শিরোনাম :
শাহজাদপুরে মাদক ব্যবসার অভিযোগে নারীর বাড়িতে ভাঙচুর, আইন নিজের হাতে না নেওয়ার আহ্বান পুলিশের ‘জুলাই চেতনা’ নিয়ে ব্যবসা কাম্য নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নতুন নেতৃত্বে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি: সভাপতি শিবা শানু, সাধারণ সম্পাদক জয় চৌধুরী লেভেল ক্রসিংয়ে মৃত্যুফাঁদ: প্রযুক্তি ও অব্যবস্থাপনার গোলকধাঁধায় রেলওয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’: ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৫০ সদস্যের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: ভারতের নজরদারি? সুখরঞ্জন বালি গুমের মামলা: গ্রেপ্তার সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ছেলেকে পাশে রেখে আমিরের ঘোষণা, ‘রোববার বিয়ে করছি’ ‘বাংলা কিউআর’-এর ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ক্যাশলেস অর্থনীতির চিত্র এলপিজির দাম কমল ৩৫৭ টাকা,১২ কেজির নতুন দাম হয়েছে ১ হাজার ৫২৮ টাকা।

নিয়মিত ‘গবেষণা’ দেখিয়ে লাখ টাকা সম্মানী নিচ্ছেন বিটিআরসির কর্মকর্তারা

জাতীয় টেলিযোগাযোগ নীতিমালা প্রণয়ন এবং এ–সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তবে সেই দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে সম্পন্ন একটি নীতিমালা প্রণয়ন কার্যক্রমকে ‘গবেষণা’ হিসেবে দেখিয়ে কমিশনের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সম্মানী দেওয়ার অভিযোগ নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নথি ও দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং পলিসি’ প্রণয়নের কাজকে গবেষণা প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সেই প্রকল্পে যুক্ত কর্মকর্তাদের জন্য ১৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিটিআরসির সর্বশেষ কমিশন সভায় অনুমোদনও পেয়েছে।

এদিকে একই নীতিমালার বাস্তবায়নের জন্য গাইডলাইন বা পথনকশা তৈরির কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য আরও ১২ লাখ ২৫ হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অর্থ ছাড়ের বিষয়টি বর্তমানে যাচাই–বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।

কীভাবে শুরু হলো পুরো প্রক্রিয়া?

কমিশনের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর দেশের টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর লক্ষ্যে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের দুজন প্রতিনিধি থাকলেও বাকি সদস্যরা ছিলেন বিটিআরসির বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা।

কমিটির দায়িত্ব ছিল নতুন নীতিমালার ধারণাপত্র তৈরি এবং সরকারের জন্য একটি সুপারিশমালা বা রোডম্যাপ প্রস্তুত করা। প্রাথমিক কাজ শেষ হওয়ার পর সেই কার্যক্রমকে গবেষণা হিসেবে উপস্থাপন করে একটি পৃথক গবেষণা প্রস্তাব কমিশনে জমা দেওয়া হয়। এরপর গবেষণা সম্পন্ন করার জন্য প্রায় ২৯ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন করা হয়।

সম্মানীর কাঠামো কী?

নথিপত্রে দেখা যায়, গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য তিন ধাপে সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গবেষক হিসেবে মূল সম্মানী, সভার সম্মানী, কর্মশালার সম্মানী এবং বিশেষ দায়িত্ব পালনের সম্মানী।

উদাহরণ হিসেবে, গবেষণা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী বিটিআরসি কমিশনার ইকবাল আহমেদের জন্য মোট ২ লাখ ১৭ হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গবেষক হিসেবে মূল সম্মানী ৫০ হাজার টাকা, ১৩টি সভার জন্য ৬৫ হাজার টাকা, দুটি কর্মশালার আটটি অধিবেশনের জন্য ৩২ হাজার টাকা এবং বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্য আরও ৭০ হাজার টাকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এ ছাড়া নীতিমালা প্রণয়নের সময় বাইরের ১৩ জন বিশেষজ্ঞকে আলোচনায় যুক্ত করা হয়। তিনটি সভায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রত্যেক বিশেষজ্ঞকে ১৫ হাজার টাকা করে সম্মানী দেওয়া হয়েছে।

