাত শিশুর মৃত্যু বাংলাদেশের ছাত্ররা আমাদের পথ দেখিয়েছে : নেহা বোরা চার ঘণ্টা পর টঙ্গীর ওষুধ কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মাদকের ভয়াবহ থাবা থেকে রক্ষা করতে হবে: রাষ্ট্রপতি সালাহউদ্দিন আহমেদের জানাজায় অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী

সুনাই নদীর নৌকাবাইচ নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি ‘তৌহিদী জনতার’

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সুনাই নদীতে আগামী ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। কিন্তু সেই আয়োজনকে ঘিরেই এখন তৈরি হয়েছে বিতর্কের ঢেউ। কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, ‘তৌহিদী জনতা’ নামের একটি পক্ষ এই প্রতিযোগিতা বন্ধের দাবি তুলেছে। সংবাদ প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। প্রশ্ন ওঠে, আসলে কারা এই দাবির পেছনে, আর কী তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য। তবে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে এখন পর্যন্ত সামনে আসেননি খুব বেশি মানুষ।

আলোচনার সূত্রপাত ঘটে গত ১৮ আগস্ট রাতে। মাসুম বিন নুর উদ্দিন নামের এক যুবক রাত সাতটা ঊনত্রিশ মিনিটে নিজের ফেসবুক পাতায় একটি পোস্টার প্রকাশ করেন, যেখানে লেখা ছিল ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’। মিনিট চল্লিশেক পরই তিনি পোস্টটি সম্পাদনা করে যুক্ত করেন আরেকটি পোস্টার—‘সুনাই নদীতে আগত নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভা’ শীর্ষক আহ্বান, যেখানে ঈমানি দায়িত্ববোধের কথা বলে সবাইকে উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। পরে অবশ্য নুর উদ্দিন পোস্টারটি সরিয়ে ফেলেন। তার ভাষ্য, আয়োজকদের অনুরোধেই তিনি পোস্টারটি তৈরি করেছিলেন। শনিবার বিকেলে ফোনে তিনি বলেন, ‘ওটা ভুল করে লিখেছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে নৌকাবাইচ বন্ধ চাই, তবে এর সঙ্গে ধর্মীয় কোনো সম্পর্ক নেই। নদী ভাঙন ঠেকাতেই এ কথা বলেছি।’

২০ আগস্ট বারিগ্রাম বাজার মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় সেই পরামর্শ সভা। সভা শেষে ‘মুক্ত বাতাস’ নামের একটি ফেসবুক পাতায় একটি ভিডিও প্রকাশ করেন নুর উদ্দিন নিজেই, যে পাতাটি তিনিই মূলত পরিচালনা করেন। ভিডিওতে স্থানীয় আলেম ও মুরব্বিদের বক্তব্য উঠে আসে, যার অধিকাংশ জুড়েই ছিল নদীভাঙন ও ফসল রক্ষার প্রসঙ্গ। কয়েক জায়গায় ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির উল্লেখ থাকলেও নৌকাবাইচকে সরাসরি ধর্মবিরোধী বলা হয়নি। বরং অভিযোগ তোলা হয়, এই আয়োজনকে ঘিরে জুয়ার আসর বসে, যা হারাম। এক আলেমকে ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, এলাকার পরিবেশ ও ধর্মীয় অবস্থান সুন্দর রাখতে, বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে এবং নদীভাঙন রোধ করতে এই আয়োজন বন্ধ করা প্রয়োজন। আরেকজন মুরব্বি স্মরণ করিয়ে দেন অতীতের দুর্ঘটনার কথা—নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে একসময় প্রাণ হারিয়েছিলেন একজন পুরুষ ও একজন নারী, হয়েছিল মারামারিও। নদীর দুই পাড়ে থাকা ধানখেতের ক্ষতির আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তবে এই দাবিকে ধর্মীয় বিষয় বলে মানতে নারাজ প্রবীণ আলেম মাওলানা নুরুর রহমান মাসুক। তিনি জানান, এটি সম্পূর্ণভাবে সামাজিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি বিষয়। ‘তৌহিদী জনতা’ বা নাগরিক সমাজের নামে কারা ব্যানার তৈরি করেছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন তিনিও। তবে সচেতন বাসিন্দাদের মূল দাবি একটাই—এই অঞ্চলে আর নৌকাবাইচের আয়োজন না হওয়া। তিনি স্মরণ করেন, অতীতে প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অনেকে আহত হয়েছেন, এমনকি হাত-পা ভাঙার ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি নৌকাবাইচ-সংলগ্ন এলাকায় গানের আসরকে কেন্দ্র করে ঘটেছে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও। ফলে বড় পরিসরের এই আয়োজন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।

তবে সবাই এই দাবির সঙ্গে একমত নন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা কালবেলাকে জানান, নৌকাবাইচে নদীর কোনো ক্ষতি হবে না, বরং জুয়ার আসর ঠেকানো প্রশাসনের দায়িত্ব। তাদের ভাষ্য, ‘মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা যায় না’—ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজন বন্ধের পেছনে ষড়যন্ত্র চলছে বলেই তাদের ধারণা।

এভাবেই একদিকে নদীভাঙন ও কৃষিজমি রক্ষার যুক্তি, অন্যদিকে ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার আকুতি—দুই পক্ষের টানাপোড়েনে সুনাই নদীর পাড়ে অনিশ্চয়তায় ঝুলে আছে বহু বছরের চেনা এক উৎসব। ২৮ আগস্ট নৌকাবাইচ শেষ পর্যন্ত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

