দেশের শিল্পকারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলার পেছনে যারা ষড়যন্ত্র করছে, জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের উচিত জবাব দেবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর ভাষ্য, ২০২৪ সালে যেভাবে মানুষ জবাব দিয়েছিল, সামনের দিনেও সেভাবেই দেওয়া হবে।
বন্দরনগরী মোংলার আকাশে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ছিল নতুন সম্ভাবনার কথা, আর খুলনা-মোংলা মহাসড়কের পাশে কাটাখালীর পথসভায় ছিল সতর্কবার্তা। একই দিনে বাগেরহাটে দুটি ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একদিকে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য, অন্যদিকে শিল্পকারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের পেছনে যারা আছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান।
মোংলায় সমঝোতা স্মারক
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মোংলায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ ও চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানেই তিনি জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে মোংলায় নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে গতিশীল করতে বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা জরুরি। মোংলার ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রবন্দর ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলে শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হবে। তাঁর মতে, এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে মোংলার অবদানও বাড়বে। বিনিয়োগ টানতে স্থিতিশীল, নিরাপদ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান। শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে সরকার কাজ করছে, এমনটিও বলেন তিনি।
স্মারকে ইনভেস্ট বাংলাদেশের পক্ষে সই করেন সংস্থাটির ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন বিভাগের সদস্য সালেহ আহমেদ। চীনের পক্ষে সই করেন লি চংইয়াং, যাঁকে চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্মারকে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় অবকাঠামো, পরিবহন, লজিস্টিকস, শিল্প, জ্বালানি, পরিবেশ ও দক্ষতা উন্নয়নসহ নানা খাতে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে মোংলাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্পায়ন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে মোংলা বন্দরকে ঘিরে শিল্প ও লজিস্টিকস খাতের বিকাশ এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
স্মারক স্বাক্ষরের পর প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
কাটাখালীর পথসভায় হুঁশিয়ারি
দুপুরে হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতে যাওয়ার পথে কাটাখালী মোড়ে এক পথসভায় বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি বলেন, দেশের শিল্পকারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পেছনে যারা ষড়যন্ত্র করছে, ২০২৪ সালের মতোই জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের উচিত জবাব দেবে। সরকার দেশের মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ ও শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের রুখে দাঁড়াবে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এই সরকার মানুষের ভাগ্য বদলের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ষড়যন্ত্রকারীরা সেই উদ্যোগ ভেস্তে দিতে চাইছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর আহ্বান, শ্রমিকদের রুখে দাঁড়াতে হবে, যাতে ষড়যন্ত্রকারীরা কোনোভাবেই সুযোগ না পায়। তিনি বলেন, এখন দেশ গড়ার সময়, মানুষের ভাগ্য বদলের সময়। সরকারের লক্ষ্যের কথা বলতে গিয়ে তিনি উচ্চারণ করেন, “করব কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”।
প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, যারা গত ১৫-১৬ বছরে দেশের মানুষের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারেনি, মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল এবং দেশের অর্থসম্পদ বিদেশে পাচার করেছিল, তারা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের জনতার অভ্যুত্থানে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। তাঁর দাবি, এখন তারা সীমান্তের ওপার থেকে কলকাঠি নাড়ছে, দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে এবং মিল-কারখানা ভেঙে দিতে চাইছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে কারও নাম বা নির্দিষ্ট প্রমাণের কথা বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি।
মিল-কারখানাকে তিনি দেশের মানুষ ও শ্রমিকের সম্পদ বলে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, এগুলো ধ্বংস হলে সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন খেটে খাওয়া মানুষ, শ্রমিক ভাই-বোন ও তাঁদের সন্তানেরা, আর তাঁদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়বে।
মজুরি বোর্ড ও কারখানা চালুর প্রতিশ্রুতি
শ্রমিকদের মজুরির দাবি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, সেসব দাবি বিবেচনার জন্য ইতিমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং বোর্ড কাজও শুরু করেছে। তাঁর আশা, আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে বোর্ড নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করবে, যাতে শ্রমিকেরা আগের চেয়ে ভালো থাকতে পারেন।
তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকার দিনরাত পরিশ্রম করছে, কীভাবে সমস্যার সমাধান হবে, শিল্পের প্রসার ঘটবে, ব্যবসা-বাণিজ্য জোরদার হবে, সেই ভাবনা নিয়ে। বিএনপি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি-বেসরকারি কারখানা পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলে তিনি মনে করিয়ে দেন। সেই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করার কথাও বলা হয়েছিল। বন্ধ মিল-কারখানা চালুর চেষ্টা করা হবে এবং বিনিয়োগকারীদের উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁর ভাষ্য, সরকারের লক্ষ্য তরুণ ও যুবসমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
খুলনার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একসময় এটি ছিল দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল, কিন্তু সময়ের বিবর্তনে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার খুলনা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে উত্তরের পঞ্চগড় পর্যন্ত হাজার হাজার শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে চায়।
দিনের বাকি কর্মসূচি
কাটাখালীতে পথসভা শেষে প্রধানমন্ত্রী খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। এরপর খুলনায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস (সিজন-২)-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