কর্মশালার অধিবেশন নিয়েও প্রশ্ন

নথিতে আরও দেখা যায়, মাত্র দুটি কর্মশালাকে মোট আটটি পৃথক অধিবেশনে ভাগ করা হয়েছে এবং প্রতিটি অধিবেশনের জন্য আলাদা সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, একটি কর্মশালাকে একাধিক অধিবেশনে ভাগ করে সম্মানী নির্ধারণের যৌক্তিকতা স্পষ্ট নয় এবং এটি সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এটি কি গবেষণা, নাকি নিয়মিত দায়িত্ব?

বিতর্কের মূল জায়গা এখানেই।

বিটিআরসির চাকরি প্রবিধানমালায় বিশেষ গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজের জন্য সম্মানী দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু টেলিযোগাযোগ নীতিমালা প্রণয়ন, যা কমিশনের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ, সেটিকে বিশেষ গবেষণা হিসেবে গণ্য করা যাবে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

নীতিমালা প্রণয়নে যুক্ত এক স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটিকে গবেষণা বলা কঠিন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সভাগুলোতে বিটিআরসি আগে থেকেই প্রস্তুত করা বিষয় উপস্থাপন করেছে এবং বিশেষজ্ঞরা মূলত সেই বিষয়গুলোর সমালোচনা ও পরামর্শ দিয়েছেন। এমনকি কমিটির সুপারিশের সঙ্গে চূড়ান্ত নীতিমালারও উল্লেখযোগ্য অমিল রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

আগের চর্চা কী ছিল?

সংশ্লিষ্ট এক সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অতীতে আন্তর্জাতিক দূরপাল্লার টেলিযোগাযোগ সেবা (আইএলডিটিএস) নীতিমালা প্রণয়নের সময়ও বিটিআরসির কর্মকর্তা ও স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞরা কাজ করেছিলেন। তবে সেটি ছিল কমিশনের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ এবং সে সময় কর্মকর্তাদের জন্য অতিরিক্ত সম্মানী বরাদ্দ করা হয়নি।

এই তথ্য সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে—একই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে এখন কেন আলাদা করে গবেষণা প্রকল্প ও সম্মানীর ব্যবস্থা করা হলো?

চেয়ারম্যানের ব্যাখ্যা

বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী অবশ্য এ সমালোচনার সঙ্গে একমত নন।

তাঁর বক্তব্য, এটি কমিশনের রুটিন কাজ নয়; বরং একটি কৌশলগত নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম। তিনি বলেন, শুধু বিটিআরসির কর্মকর্তাদের নয়, শিল্পখাত, একাডেমিয়া এবং অন্যান্য অংশীজনদের সম্পৃক্ত করেই গবেষণাভিত্তিক প্রক্রিয়ায় কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে। তাঁর দাবি, সম্মানী সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করেই দেওয়া হয়েছে।

টিআইবির কঠোর সমালোচনা

বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সভা কিংবা কর্মশালার অধিবেশনভিত্তিক ভাতা নেওয়ার সংস্কৃতি কোনো উন্নত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়।

তাঁর মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তা একই সঙ্গে গবেষক পরিচয়ে অতিরিক্ত ভাতা গ্রহণ করা, আবার সেই গবেষণার সভা ও কর্মশালার জন্যও আলাদা অর্থ নেওয়া—এসব অনৈতিক এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। তিনি বলেন, এ ধরনের চর্চা শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ অপচয় কিংবা আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করে।

টিআইবির মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক এড়াতে সভা, সেমিনার এবং গবেষণার নামে অতিরিক্ত সম্মানী প্রদানের বিষয়ে সরকারকে স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বিতর্ক?

