গত শুক্রবার বিকেলে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান মো. সাহাবুদ্দিন। দীর্ঘদিনের জল্পনার অবসান ঘটিয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয় নতুন উত্তাপ। পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়তে না পড়তেই একের পর এক রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে উঠতে শুরু করে তার বিচারের দাবি। প্রশ্ন উঠেছে, সদ্য সাবেক এই রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে সত্যিই কি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে?
পদত্যাগের পরপরই সরব রাজনৈতিক দলগুলো
মি. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের খবর প্রকাশ্যে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, শুক্রবার সন্ধ্যাতেই জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির পক্ষ থেকে ডাকা হয় জরুরি সংবাদ সম্মেলন। সেখানে দলটির সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেন স্পষ্ট ভাষায় দাবি জানান, সাবেক রাষ্ট্রপতিকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, “সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ন্যারেটিভ সাজিয়েছেন, যেটা আসলে তার জন্য একটা সেফ এক্সিটের জায়গা তৈরি করতে পারে। কিন্তু তাকে সেফ এক্সিট দেওয়ার কোনো মানেই নেই। তিনি যত অপরাধ করেছেন, সেই অপরাধগুলোতে তাকে অবশ্যই বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।”
একই দিন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক ও মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদও যৌথ বিবৃতি দিয়ে একই সুরে কথা বলেন। দলটির পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়, মি. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করে তাকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা হোক।
তবে এনসিপি ও খেলাফত মজলিসের মতো কঠোর অবস্থান দেখা যায়নি জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে। ওই রাতেই এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলটির আমির শফিকুর রহমানের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, তাদের দল সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতির বিচার চায় কি না। জবাবে তিনি কিছুটা কৌশলী সুরে বলেন, “আমরা সেটা চিন্তাভাবনা করেই আমাদের পদক্ষেপটি নেব।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দুটি অভিযোগ
পদত্যাগের পর সাপ্তাহিক প্রথম কর্মদিবস অর্থাৎ রোববারেই সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও আব্দুল হামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। বাংলাদেশ আজাদি পার্টি ও রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম নামের দুটি ভিন্ন সংগঠন পৃথকভাবে এই দুটি অভিযোগ দাখিল করে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এই দুই সাবেক রাষ্ট্রপতির। এই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের দাবিও জানানো হয়েছে।
সরকারের অবস্থান: “আমলে নেওয়ার মতো কিছু পাইনি”
এত সব দাবি ও অভিযোগের মধ্যে রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। মি. সাহাবুদ্দিনের বিচার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানিয়ে দেন, সরকার এখনও পর্যন্ত এমন কিছু পায়নি যা আমলে নেওয়ার মতো।
তিনি বলেন, “যারা তার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছে, তাদের সেটা অধিকার আছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এনসিপি এবং অন্যান্যরা তার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ উত্থাপন করছে। সেটা করতে পারে, কিন্তু আমরা আমলে নেওয়ার মতো বক্তব্য ওখানে নাই।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি তার দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে সাংবিধানিকভাবেই দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিধি-বিধান অনুযায়ীই কাজ করেছেন। তার কথায়, “আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা পেয়েছি।”
বিচারের প্রশ্নে সরাসরি জবাবে তিনি বলেন, “সংবিধান অনুসারে তিনি প্রিভিলেজড এবং ইমিউনিটি আছে। ফৌজদারি অপরাধ ইত্যাদির বিষয়ে কোনো আদালতে মামলা করা যায় না। এর বহির্ভূত কোনো সময়ে যদি কোনো বক্তব্য কেউ দিয়ে থাকে, সেটা তাদের স্বাধীনতা আছে দিতে পারবে। তবে আমরা আমলে নেওয়ার মতো কোনো বিষয় এখানে দেখিনি।”
সাংবাদিকরা তখন প্রশ্ন তোলেন, দায়িত্ব পালনের আগের কোনো অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে কি না। জবাবে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সেই দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে তার বিরুদ্ধে কি কেউ অভিযোগ দিয়েছিল? দিয়ে থাকলে তখনকার সময়ে যদি কিছু রেকর্ড করে থাকে, সেটা তখনকার বিষয়। সেটা বিধি-বিধান অনুসারে চলবে, আইন অনুসারে চলবে।”
একই দিন ভিন্ন এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কাছেও প্রায় একই ধরনের প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমরা একদিকে যেমন জন দাবিকে গুরুত্ব দেব, একইসাথে আমরা কাউকে অন্যায়ভাবে কেউ অন্যায়ের শিকার হোক সেটাও চাইব না। সুতরাং বিষয়টা আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কি করণীয় আছে, সেটা সরকার যথাসময়ে দেখবে।” রোববার আরেক অনুষ্ঠানে তিনি আরও জানান, মি. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সংবিধান কী বলছে: দায়মুক্তির দুই স্তর
