দীর্ঘ চার বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পাওনা টাকা হাতে পেলেন দেশের ১ লাখ ২৩ হাজার অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী। শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অনলাইনের মাধ্যমে তাদের হাতে এই অর্থ তুলে দেওয়া হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, কোনও রকম হয়রানি বা ভোগান্তি ছাড়াই এবার শিক্ষকদের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যা তার কাছে বিশেষ তৃপ্তির বিষয়।
বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধার পাওনা টাকা হস্তান্তর উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী অতীতের অনিয়ম নিয়ে কড়া ভাষায় কথা বলেন। তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশের প্রতিটি খাতেই লুটপাটের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছিল, আর সেই প্রবণতা থেকে বাদ যাননি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও। তার অভিযোগ, শিক্ষকদের কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ দুর্বল ব্যাংকে স্থানান্তর করে নিজেদের ঘনিষ্ঠজনদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে ২০২২ সাল থেকে হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ সেই জট খুলল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্টের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, অবসরের পর যাতে শিক্ষকদের শূন্য হাতে ঘরে ফিরতে না হয়, সেই লক্ষ্যে ১৯৯১ সালে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছিল। এরপর ২০০১ সালে সরকার গঠনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে চালু হয় অবসর সুবিধা কার্যক্রম। প্রধানমন্ত্রী জানান, আজকের দিনটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এই ট্রাস্টের প্রবর্তকের জন্মদিন আজ, যাকে তিনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, খালেদা জিয়া চিরকালই ছিলেন শিক্ষার্থীবান্ধব একজন নেতা। দেশে সর্বপ্রথম নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি ও বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ চালু করেছিলেন তিনিই, যে মডেল আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুসরণ করা হচ্ছে বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী।
একই সঙ্গে অবসরভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ উত্তোলনে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কথা স্মরণ করে দুঃখ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে অনেক সময় ঘুষ পর্যন্ত দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জা ও দৈন্যতার প্রকাশ। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনসহ মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য, সংসদ সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অনুষ্ঠানটি শুধু রাজধানী কেন্দ্রিক ছিল না—দেশের ৬৪টি জেলা থেকেই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা ভার্চুয়ালি এতে যুক্ত হন এবং নিজেদের অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন। বহু প্রতীক্ষিত এই অর্থ হাতে পেয়ে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, স্বস্তি প্রকাশ করেন দীর্ঘদিনের আর্থিক দুশ্চিন্তা কাটার পর।
বিশ্লেষকদের মতে, একসঙ্গে সোয়া লাখেরও বেশি শিক্ষক-কর্মচারীকে অনলাইন প্রক্রিয়ায় পাওনা পরিশোধের এই উদ্যোগ প্রশাসনিক স্বচ্ছতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা আর্থিক জটিলতা কাটিয়ে ওঠায় শিক্ষক সমাজে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়েছে, আর সরকারের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রক্রিয়া আরও নিরবচ্ছিন্ন ও ভোগান্তিমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এস কে চন্দন, ঢাকা 


















