যাঁর হাতে নিজের যত্নের ভার তুলে দিয়েছিলেন, তিনিই ঘুমন্ত অবস্থায় ধর্ষণ করতেন, এ কথা জানার পর ভেঙে পড়েছিলেন ব্রিটেনের ডার্বির বাসিন্দা অ্যাডেল ওভারটন। এখন নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে বলছেন তিনি। উদ্দেশ্য, একই পরিস্থিতিতে থাকা অন্য মানুষেরা যেন সাহস পান।
৪৬ বছর বয়সী ওভারটনের সঙ্গী ছিলেন ৪৪ বছর বয়সী স্টিভেন উডেন। দুজন ১৩ বছরেরও বেশি সময় একসঙ্গে ছিলেন। ওভারটনের ভাষায়, স্বীকারোক্তির আগের দিন পর্যন্ত এটিকেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক মনে হতো। এখন উডেন কারাগারে।
জম্বি সিনেমার সেটে পরিচয়
২০০৯ সালে নটিংহামে একটি জম্বি চলচ্চিত্রের শুটিংয়ে ওভারটন ও উডেনের পরিচয়। তখন ওভারটনের বয়স ২৯, উডেনের ২৭। উডেন মেকআপের কাজের পাশাপাশি অভিনয়ও করছিলেন, ওভারটনও ছিলেন একজন অভিনেতা। দুজনেরই তখন অন্য সম্পর্ক ছিল, তবে বন্ধুত্ব ছিল। ২০১২ সালের ১৩ জানুয়ারি তাঁরা সম্পর্কে জড়ান। সেদিন তাঁরা একের পর এক ‘ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্থ’ চলচ্চিত্রের পর্ব দেখেছিলেন বলে ওভারটনের তারিখটি মনে আছে।
পরে এক ইভেন্ট কোম্পানির হয়ে পেশাদার জম্বি হিসেবে কাজ করতেন তাঁরা। প্রতিষ্ঠানটি সারভাইভাল হরর অভিজ্ঞতার দিন আয়োজন করত। শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকতে হতো বলে ২০১৭ সালে এলার্স-ড্যানলস সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার পর ওভারটনকে কাজটি ছাড়তে হয়। ২০১৮ সালের শুরুর দিকে উডেন তাঁর দেখাশোনার দায়িত্ব নেন।
ওভারটন বলেন, তখন উডেন প্রায় সবকিছুই করে দিতেন। বন্ধু ও পরিবারের চোখেও তিনি ছিলেন আদর্শ সঙ্গী। তবে এখন ফিরে তাকিয়ে ওভারটনের মনে হয়, উডেন ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণপ্রবণ হয়ে উঠছিলেন। তাঁর কথায়, কেউ কোনো কাজের প্রস্তাব দিলে উডেন বলতেন, ডেল (ওভারটনের পরিচিত নাম) এটা সামলাতে পারবে না।
কেমোথেরাপির সময়ের সন্দেহ
২০২০ সালে স্তন ক্যানসারের কেমোথেরাপির সময় প্রথম সন্দেহ জাগে ওভারটনের। একবার ঘুম ভেঙে তিনি দেখেন, উডেন তাঁর সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত। জানতে চাইলে উডেন অজুহাত দেন, তিনি ভেবেছিলেন ওভারটন জেগে ছিলেন।
ওভারটন তখন নিজের সন্দেহ সরিয়ে রাখেন। তাঁর ভাষায়, সত্যিটা কী হতে পারত তা ভাবার চেয়ে মিথ্যাটা বিশ্বাস করা সহজ ছিল। এরপর তাঁর ঘুমের সমস্যা শুরু হয়। অন্তরঙ্গ হতেও কষ্ট হতো, অতীতের যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কারণে দুঃস্বপ্নও বাড়ে। তিনি ভাবতে শুরু করেন, নিজের মানসিক আঘাতের কারণেই হয়তো উডেনকে কঠোরভাবে বিচার করছেন। নিজেকেই দোষী মনে হতো তাঁর।
পাঁচ বছর পর স্বীকারোক্তি
২০২৫ সালে উডেন নিজে অন্ত্রের ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ওভারটনের ধারণা, তখন তিনি বুঝতে পারছিলেন ওভারটন কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন। একপর্যায়ে উডেন বলেন, ওভারটনের চিকিৎসার সময় তিনি ঠিকমতো যত্ন নিতে পারেননি। কথোপকথনে পাঁচ বছর আগের সেই ঘটনা ফিরে আসে।
ওভারটনের বর্ণনা অনুযায়ী, দুই দিনের কথাবার্তার মধ্যে উডেন এক বন্ধুকে ফোন করে নিজের কাজের কথা জানান, এরপর বাড়ি ফিরে ওভারটনের কাছেও সব বলেন। উডেন তাঁকে জানান, সাত-আটবার এমন ঘটেছে।