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। এক বছরের মাথায়, ২০২৪ সালের অগাস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও তিনি রাষ্ট্রপতি পদে বহাল থেকে যান। সংবিধান অনুযায়ী তার মেয়াদ ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত। কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর আগেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি।
পদত্যাগের পরপরই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জোরালো হলেও, বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির জন্য দায়মুক্তির সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মূলত দুই ধরনের সুরক্ষা পান।
প্রথমত, দায়িত্ব পালনকালে কাজের দায়মুক্তি—অর্থাৎ দায়িত্ব পালনের সময়ে কোনো কাজ করলে বা না করলে, তার জন্য কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না। দ্বিতীয়ত, কার্যভারকালে ফৌজদারি সুরক্ষা—অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের বা চালু রাখা যাবে না, এমনকি তাকে গ্রেফতার বা কারাবাসের পরোয়ানাও জারি করা যাবে না।
এই বিষয়ে আইনজীবী ও সংবিধান বিশ্লেষক কাজী জাহেদ ইকবাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, “শপথ গ্রহণ থেকে পদত্যাগ পর্যন্ত ওনার কোনো কাজকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। না ফৌজদারি, না রিট কিংবা অন্য কোনো অভিযোগ আনা যাবে না। এমনকি জুলাইয়ের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও আনা যাবে না।”
সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে যে সুরক্ষা দিয়েছে, তা মো. সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে বলে মনে করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। যেহেতু তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, তাই তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই বলেই মত তাদের।
অভিশংসন হলে কি ভিন্ন কিছু হতো?
তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, বিষয়টি ভিন্ন হতে পারত যদি রাষ্ট্রপতিকে তার পদ থেকে অভিশংসন করা হতো। সংবিধানের ৫২ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসিত করার বিধান রয়েছে। এই অনুচ্ছেদের একটি ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, “কোনো অভিযোগ তদন্তের জন্য সংসদ কর্তৃক নিযুক্ত বা আখ্যায়িত কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট সংসদ রাষ্ট্রপতির আচরণ গোচর করিতে পারিবেন।”
এই প্রসঙ্গে আইনজীবী হাসনাত কাইয়ুম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অভিশংসন হওয়ার মতো অপরাধ করেছেন। বর্তমান সরকার তাকে অভিশংসন থেকে রক্ষা করছে। তাকে ক্লিন শিট দিয়েছে। যদি তাকে অভিশংসন করা হতো, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ হয়তো থাকত।”
তবে কাজী জাহেদ ইকবাল ও হাসনাত কাইয়ুম—দুজনই একমত যে, রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়ার আগে মো. সাহাবুদ্দিন যদি কোনো নির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে সেই অপরাধের বিচার করার সুযোগ এখনও থেকে যায়।
অতীতে দুইবার অপসারণের দাবি উপেক্ষিত হয়েছিল
মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের দাবি এবারই প্রথম নয়। ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই তাকে সরিয়ে দেওয়ার জোরালো দাবি উঠেছিল। কিন্তু সে সময় সাংবিধানিক সংকট তৈরির আশঙ্কায় তাকে স্বপদে বহাল রাখা হয়েছিল। এরপর নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠিত হলে জামায়াত-এনসিপি জোটের পক্ষ থেকে আবারও তাকে অপসারণের প্রসঙ্গ সামনে আনা হয়। তবে সেবারও বিএনপি সরকারের অবস্থান ছিল রাষ্ট্রপতির পক্ষেই, এবং তাকে পদে বহাল রাখা হয়।
শেষ পর্যন্ত গত শুক্রবার স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে অনেকটা তাড়াহুড়ো করেই পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী তারপর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বিএনপির অবস্থান এখনও রাষ্ট্রপতির পক্ষে
লক্ষণীয় বিষয় হলো, অতীতে যেমন রাষ্ট্রপতিকে পদে বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল বিএনপি, পদত্যাগের পর বিচার প্রসঙ্গেও দলটির অবস্থান একই রকম রয়ে গেছে। রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য থেকেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বিরোধী পক্ষের বক্তব্য দেওয়ার অধিকার থাকলেও, সরকার এখনও পর্যন্ত এমন কিছু পায়নি যা আমলযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে।
এদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা এবং তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিতি—উভয় প্রেক্ষাপটেই মো. সাহাবুদ্দিনের রাজনৈতিক অবস্থান বারবার আলোচনায় এসেছে। তবে তার পদত্যাগের পর সৃষ্ট বিচারের দাবি সরকার কীভাবে সামলাবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোর দাবি একদিকে জোরালো হলেও, সংবিধানের দায়মুক্তি সংক্রান্ত বিধান এবং সরকারের সতর্ক অবস্থানের কারণে মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা এই মুহূর্তে ক্ষীণ বলেই মনে হচ্ছে। তবে দায়িত্ব গ্রহণের আগেকার কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ সামনে এলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
এস কে চন্দন, ঢাকা 























