ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) তিন নেতাকে মুক্তি দিয়েছেন আদালত। রোববার সকালে দিল্লি ক্যান্টনমেন্টের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত তাঁদের ছেড়ে দেওয়ার আদেশ দেন। মুক্তি পেয়েছেন অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে চলা এই আন্দোলন ঘিরে রাজধানীতে উত্তেজনা এখনো কাটেনি।
সিজেপির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিং এক্স-এ জানিয়েছেন, এক বছর শান্তিভঙ্গ না করার শর্তে তিন নেতাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির পরিচয়ে অভিজিৎ দীপকে এর প্রতিষ্ঠাতা।
আটক থেকে মুক্তি
শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লিতে বিমান নামার পরপরই উড়োজাহাজের ভেতর থেকে তিন নেতাকে আটক করা হয়। অভিযোগ ছিল, তাঁরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তরুণদের মধ্য দিল্লির যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়ার ডাক দিয়েছিলেন। আন্দোলনকারীদের পরিকল্পনা ছিল, সেদিন সেখানে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হবেন। রোববার ভোরে তাঁদের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়, আর সকালে আসে মুক্তির আদেশ।
নজিরবিহীন নিরাপত্তা
বিক্ষোভ ঠেকাতে পুলিশ যন্তর মন্তরসহ দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলে। ফলে বিক্ষোভকারীরা এক জায়গায় জড়ো হতে পারেননি। তাঁরা শহরের নানা স্থানে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে প্রতিবাদ জানান।
শনিবার রাজনীতিবিদ ও অভিনেতাসহ বহু মানুষকে আটক করা হয়। আটকের সংখ্যা নিয়ে দুটি ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। একটি সূত্র বলছে তিন হাজারের বেশি, অন্যটি বলছে দুই হাজারের বেশি। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম দিনে আটক বেশির ভাগ মানুষকে গভীর রাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন ইউটিউবার ও সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবশালী ধ্রুব রাঠি। ভারতের এনডিএ সরকারের কড়া সমালোচক হিসেবে তিনি পরিচিত। মধ্যরাতের পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আর কোনো বিক্ষোভে অংশ না নেওয়ার শর্তে তাঁকে ছাড়া হয়েছে। কর্মকর্তার এই বক্তব্য অন্য কোনো সূত্রে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মেট্রো বন্ধ ও সুপ্রিম কোর্টের শুনানি
শনিবার দিল্লির একাধিক মেট্রো স্টেশন ও ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদন করা হয়েছে। রোববার সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ বেঞ্চ সেই আবেদনের শুনানি করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর আগে শুক্রবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছিল, শনিবারের বিক্ষোভের আগে মেট্রো পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা যাবে না। বেঞ্চের অন্য দুই বিচারপতি ছিলেন জয়মাল্য বাগচী ও ভি মোহনা।
রোববার সকালে মেট্রো চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও স্টেশনগুলোর প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন আছেন। আশপাশে বাসও রাখা হয়েছে, যাতে আটক ব্যক্তিদের সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া যায়। শহরজুড়ে হাজার হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক সদস্য রয়েছেন। মোবাইল ইন্টারনেট সেবাও ফিরেছে।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
বিক্ষোভকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চান। তাঁদের আপত্তি ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে। সমালোচকদের মতে, এই সংশোধনে ১২ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি বেশি সুবিধা পায়।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, কুমারের দুই সহকর্মী কমিশনার ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে ভেতরে ভেতরে একাধিক উদ্বেগ তুলেছিলেন। এরপর দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছোট আকারে বিক্ষোভ চলছে। কমিশনের বক্তব্য, ভেতরের আলোচনায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। কোনো দলের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগও তারা অস্বীকার করেছে।
সংখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান
বিজেপির অভিযোগ, বিরোধীরা বৈধ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে ভুল প্রশ্ন তুলে দেশের গণতন্ত্রকে দুর্বল করতে চাইছে। দলটি নির্বাচন কমিশনের তথ্য তুলে ধরে বলছে, যাচাই কার্যক্রমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ গেছে। বাদ পড়াদের মধ্যে ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অন্যত্র চলে গেছেন, আর ৩ কোটি মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বিজেপি ও কমিশন দুই পক্ষই কারসাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিরোধী দলগুলোর দাবি, নাম বাদের ঘটনায় মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ভোটাররা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য, এই ভোটাররা হিন্দুত্ববাদী ক্ষমতাসীন দলকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা কম রাখেন। এই দাবির স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদনের তথ্যে নেই।
দেশ-বিদেশের প্রতিক্রিয়া
বিরোধী দল ও মোদি সরকারের সমালোচকেরা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়েছেন। জাতিসংঘের একটি সংস্থা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানায়। রোববার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, জাতিসংঘের এই অবস্থান ‘বেছে বেছে’ নেওয়া এবং এই বিবৃতি ‘ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ’।
সিজেপির পরিচয় ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি
ককরোচ জনতা পার্টির যাত্রা শুরু হয়েছিল অনলাইনে ব্যঙ্গ-রসিকতার মাধ্যম হিসেবে। পরে তা দ্রুতই একটি চাপসৃষ্টিকারী সংগঠনে রূপ নেয়। পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে সংগঠনটির রাজপথের আন্দোলনের পর মোদির শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভকে সামাজিক মাধ্যমে তারা ‘সিজন ২’ নামে ডাকছে।
সিজেপির নেতারা জানিয়েছেন, ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া ও তালিকায় কারসাজির অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। তাঁদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ জমায়েত ঠেকাতে দিল্লিতে ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’ জারি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : 



















