ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে রাজধানীর মিরপুর এবং সাভার ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে রাস্তায় নেমেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। রোববার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এসব এলাকা। পরিস্থিতির কারণে সাভার ও গাজীপুরে অন্তত ৮০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। একই দিনে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠনের কথা জানিয়েছেন।
গাজীপুরে আগুন, ১৫ কিলোমিটার যানজট
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ, সফিপুর বাজার, মৌচাক ও তেলিচালা এলাকায় সকাল থেকে কাজ বন্ধ রেখে মহাসড়কে অবস্থান নেন শ্রমিকেরা। রতনপুর এলাকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকও কাজে যোগ না দিয়ে সফিপুর বাজার এলাকায় মহাসড়কে বিক্ষোভ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ট্রপিক্যাল নামের একটি পোশাক কারখানার গোডাউনে আগুন দেওয়া হয়। সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের দোকানপাট ও কারখানার ক্যান্টিনে। এর আগে একই এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যানেও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। দুপুরের দিকে এলাকার মন্ডল গ্রুপেও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে। কোনাবাড়ীতে একটি পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়েছে। পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি ব্যাংকে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগও উঠেছে।
আগুন নেভাতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম জানান, ট্রপিক্যাল কারখানার গোডাউনে আগুনের খবর তাঁরা পেয়েছেন। কিন্তু শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে ঘটনাস্থলে যেতে পারছিলেন না। অন্যদের বরাতে জানা গেছে, মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটও গাড়ি পৌঁছানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
অবরোধ ও সহিংসতায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিস এলাকা থেকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার জুড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। চন্দ্রা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যাত্রী, চালক ও সাধারণ পথচারীরা পড়েন চরম ভোগান্তিতে। এলাকার শিল্পকারখানা, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গাজীপুরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মাঠে নেমেছে বলেও জানা গেছে।
আশুলিয়ায় কর্মবিরতি, সড়ক অবরোধ
সাভারের আশুলিয়ায় সকালে অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক ছিল। তবে নিশ্চিন্তপুর এলাকার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস, নিউএইজ গ্রুপ ও ট্রাউজার লাইন লিমিটেডের শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরে অবস্থান নেন। পরে নরসিংহপুর এলাকায় শারমিন গ্রুপের কারখানার সামনে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে বেতন বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভ করেন কয়েকটি কারখানার শ্রমিক। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে শারমিন গ্রুপ, হা-মীম গ্রুপ ও নিউএইজসহ আশপাশের একাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সাভারে অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন স্থানে পুলিশ মোতায়েন আছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি শ্রমিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে মাইকিং চলছে।
মিরপুরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া
রাজধানীর মিরপুরে সকাল আটটার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন কয়েকটি কারখানার শ্রমিক। এতে যান চলাচল ব্যাহত হয়, বন্ধ হয়ে যায় মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথও।
পুলিশ সড়ক থেকে সরে যেতে বললে বেলা সোয়া ১১টার দিকে শ্রমিকেরা পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পুলিশ লাঠিপেটা করে, জলকামান থেকে পানি ছোড়ে এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। শ্রমিকেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও পরে আবার সংগঠিত হয়ে বিভিন্ন অলিগলিতে অবস্থান নেন। দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে। সোয়া ১২টার দিকে আন্দোলনকারীরা রাস্তা ছেড়ে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে থাকে। তবে তখনো বিভিন্ন অলিগলিতে উত্তেজনা ছিল। মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। সংঘর্ষের সময় পুলিশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেছে।
শনিবারের প্রেক্ষাপট
আন্দোলনের সূত্রপাত গতকাল শনিবার। সেদিনও মিরপুর, সাভার ও গাজীপুরে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং কারখানা ও মার্কেটে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মিরপুর-১ নম্বরের শাহ আলী এলাকায় কয়েকটি মার্কেট ও কারখানায় ভাঙচুর হয়। সেদিনের সংঘর্ষে পুলিশসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন।
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের পাশাপাশি শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ এবং ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগের দাবিও জানানো হচ্ছে।
মজুরি বোর্ড ও মন্ত্রীর বক্তব্য
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর বিজয়নগরের শ্রম ভবনে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। সেই বৈঠকের পর তিনি জানিয়েছিলেন, রোববার মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে।
রোববার সকালে সচিবালয়ে মন্ত্রী ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন মজুরি বোর্ড গঠন ছিল শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান দাবি। সরকার এবং মালিকপক্ষের দুই সংগঠন এ বিষয়ে একমত হয়েছে। শ্রমিক প্রতিনিধিরাও তাঁদের মনোনীত সদস্যদের নাম জমা দিয়েছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, বোর্ডের সদস্যরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে একটি উপযুক্ত মজুরি নির্ধারণ করবেন। তিনি শ্রমিকদের বিক্ষোভ বন্ধ করে কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে মন্ত্রী অভিযোগ করেন, কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠন পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ বা সংগঠনের নাম প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে আন্দোলনরত শ্রমিকেরা বলছেন, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা রাজপথ ছাড়বেন না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তাঁরা।
এস কে চন্দন, ঢাকা 















