শিরোনাম :
পরীমণিকে লিগ্যাল নোটিশ, অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা শীতের আমেজে তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৬.৫ ডিগ্রি শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল ঘিরে জাপানি শর্তে বিতর্ক, উদ্বেগে বিশেষজ্ঞরা শেখ হাসিনার বিষয়ে আবেগ নয়, আইনই প্রয়োগ হবে: আইনমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিকল্প গাদি আইজেনকোট: সেনাপ্রধান থেকে সরকার গঠনের দৌড়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন মাদক সেবনে বাধা, ছুরিকাঘাতে নিহত বিকাশ-রকেট এজেন্টকে কুপিয়ে টাকা ও মোবাইল ছিনতাই মার্কিন শুল্ক চুক্তি নিয়ে স্বচ্ছতা ও খোলামেলা আলোচনা চান ব্যবসায়ীরা মদিনা থেকে জেদ্দা যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ বাংলাদেশির মৃত্যু

শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল ঘিরে জাপানি শর্তে বিতর্ক, উদ্বেগে বিশেষজ্ঞরা

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যেতে পারে জাপানের চারটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়ামের হাতে। এ নিয়ে আলোচনা এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। তবে দর-কষাকষির সময় বাংলাদেশ যেসব শর্ত মেনে নিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। একজন সরকারদলীয় সংসদ সদস্যও নাম প্রকাশ না করার শর্তে অসন্তোষ জানিয়েছেন।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে এই মাসের মধ্যেই চুক্তি সই হবে। প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত টার্মিনালটির কাজ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু পরিচালনা-সংক্রান্ত জটিলতায় এতদিন সেটি চালু করা যায়নি। বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনালটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করবে। তবে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম ও ফ্লাইট পরিচালনা শুরু হতে আরও কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।

যেসব শর্তে রাজি হয়েছে সরকার

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জাপানি কনসোর্টিয়ামের কয়েকটি কঠিন শর্তে বাংলাদেশ সরকার সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি বিষয়:

  • তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে অপর দুই টার্মিনাল থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ থাকবে।
  • লভ্যাংশ ভাগাভাগির শর্তগুলো অসম।
  • আগামী ১৫ বছরে শাহজালাল বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোনো বিমানবন্দর চালু করা যাবে না।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, এসব শর্তের বেশ কয়েকটি বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ওই সরকারদলীয় সদস্য আরও কড়া ভাষায় বলেছেন, “জাপানের কোম্পানির সাথে যে চুক্তি হচ্ছে, তাতে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে।”

পুরোনো টার্মিনালের ভবিষ্যৎ

বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকার প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল থেকেই আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলে। এই দুই টার্মিনালের বার্ষিক যাত্রী সামলানোর সক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ। নির্মাণাধীন তৃতীয় টার্মিনালের সক্ষমতা ধরা হয়েছে বছরে এক কোটি ২০ লাখ যাত্রী।

বেবিচকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সেখান থেকেই চলবে। তবে হজ ফ্লাইট, চার্টার্ড ফ্লাইট ও কম খরচের বাজেট ফ্লাইট প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল থেকে চলাচল করবে। অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইটও চলবে সেখান থেকেই।

গত বুধবার বিমানবন্দর পরিদর্শনে গিয়ে বিমানমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত সাংবাদিকদের বলেছেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলেও পুরোনো দুটি টার্মিনাল পুরোপুরি বন্ধ হবে না। সেখান থেকে অভ্যন্তরীণ, চার্টার্ড ও হজ ফ্লাইট চলবে।

তবু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচালনা চুক্তিতে এ ধরনের শর্ত রাখার যৌক্তিকতা কী, তা জানতে চাইছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পরও পুরোনো দুই টার্মিনাল থেকে অন্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করা উচিত নয়। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, “হজ ফ্লাইট কিংবা চার্টার্ড ফ্লাইট অপারেশনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটের অন্য কিছু ফ্লাইটও অপারেট করতে হবে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অপারেশন এক এবং দুই নম্বর টার্মিনাল থেকে বন্ধ করা যাবে না।” বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, শুধু অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট দিয়ে পুরোনো টার্মিনালগুলোর সক্ষমতার পুরো ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।