এই ঘটনার মাধ্যমে শুধু বিটিআরসির একটি সিদ্ধান্ত নয়, বরং সরকারি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সম্মানী প্রদানের প্রচলিত সংস্কৃতিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

একদিকে বিটিআরসি বলছে, এটি ছিল একটি বিশেষ কৌশলগত গবেষণা, অন্যদিকে সমালোচকরা মনে করছেন, এটি কমিশনের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের অংশ, যা গবেষণা হিসেবে দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ।

চূড়ান্তভাবে এই ব্যয় বিধিসম্মত ছিল কি না, কিংবা সরকারি অর্থ ব্যবহারে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না—সেটি নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা ও তদারকি সংস্থার পর্যালোচনা। তবে বিষয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং জনঅর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

মূল অভিযোগ

  • বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-র নিয়মিত দায়িত্বের অংশ হিসেবে টেলিযোগাযোগ নীতিমালা প্রণয়নের কাজকে “গবেষণা” হিসেবে দেখিয়ে কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সম্মানী দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
  • প্রথম ধাপে ১৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা ছাড় করা হয়েছে।
  • দ্বিতীয় ধাপে ১২ লাখ ২৫ হাজার টাকা সম্মানী দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
  • পুরো প্রকল্পের জন্য প্রায় ২৯ লাখ টাকার বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছিল।

কী নিয়ে বিতর্ক?

  • বিটিআরসির দায়িত্বের মধ্যেই সরকারকে টেলিযোগাযোগ নীতিমালা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া অন্তর্ভুক্ত।
  • তাই সমালোচকদের প্রশ্ন, রুটিন দায়িত্ব পালনকে গবেষণা হিসেবে দেখিয়ে অতিরিক্ত সম্মানী নেওয়া কতটা যৌক্তিক?
  • আবার বিটিআরসির চাকরি প্রবিধানে বিশেষ গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজের জন্য সম্মানী দেওয়ার সুযোগও রয়েছে। বিতর্ক হচ্ছে—এই কাজটি সেই শ্রেণির মধ্যে পড়ে কি না।

সম্মানী কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে?

  • গবেষক হিসেবে মূল সম্মানী
  • সভার সম্মানী
  • কর্মশালার সম্মানী
  • বিশেষ দায়িত্বের সম্মানী

উদাহরণ হিসেবে:

  • কমিশনার ইকবাল আহমেদ-এর জন্য মোট ২ লাখ ১৭ হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে।
  • এছাড়া ১৩ জন বাইরের বিশেষজ্ঞকে তিনটি সভায় অংশ নেওয়ার জন্য জনপ্রতি ১৫ হাজার টাকা করে সম্মানী দেওয়া হয়েছে।

বিটিআরসির ব্যাখ্যা

বিটিআরসির চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারী বলেন—

  • এটি কমিশনের রুটিন কাজ নয়, বরং কৌশলগত (Strategic) কাজ।
  • শিল্পখাত, একাডেমিয়া ও অন্যান্য অংশীজনকে যুক্ত করে গবেষণার মাধ্যমে কাজটি করা হয়েছে।
  • সম্মানী সরকারি বিধিমালা অনুসারেই দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

নীতিমালা প্রণয়নে যুক্ত একাধিক স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞের বক্তব্য অনুযায়ী—

  • এটিকে প্রকৃত অর্থে গবেষণা বলা যায় কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
  • সভায় বিটিআরসি আগে থেকেই প্রস্তুত করা বিষয় উপস্থাপন করেছে; বিশেষজ্ঞরা মূলত মতামত ও সমালোচনা দিয়েছেন।

টিআইবির অবস্থান

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন—

  • সভা ও কর্মশালার নামে একাধিক ভাতা নেওয়া অযৌক্তিক।
  • সরকারি কর্মকর্তারা একই কাজের জন্য গবেষক পরিচয়ে অতিরিক্ত ভাতা নেওয়া অনৈতিক ও ক্ষমতার অপব্যবহার হতে পারে।
  • এ ধরনের চর্চা বন্ধে স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।

সারসংক্ষেপ

এ ঘটনায় দুটি ভিন্ন অবস্থান সামনে এসেছে:

