চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি আগের অনুমানের চেয়ে ধীর গতিতে এগোতে পারে, আর একই সময়ে দেশে দামের চাপও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন পূর্বাভাসে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত সংস্থাটির ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশ। দেশের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়াতে পারে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে।
আগের পূর্বাভাস থেকে কতটা সরে এল
গত এপ্রিলে আইএমএফ জানিয়েছিল, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। নতুন হিসাবে তা ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে। জুলাইয়ে সংস্থাটির পূর্বাভাস ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আরও চোখে পড়ার মতো। এপ্রিলে আইএমএফ বলেছিল, চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ হতে পারে। এবার সেই অঙ্ক বাড়িয়ে করা হয়েছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি কমা এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার এই পূর্বাভাস দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর চাপের ইঙ্গিত দেয়।
অন্য সংস্থা ও প্রতিবেশী দেশের হিসাব
আইএমএফের পূর্বাভাস অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার তুলনায়ও কম। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পূর্বাভাস ৪ শতাংশ।
আইএমএফের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তার আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। একই অর্থবছরে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ এবং ভুটানের ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
ব্যাংককে চলমান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠকের মধ্যেই নতুন পূর্বাভাস প্রকাশিত হলো। এই বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সংস্কার কর্মসূচি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থায়ন পাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতির চিত্র
‘রেজিলিয়েন্স আন্ডার স্ট্রেইন, আর্জেন্ট চয়েসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আইএমএফ জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। আগামী বছর তা কিছুটা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। চলতি বছর বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৭ শতাংশে উঠতে পারে, ২০২৭ সালে তা নেমে আসতে পারে ৪ দশমিক ১ শতাংশে।
সংস্থাটির মূল্যায়নে, একের পর এক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলেও বিশ্ব অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এই সহনক্ষমতা সব দেশে সমান নয়। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ পাওয়া দেশগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে। জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং প্রযুক্তি খাতে কম সম্পৃক্ত দেশগুলো পড়ছে বেশি চাপে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পূর্ণ প্রভাব এখনো বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হয়নি বলে মনে করছে আইএমএফ। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ, সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন, মজুত ব্যবহার ও জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়তা করেছে। এআই প্রযুক্তিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি ধরে রাখতে ভূমিকা রাখছে।
তবে এই অবস্থা কত দিন টিকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ আছে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা জ্বালানি সরবরাহে নতুন বিঘ্ন ঘটলে দাম বাড়তে পারে। তার প্রভাব পড়বে উৎপাদন, আমদানি ও সরকারি ব্যয়ে। যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, অথচ প্রযুক্তি খাতে যাদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ নেই, তারা সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। এসব দেশে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও বিনিময় হারে চাপ বাড়বে, কমতে পারে মানুষের প্রকৃত আয়। নিম্ন আয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়বে।
জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, সাইবার আক্রমণ ও চরম আবহাওয়াও ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বাণিজ্য বিরোধ, শুল্ক বৃদ্ধি ও উৎপাদনব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে ২০২৬ সালে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ধীর হতে পারে। ২০২৭ সালে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
সরকারি ঋণের চাপও উদ্বেগের বড় কারণ। বড় অর্থনীতিগুলোতে ঋণের ব্যয় বাড়ছে, আবার বয়স্ক জনগোষ্ঠী, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও জাতীয় নিরাপত্তায় সরকারের অর্থের চাহিদাও বাড়ছে। ফলে নতুন সংকট এলে তা সামাল দেওয়ার আর্থিক সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 