লভ্যাংশে বাংলাদেশের অংশ কত

আলোচনার মূল সংকট তৈরি হয়েছিল রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে। বেবিচক জানিয়েছে, জাপানি কনসোর্টিয়ামের দেওয়া শর্তের বিষয়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কনসোর্টিয়ামের প্রাথমিক প্রস্তাব ছিল লভ্যাংশের ১৫ শতাংশ বাংলাদেশকে দেওয়া। গত কয়েক দিনের আলোচনায় এই অংশ বাড়ানো হয়েছে। কতটুকু বেড়েছে, তা তিনি জানাতে রাজি হননি।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য অবশ্য বলেছেন, জাপানি প্রতিষ্ঠান ২৭ শতাংশ লভ্যাংশ দিতে রাজি হয়েছে। তাঁর মতে, দর-কষাকষিতে বেবিচক দুর্বলতা দেখিয়েছে। তিনি বলেন, “বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সঠিকভাবে নেগোশিয়েশন করতে পারেনি, সে কারণেই লাভের প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়েছে।” অন্যদিকে বেবিচকের একজন কর্মকর্তার দাবি, বাংলাদেশের লাভের অংশ নিশ্চিত করেই তাঁরা শর্তে রাজি হয়েছেন।

লভ্যাংশের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ আছে। বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, শাহজালাল বিমানবন্দরের আয় থেকেই বাংলাদেশ বিমান ও বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের সব খরচ মেটানো হয়। লভ্যাংশ ঠিকমতো আদায় না হলে তৃতীয় টার্মিনাল ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমান বলেন, “প্রথমত আমরা যেন লোনটা ফেরত দিতে পারি সেটা দেখতে হবে। বাংলাদেশের সিভিল এভিয়েশনের টাকা আসে এই বিমানবন্দর দিয়ে। সব খরচ এখান থেকে মিট করা হয়। সেটা যেন ঠিক থাকে, সেই বিষয়টি নিশ্চয়ই বেবিচক দেখছে বলেই আমি বিশ্বাস করি।”

নতুন বিমানবন্দর নিয়ে শর্ত

তৃতীয় আলোচিত শর্ত হলো, টার্মিনাল চালু হলে শাহজালাল বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করা যাবে না। বেবিচকের একজন কর্মকর্তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কনসোর্টিয়ামের শর্তে বিমানবন্দর বানাতে বাধা নেই, তবে সেখান থেকে ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে না। তাঁর দাবি, আপাতত ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে এমন বিমানবন্দর করার মতো জায়গাও নেই, সরকারের পরিকল্পনাও নেই।

বিমানমন্ত্রীও বুধবার একই কথা বলেছেন। তাঁর ভাষ্য, ঢাকার একশো কিলোমিটারের মধ্যে নতুন বিমানবন্দরের পরিকল্পনা সরকারের নেই। সেই বিবেচনাতেই জাপানের প্রস্তাবে সরকার সম্মত হয়েছে।

তবে সাবেক বিমান কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা এখানে স্বার্থের সংঘাত দেখছেন। নজরুল ইসলামের বক্তব্য, থার্ড টার্মিনাল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি, বিষয়টি সেই চুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে ভালো হতো। তিনি বলেন, “জানি না কোন কারণে এই চুক্তি তারা সামনে আনলো। আমাদের এখানে একটা মাত্র রানওয়ে। ওইভাবে চিন্তা করলে নতুন বিমানবন্দরের প্রয়োজন হতে পারে। তখন আমরা কী করবো?”