  • বিটিআরসি বলছে, এটি একটি বিশেষ কৌশলগত গবেষণামূলক কাজ এবং বিধি অনুযায়ী সম্মানী দেওয়া হয়েছে।
  • সমালোচক ও টিআইবি বলছে, এটি মূলত বিটিআরসির নিয়মিত দায়িত্ব; তাই একই কাজকে গবেষণা হিসেবে দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

শাহজাদপুরে মাদক ব্যবসার অভিযোগে নারীর বাড়িতে ভাঙচুর, আইন নিজের হাতে না নেওয়ার আহ্বান পুলিশের

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

এলপিজির দাম কমল ৩৫৭ টাকা,১২ কেজির নতুন দাম হয়েছে ১ হাজার ৫২৮ টাকা।

০২ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

নিয়মিত ‘গবেষণা’ দেখিয়ে লাখ টাকা সম্মানী নিচ্ছেন বিটিআরসির কর্মকর্তারা

আপডেট সময় ০৩:৫৫:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬

জাতীয় টেলিযোগাযোগ নীতিমালা প্রণয়ন এবং এ–সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তবে সেই দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে সম্পন্ন একটি নীতিমালা প্রণয়ন কার্যক্রমকে ‘গবেষণা’ হিসেবে দেখিয়ে কমিশনের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সম্মানী দেওয়ার অভিযোগ নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নথি ও দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং পলিসি’ প্রণয়নের কাজকে গবেষণা প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সেই প্রকল্পে যুক্ত কর্মকর্তাদের জন্য ১৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিটিআরসির সর্বশেষ কমিশন সভায় অনুমোদনও পেয়েছে।

এদিকে একই নীতিমালার বাস্তবায়নের জন্য গাইডলাইন বা পথনকশা তৈরির কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য আরও ১২ লাখ ২৫ হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অর্থ ছাড়ের বিষয়টি বর্তমানে যাচাই–বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।

কীভাবে শুরু হলো পুরো প্রক্রিয়া?

কমিশনের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর দেশের টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর লক্ষ্যে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের দুজন প্রতিনিধি থাকলেও বাকি সদস্যরা ছিলেন বিটিআরসির বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা।

কমিটির দায়িত্ব ছিল নতুন নীতিমালার ধারণাপত্র তৈরি এবং সরকারের জন্য একটি সুপারিশমালা বা রোডম্যাপ প্রস্তুত করা। প্রাথমিক কাজ শেষ হওয়ার পর সেই কার্যক্রমকে গবেষণা হিসেবে উপস্থাপন করে একটি পৃথক গবেষণা প্রস্তাব কমিশনে জমা দেওয়া হয়। এরপর গবেষণা সম্পন্ন করার জন্য প্রায় ২৯ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন করা হয়।

সম্মানীর কাঠামো কী?

নথিপত্রে দেখা যায়, গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য তিন ধাপে সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গবেষক হিসেবে মূল সম্মানী, সভার সম্মানী, কর্মশালার সম্মানী এবং বিশেষ দায়িত্ব পালনের সম্মানী।

উদাহরণ হিসেবে, গবেষণা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী বিটিআরসি কমিশনার ইকবাল আহমেদের জন্য মোট ২ লাখ ১৭ হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গবেষক হিসেবে মূল সম্মানী ৫০ হাজার টাকা, ১৩টি সভার জন্য ৬৫ হাজার টাকা, দুটি কর্মশালার আটটি অধিবেশনের জন্য ৩২ হাজার টাকা এবং বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্য আরও ৭০ হাজার টাকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এ ছাড়া নীতিমালা প্রণয়নের সময় বাইরের ১৩ জন বিশেষজ্ঞকে আলোচনায় যুক্ত করা হয়। তিনটি সভায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রত্যেক বিশেষজ্ঞকে ১৫ হাজার টাকা করে সম্মানী দেওয়া হয়েছে।

কর্মশালার অধিবেশন নিয়েও প্রশ্ন

নথিতে আরও দেখা যায়, মাত্র দুটি কর্মশালাকে মোট আটটি পৃথক অধিবেশনে ভাগ করা হয়েছে এবং প্রতিটি অধিবেশনের জন্য আলাদা সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, একটি কর্মশালাকে একাধিক অধিবেশনে ভাগ করে সম্মানী নির্ধারণের যৌক্তিকতা স্পষ্ট নয় এবং এটি সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এটি কি গবেষণা, নাকি নিয়মিত দায়িত্ব?