অপারেশন ক্লিন হার্টের মতো বিশেষ অভিযানের পরিকল্পনা নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

সালাহউদ্দিন আহমেদের জানাজায় অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী

১৪ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

সুনাই নদীর নৌকাবাইচ নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি ‘তৌহিদী জনতার’

আপডেট সময় ০৮:০৮:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সুনাই নদীতে আগামী ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। কিন্তু সেই আয়োজনকে ঘিরেই এখন তৈরি হয়েছে বিতর্কের ঢেউ। কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, ‘তৌহিদী জনতা’ নামের একটি পক্ষ এই প্রতিযোগিতা বন্ধের দাবি তুলেছে। সংবাদ প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। প্রশ্ন ওঠে, আসলে কারা এই দাবির পেছনে, আর কী তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য। তবে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে এখন পর্যন্ত সামনে আসেননি খুব বেশি মানুষ।

আলোচনার সূত্রপাত ঘটে গত ১৮ আগস্ট রাতে। মাসুম বিন নুর উদ্দিন নামের এক যুবক রাত সাতটা ঊনত্রিশ মিনিটে নিজের ফেসবুক পাতায় একটি পোস্টার প্রকাশ করেন, যেখানে লেখা ছিল ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’। মিনিট চল্লিশেক পরই তিনি পোস্টটি সম্পাদনা করে যুক্ত করেন আরেকটি পোস্টার—‘সুনাই নদীতে আগত নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভা’ শীর্ষক আহ্বান, যেখানে ঈমানি দায়িত্ববোধের কথা বলে সবাইকে উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। পরে অবশ্য নুর উদ্দিন পোস্টারটি সরিয়ে ফেলেন। তার ভাষ্য, আয়োজকদের অনুরোধেই তিনি পোস্টারটি তৈরি করেছিলেন। শনিবার বিকেলে ফোনে তিনি বলেন, ‘ওটা ভুল করে লিখেছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে নৌকাবাইচ বন্ধ চাই, তবে এর সঙ্গে ধর্মীয় কোনো সম্পর্ক নেই। নদী ভাঙন ঠেকাতেই এ কথা বলেছি।’

২০ আগস্ট বারিগ্রাম বাজার মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় সেই পরামর্শ সভা। সভা শেষে ‘মুক্ত বাতাস’ নামের একটি ফেসবুক পাতায় একটি ভিডিও প্রকাশ করেন নুর উদ্দিন নিজেই, যে পাতাটি তিনিই মূলত পরিচালনা করেন। ভিডিওতে স্থানীয় আলেম ও মুরব্বিদের বক্তব্য উঠে আসে, যার অধিকাংশ জুড়েই ছিল নদীভাঙন ও ফসল রক্ষার প্রসঙ্গ। কয়েক জায়গায় ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির উল্লেখ থাকলেও নৌকাবাইচকে সরাসরি ধর্মবিরোধী বলা হয়নি। বরং অভিযোগ তোলা হয়, এই আয়োজনকে ঘিরে জুয়ার আসর বসে, যা হারাম। এক আলেমকে ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, এলাকার পরিবেশ ও ধর্মীয় অবস্থান সুন্দর রাখতে, বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে এবং নদীভাঙন রোধ করতে এই আয়োজন বন্ধ করা প্রয়োজন। আরেকজন মুরব্বি স্মরণ করিয়ে দেন অতীতের দুর্ঘটনার কথা—নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে একসময় প্রাণ হারিয়েছিলেন একজন পুরুষ ও একজন নারী, হয়েছিল মারামারিও। নদীর দুই পাড়ে থাকা ধানখেতের ক্ষতির আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তবে এই দাবিকে ধর্মীয় বিষয় বলে মানতে নারাজ প্রবীণ আলেম মাওলানা নুরুর রহমান মাসুক। তিনি জানান, এটি সম্পূর্ণভাবে সামাজিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি বিষয়। ‘তৌহিদী জনতা’ বা নাগরিক সমাজের নামে কারা ব্যানার তৈরি করেছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন তিনিও। তবে সচেতন বাসিন্দাদের মূল দাবি একটাই—এই অঞ্চলে আর নৌকাবাইচের আয়োজন না হওয়া। তিনি স্মরণ করেন, অতীতে প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অনেকে আহত হয়েছেন, এমনকি হাত-পা ভাঙার ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি নৌকাবাইচ-সংলগ্ন এলাকায় গানের আসরকে কেন্দ্র করে ঘটেছে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও। ফলে বড় পরিসরের এই আয়োজন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।

তবে সবাই এই দাবির সঙ্গে একমত নন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা কালবেলাকে জানান, নৌকাবাইচে নদীর কোনো ক্ষতি হবে না, বরং জুয়ার আসর ঠেকানো প্রশাসনের দায়িত্ব। তাদের ভাষ্য, ‘মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা যায় না’—ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজন বন্ধের পেছনে ষড়যন্ত্র চলছে বলেই তাদের ধারণা।

এভাবেই একদিকে নদীভাঙন ও কৃষিজমি রক্ষার যুক্তি, অন্যদিকে ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার আকুতি—দুই পক্ষের টানাপোড়েনে সুনাই নদীর পাড়ে অনিশ্চয়তায় ঝুলে আছে বহু বছরের চেনা এক উৎসব। ২৮ আগস্ট নৌকাবাইচ শেষ পর্যন্ত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

Share this news as a Photo Card