সাবেক কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকার একশো কিলোমিটারের মধ্যে কয়েকটি স্থানে বিমানবন্দর করার সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে। চুক্তি হলে সেসব পরিকল্পনা অযৌক্তিক হয়ে পড়বে বলে তাঁদের মত। মফিদুর রহমান বলেন, আগের সব সম্ভাব্যতা যাচাই ওই একশো কিলোমিটারের মধ্যেই হয়েছে। রাজধানীর কাছাকাছি না হলে সংযোগ গড়া কঠিন হবে। তিনি আরও বলেন, “জাপান আমাদের বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র। আমাদের ডেভেলপমেন্ট প্রসেসকে স্লো করার শর্ত দেওয়ার বিষয়টি যৌক্তিক মনে হচ্ছে না, এ বিষয়ে বিকল্প কোনো প্রস্তাব তারা করতে পারে, এই শর্ত যৌক্তিক নয়।”

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

পরীমণিকে লিগ্যাল নোটিশ, অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

মদিনা থেকে জেদ্দা যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ বাংলাদেশির মৃত্যু

০৭ নভেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল ঘিরে জাপানি শর্তে বিতর্ক, উদ্বেগে বিশেষজ্ঞরা

আপডেট সময় ০১:৩৮:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যেতে পারে জাপানের চারটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়ামের হাতে। এ নিয়ে আলোচনা এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। তবে দর-কষাকষির সময় বাংলাদেশ যেসব শর্ত মেনে নিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। একজন সরকারদলীয় সংসদ সদস্যও নাম প্রকাশ না করার শর্তে অসন্তোষ জানিয়েছেন।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে এই মাসের মধ্যেই চুক্তি সই হবে। প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত টার্মিনালটির কাজ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু পরিচালনা-সংক্রান্ত জটিলতায় এতদিন সেটি চালু করা যায়নি। বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনালটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করবে। তবে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম ও ফ্লাইট পরিচালনা শুরু হতে আরও কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।

যেসব শর্তে রাজি হয়েছে সরকার

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জাপানি কনসোর্টিয়ামের কয়েকটি কঠিন শর্তে বাংলাদেশ সরকার সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি বিষয়:

  • তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে অপর দুই টার্মিনাল থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ থাকবে।
  • লভ্যাংশ ভাগাভাগির শর্তগুলো অসম।
  • আগামী ১৫ বছরে শাহজালাল বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোনো বিমানবন্দর চালু করা যাবে না।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, এসব শর্তের বেশ কয়েকটি বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ওই সরকারদলীয় সদস্য আরও কড়া ভাষায় বলেছেন, “জাপানের কোম্পানির সাথে যে চুক্তি হচ্ছে, তাতে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে।”

পুরোনো টার্মিনালের ভবিষ্যৎ

বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকার প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল থেকেই আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলে। এই দুই টার্মিনালের বার্ষিক যাত্রী সামলানোর সক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ। নির্মাণাধীন তৃতীয় টার্মিনালের সক্ষমতা ধরা হয়েছে বছরে এক কোটি ২০ লাখ যাত্রী।

বেবিচকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সেখান থেকেই চলবে। তবে হজ ফ্লাইট, চার্টার্ড ফ্লাইট ও কম খরচের বাজেট ফ্লাইট প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল থেকে চলাচল করবে। অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইটও চলবে সেখান থেকেই।

গত বুধবার বিমানবন্দর পরিদর্শনে গিয়ে বিমানমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত সাংবাদিকদের বলেছেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলেও পুরোনো দুটি টার্মিনাল পুরোপুরি বন্ধ হবে না। সেখান থেকে অভ্যন্তরীণ, চার্টার্ড ও হজ ফ্লাইট চলবে।

তবু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচালনা চুক্তিতে এ ধরনের শর্ত রাখার যৌক্তিকতা কী, তা জানতে চাইছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পরও পুরোনো দুই টার্মিনাল থেকে অন্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করা উচিত নয়। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, “হজ ফ্লাইট কিংবা চার্টার্ড ফ্লাইট অপারেশনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটের অন্য কিছু ফ্লাইটও অপারেট করতে হবে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অপারেশন এক এবং দুই নম্বর টার্মিনাল থেকে বন্ধ করা যাবে না।” বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, শুধু অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট দিয়ে পুরোনো টার্মিনালগুলোর সক্ষমতার পুরো ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।