বিতর্কের মূল জায়গা এখানেই।

বিটিআরসির চাকরি প্রবিধানমালায় বিশেষ গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজের জন্য সম্মানী দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু টেলিযোগাযোগ নীতিমালা প্রণয়ন, যা কমিশনের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ, সেটিকে বিশেষ গবেষণা হিসেবে গণ্য করা যাবে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

নীতিমালা প্রণয়নে যুক্ত এক স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটিকে গবেষণা বলা কঠিন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সভাগুলোতে বিটিআরসি আগে থেকেই প্রস্তুত করা বিষয় উপস্থাপন করেছে এবং বিশেষজ্ঞরা মূলত সেই বিষয়গুলোর সমালোচনা ও পরামর্শ দিয়েছেন। এমনকি কমিটির সুপারিশের সঙ্গে চূড়ান্ত নীতিমালারও উল্লেখযোগ্য অমিল রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

আগের চর্চা কী ছিল?

সংশ্লিষ্ট এক সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অতীতে আন্তর্জাতিক দূরপাল্লার টেলিযোগাযোগ সেবা (আইএলডিটিএস) নীতিমালা প্রণয়নের সময়ও বিটিআরসির কর্মকর্তা ও স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞরা কাজ করেছিলেন। তবে সেটি ছিল কমিশনের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ এবং সে সময় কর্মকর্তাদের জন্য অতিরিক্ত সম্মানী বরাদ্দ করা হয়নি।

এই তথ্য সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে—একই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে এখন কেন আলাদা করে গবেষণা প্রকল্প ও সম্মানীর ব্যবস্থা করা হলো?

চেয়ারম্যানের ব্যাখ্যা

বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী অবশ্য এ সমালোচনার সঙ্গে একমত নন।

তাঁর বক্তব্য, এটি কমিশনের রুটিন কাজ নয়; বরং একটি কৌশলগত নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম। তিনি বলেন, শুধু বিটিআরসির কর্মকর্তাদের নয়, শিল্পখাত, একাডেমিয়া এবং অন্যান্য অংশীজনদের সম্পৃক্ত করেই গবেষণাভিত্তিক প্রক্রিয়ায় কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে। তাঁর দাবি, সম্মানী সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করেই দেওয়া হয়েছে।

টিআইবির কঠোর সমালোচনা

বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সভা কিংবা কর্মশালার অধিবেশনভিত্তিক ভাতা নেওয়ার সংস্কৃতি কোনো উন্নত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়।

তাঁর মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তা একই সঙ্গে গবেষক পরিচয়ে অতিরিক্ত ভাতা গ্রহণ করা, আবার সেই গবেষণার সভা ও কর্মশালার জন্যও আলাদা অর্থ নেওয়া—এসব অনৈতিক এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। তিনি বলেন, এ ধরনের চর্চা শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ অপচয় কিংবা আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করে।

টিআইবির মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক এড়াতে সভা, সেমিনার এবং গবেষণার নামে অতিরিক্ত সম্মানী প্রদানের বিষয়ে সরকারকে স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বিতর্ক?