ওভারটন নিজেকে প্রতারিত ও বিতৃষ্ণ বোধ করেছিলেন। তবু তাৎক্ষণিকভাবে সম্পর্ক ছাড়েননি। তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি উডেনের ওপর নির্ভরশীল, আবার ভালোওবাসেন। অতীতের নির্যাতনের কারণে তিনি তখন নিয়মিত গ্রুপ থেরাপি নিচ্ছিলেন। পরের সেশনে বিষয়টি জানালে থেরাপিস্ট বলেন, উডেনকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে ও পুলিশকে জানাতে। সেদিনই নিরাপত্তাবিষয়ক বৈঠকের পর পুলিশকে ফোন করা হবে বলে জানানো হয়। ওভারটনের মনে হয়েছিল, বিষয়টি আর তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই।
পুলিশ ও আদালত
মামলাটির দায়িত্ব পান ডার্বিশায়ার পুলিশের ডিটেক্টিভ সার্জেন্ট এলেনর কার্টন। তিনি প্রথমে ওভারটনের সঙ্গে কথা বলেন, এরপর উডেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে উডেন সঙ্গে সঙ্গে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন। কার্টনের মতে, তদন্তে এত দ্রুত স্বীকারোক্তির পর্যায়ে পৌঁছানো খুবই অস্বাভাবিক।
উডেনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের দুটি অভিযোগ আনা হয়। আদালতে তিনি দোষ স্বীকার করলে ছয় বছর আট মাসের কারাদণ্ড হয়।
কার্টন বলেন, ওভারটনের সাহস ও দৃঢ়তার কারণে এমন আরও অনেককে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে, যাদের ওপর অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ চালিয়ে যেতে পারতেন। কেউ নিজের ক্ষেত্রেও এমন কিছু ঘটেছে বলে মনে করলে পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে তিনি উৎসাহ দিয়েছেন।
ওষুধ নিয়ে সন্দেহ
ওভারটনের সন্দেহ, তাঁকে অচেতন রাখতে উডেন তাঁর ওষুধ অতিরিক্ত মাত্রায় দিতেন। ওষুধের বাক্স গুছিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল উডেনের হাতে। ওভারটন বলেন, এখন তিনি দেখছেন অন্য ওষুধের তুলনায় তাঁর ঘুমের ওষুধ অনেক কম আছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এটি ‘হিস্টোরিক কেস’ বা পুরোনো ঘটনা হওয়ায় ফরেনসিক ও টক্সিকোলজি পরীক্ষায় তা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল না। আদালতেও এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। তবে উডেন পুলিশকে বলেছেন, কেমোথেরাপি চলাকালে তিনি একবার ওভারটনকে ধর্ষণ করেছিলেন এবং ওই সময় ওভারটন ওষুধের প্রভাবে ছিলেন।
মেয়ের গর্ব, ওভারটনের বার্তা
ওভারটনের মেয়ে শারি ওভারটন বলেন, মায়ের আত্মবিশ্বাস অনেক কমে গেছে, তিনি অনেকটাই বদলে গেছেন। তবু পুলিশ ও আদালতের মুখোমুখি হয়ে নিজের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য মাকে নিয়ে তিনি গর্বিত।
ওভারটন বলেন, ঘটনা জানার পর কয়েক মাস তিনি ভেবেছেন, যত্নের বিনিময়ে হয়তো ওই ঘনিষ্ঠতা তাঁর পাওনা ছিল। তিনি এখন বলছেন, তা মোটেই ঠিক নয়, আর অন্য কারও ক্ষেত্রেও এমন হওয়া উচিত নয়। কতজন প্রতিবন্ধী মানুষ এমন পরিস্থিতিতে আছেন, যেখানে অন্য কেউ তাঁদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে, এই ভাবনা থেকেই তিনি কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : 




