লভ্যাংশে বাংলাদেশের অংশ কত

আলোচনার মূল সংকট তৈরি হয়েছিল রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে। বেবিচক জানিয়েছে, জাপানি কনসোর্টিয়ামের দেওয়া শর্তের বিষয়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কনসোর্টিয়ামের প্রাথমিক প্রস্তাব ছিল লভ্যাংশের ১৫ শতাংশ বাংলাদেশকে দেওয়া। গত কয়েক দিনের আলোচনায় এই অংশ বাড়ানো হয়েছে। কতটুকু বেড়েছে, তা তিনি জানাতে রাজি হননি।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য অবশ্য বলেছেন, জাপানি প্রতিষ্ঠান ২৭ শতাংশ লভ্যাংশ দিতে রাজি হয়েছে। তাঁর মতে, দর-কষাকষিতে বেবিচক দুর্বলতা দেখিয়েছে। তিনি বলেন, “বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সঠিকভাবে নেগোশিয়েশন করতে পারেনি, সে কারণেই লাভের প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়েছে।” অন্যদিকে বেবিচকের একজন কর্মকর্তার দাবি, বাংলাদেশের লাভের অংশ নিশ্চিত করেই তাঁরা শর্তে রাজি হয়েছেন।

লভ্যাংশের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ আছে। বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, শাহজালাল বিমানবন্দরের আয় থেকেই বাংলাদেশ বিমান ও বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের সব খরচ মেটানো হয়। লভ্যাংশ ঠিকমতো আদায় না হলে তৃতীয় টার্মিনাল ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমান বলেন, “প্রথমত আমরা যেন লোনটা ফেরত দিতে পারি সেটা দেখতে হবে। বাংলাদেশের সিভিল এভিয়েশনের টাকা আসে এই বিমানবন্দর দিয়ে। সব খরচ এখান থেকে মিট করা হয়। সেটা যেন ঠিক থাকে, সেই বিষয়টি নিশ্চয়ই বেবিচক দেখছে বলেই আমি বিশ্বাস করি।”

নতুন বিমানবন্দর নিয়ে শর্ত

তৃতীয় আলোচিত শর্ত হলো, টার্মিনাল চালু হলে শাহজালাল বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করা যাবে না। বেবিচকের একজন কর্মকর্তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কনসোর্টিয়ামের শর্তে বিমানবন্দর বানাতে বাধা নেই, তবে সেখান থেকে ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে না। তাঁর দাবি, আপাতত ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে এমন বিমানবন্দর করার মতো জায়গাও নেই, সরকারের পরিকল্পনাও নেই।

বিমানমন্ত্রীও বুধবার একই কথা বলেছেন। তাঁর ভাষ্য, ঢাকার একশো কিলোমিটারের মধ্যে নতুন বিমানবন্দরের পরিকল্পনা সরকারের নেই। সেই বিবেচনাতেই জাপানের প্রস্তাবে সরকার সম্মত হয়েছে।

তবে সাবেক বিমান কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা এখানে স্বার্থের সংঘাত দেখছেন। নজরুল ইসলামের বক্তব্য, থার্ড টার্মিনাল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি, বিষয়টি সেই চুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে ভালো হতো। তিনি বলেন, “জানি না কোন কারণে এই চুক্তি তারা সামনে আনলো। আমাদের এখানে একটা মাত্র রানওয়ে। ওইভাবে চিন্তা করলে নতুন বিমানবন্দরের প্রয়োজন হতে পারে। তখন আমরা কী করবো?”

সাবেক কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকার একশো কিলোমিটারের মধ্যে কয়েকটি স্থানে বিমানবন্দর করার সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে। চুক্তি হলে সেসব পরিকল্পনা অযৌক্তিক হয়ে পড়বে বলে তাঁদের মত। মফিদুর রহমান বলেন, আগের সব সম্ভাব্যতা যাচাই ওই একশো কিলোমিটারের মধ্যেই হয়েছে। রাজধানীর কাছাকাছি না হলে সংযোগ গড়া কঠিন হবে। তিনি আরও বলেন, “জাপান আমাদের বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র। আমাদের ডেভেলপমেন্ট প্রসেসকে স্লো করার শর্ত দেওয়ার বিষয়টি যৌক্তিক মনে হচ্ছে না, এ বিষয়ে বিকল্প কোনো প্রস্তাব তারা করতে পারে, এই শর্ত যৌক্তিক নয়।”

Share this news as a Photo Card