এই ঘটনার মাধ্যমে শুধু বিটিআরসির একটি সিদ্ধান্ত নয়, বরং সরকারি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সম্মানী প্রদানের প্রচলিত সংস্কৃতিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

একদিকে বিটিআরসি বলছে, এটি ছিল একটি বিশেষ কৌশলগত গবেষণা, অন্যদিকে সমালোচকরা মনে করছেন, এটি কমিশনের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের অংশ, যা গবেষণা হিসেবে দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ।

চূড়ান্তভাবে এই ব্যয় বিধিসম্মত ছিল কি না, কিংবা সরকারি অর্থ ব্যবহারে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না—সেটি নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা ও তদারকি সংস্থার পর্যালোচনা। তবে বিষয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং জনঅর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

মূল অভিযোগ

  • বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-র নিয়মিত দায়িত্বের অংশ হিসেবে টেলিযোগাযোগ নীতিমালা প্রণয়নের কাজকে “গবেষণা” হিসেবে দেখিয়ে কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সম্মানী দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
  • প্রথম ধাপে ১৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা ছাড় করা হয়েছে।
  • দ্বিতীয় ধাপে ১২ লাখ ২৫ হাজার টাকা সম্মানী দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
  • পুরো প্রকল্পের জন্য প্রায় ২৯ লাখ টাকার বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছিল।

কী নিয়ে বিতর্ক?

  • বিটিআরসির দায়িত্বের মধ্যেই সরকারকে টেলিযোগাযোগ নীতিমালা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া অন্তর্ভুক্ত।
  • তাই সমালোচকদের প্রশ্ন, রুটিন দায়িত্ব পালনকে গবেষণা হিসেবে দেখিয়ে অতিরিক্ত সম্মানী নেওয়া কতটা যৌক্তিক?
  • আবার বিটিআরসির চাকরি প্রবিধানে বিশেষ গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজের জন্য সম্মানী দেওয়ার সুযোগও রয়েছে। বিতর্ক হচ্ছে—এই কাজটি সেই শ্রেণির মধ্যে পড়ে কি না।

সম্মানী কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে?

  • গবেষক হিসেবে মূল সম্মানী
  • সভার সম্মানী
  • কর্মশালার সম্মানী
  • বিশেষ দায়িত্বের সম্মানী

উদাহরণ হিসেবে:

  • কমিশনার ইকবাল আহমেদ-এর জন্য মোট ২ লাখ ১৭ হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে।
  • এছাড়া ১৩ জন বাইরের বিশেষজ্ঞকে তিনটি সভায় অংশ নেওয়ার জন্য জনপ্রতি ১৫ হাজার টাকা করে সম্মানী দেওয়া হয়েছে।

বিটিআরসির ব্যাখ্যা

বিটিআরসির চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারী বলেন—

  • এটি কমিশনের রুটিন কাজ নয়, বরং কৌশলগত (Strategic) কাজ।
  • শিল্পখাত, একাডেমিয়া ও অন্যান্য অংশীজনকে যুক্ত করে গবেষণার মাধ্যমে কাজটি করা হয়েছে।
  • সম্মানী সরকারি বিধিমালা অনুসারেই দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

নীতিমালা প্রণয়নে যুক্ত একাধিক স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞের বক্তব্য অনুযায়ী—

  • এটিকে প্রকৃত অর্থে গবেষণা বলা যায় কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
  • সভায় বিটিআরসি আগে থেকেই প্রস্তুত করা বিষয় উপস্থাপন করেছে; বিশেষজ্ঞরা মূলত মতামত ও সমালোচনা দিয়েছেন।

টিআইবির অবস্থান

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন—

  • সভা ও কর্মশালার নামে একাধিক ভাতা নেওয়া অযৌক্তিক।
  • সরকারি কর্মকর্তারা একই কাজের জন্য গবেষক পরিচয়ে অতিরিক্ত ভাতা নেওয়া অনৈতিক ও ক্ষমতার অপব্যবহার হতে পারে।
  • এ ধরনের চর্চা বন্ধে স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।

সারসংক্ষেপ

এ ঘটনায় দুটি ভিন্ন অবস্থান সামনে এসেছে:

  • বিটিআরসি বলছে, এটি একটি বিশেষ কৌশলগত গবেষণামূলক কাজ এবং বিধি অনুযায়ী সম্মানী দেওয়া হয়েছে।
  • সমালোচক ও টিআইবি বলছে, এটি মূলত বিটিআরসির নিয়মিত দায়িত্ব; তাই একই কাজকে গবেষণা হিসেবে দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

Share this news as a Photo Card